খুররমকে ঘিরে সেলিমের অতিপরিচিত হৃদয়বিদারক অনুভূতিটি আবারো তার হৃৎপিণ্ডটিকে গ্রাস করতে লাগলো। সেলিম তাকে ভালোবাসে কিন্তু তার সঙ্গে তার কোনো অন্তরঙ্গতা নেই এবং ভবিষ্যতেও হবে কি না সন্দেহ। জন্মের পর পরই যে সন্তানকে পিতামাতার কাছ থেকে পৃথক করে ফেলা হয় তার সঙ্গে আর কখনোই সম্ভবত বাবা মার দৃঢ় বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হয় না। এক মুহূর্তের জন্য উঁচু খিলানটির দিকে তাকিয়ে সেলিমের সেখানে প্রবেশ করার লোভ হলো, কিন্তু তাতে কি লাভ? সে নিশ্চিত আকবর সেখানে তার উপস্থিতি কামনা করছেন না। আর খুররমেরও তাকে প্রয়োজন নেই।
জাহাপনা, আপনার অন্য পুত্ররা এবং শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী বাকি সদস্যরা রাজপ্রাসাদে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেবল আপনার পিতার দেহরক্ষীরা এখানে অবস্থান করবে। আমরাও কি ফিরতে পারি? সুলায়মান বেগের লঘু সম্ভাষণ সেলিমকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো। তার মতো তার বন্ধুটিও ভীষণ ঘামছে। দিনের উত্তাপ ক্রমাগত অসহ্য হয়ে উঠছে। সেলিম মাথা ঝাঁকালো। প্রাসাদের শীতল ছায়ায় ফিরে যাওয়াই এখন উত্তম, তাছাড়া তার পুত্রটি তার বিদ্যালয় যাত্রার প্রথম দিনে কেমন আচরণ করলো তা জানার জন্যেও নিশ্চয়ই যোধ বাঈ উদ্গ্রীব হয়ে আছে।
দৃষ্টি নন্দন এবং আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান উদযাপন করার ব্যাপারে তোমার পিতা সত্যিই অত্যন্ত পারদর্শী। উপস্থিত জনতা উচ্ছ্বাস উদ্দীপনায় প্রায় বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলো। সুলায়মান বেগ মন্তব্য করলো।
তিনি তার সমৃদ্ধি এবং জাঁকজমক প্রজাদের প্রদর্শন করতে পছন্দ করেন। তিনি মনে করেন এর ফলে প্রজারা মোগল সাম্রাজ্যের নাগরিক হওয়ার মর্যাদা ধারণের জন্য গর্ব অনুভব করে।
তোমার পিতার ধারণা সঠিক। তুমি উপস্থিত জনতার সম্মিলিত চিৎকার আল্লাহ আকবর ধ্বনি শুনতে পাওনি? প্রজারা তাকে সত্যিই ভালোবাসে।
হ্যাঁ, আমি জানি। সেলিমের মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে এবং সূর্যের প্রখর উজ্জ্বলতা সহ্য করতে তার কষ্ট হচ্ছে। সকলেই আকবরকে ভালোবাসে। সে অপেক্ষাকৃত দ্রুত বেগে হাঁটতে লাগলো। সেই মুহূর্তে নিজ কক্ষে ফিরে গিয়ে আপন ভাবনার জগতে হারিয়ে যাওয়ার তীব্র আকাক্ষা অনুভব করলো সেলিম।
*
লাহোর থেকে দক্ষিণে অবস্থিত অধুনা পুনর্নির্মিত আগ্রা দূর্গ পরিদর্শনের জন্য শীতকালের আপেক্ষায় থেকে তার পিতা ভালো কাজ করেছেন, সেলিমের মনে হলো। ছয় মাস পর আকবর সদলবলে আগ্রাদূর্গ পরিদর্শনে এসেছেন। তারা হাতির পিঠে চড়ে খাড়া আকাবাকা ঢাল বেয়ে দূর্গের প্রবেশ দ্বারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই ঢাল এবং বাঁক তৈরি করা হয়েছে শত্রুর দূর্গমুখী আক্রমণের গতি ধীর করার জন্য। ঢালের শেষ প্রান্তে নির্মিত প্রবেশ দ্বারটি বিশাল আকৃতির এবং তাতে ধাতব শলাকা লাগানো হয়েছে, কেউ যদি হাতির সাহায্যে দ্বারটি ভাঙ্গার চেষ্টা করে তাহলে সেই হাতি আহত হবে। নেতৃত্ব দানকারী হাতিটির পিঠে রয়েছেন আকবর এবং যথারীতি খুররম তার পাশে বসে আছে।
জাহাপনা, আপনি অপনার নিজের অবদানকে অতিক্রম করেছেন, কিছুক্ষণ পরে হাওদা থেকে নামার সময় আবুল ফজল বলে উঠলো। তার দৃষ্টি সত্তর ফুট উঁচু বালুপাথরের দূর্গপ্রাচীরের দিকে নিবদ্ধ, পুনর্নির্মিত দূর্গকে ঘিরে যার পরিধি দেড় মাইল বিস্তৃত।
আবুল ফজলের বর্তমান বক্তব্যটি একটুও অতিরঞ্জিত নয়, সেলিম স্বীকার করতে বাধ্য হলো। আকবরের মতো সে দূর্গের কাজ চলার সময় পরিদর্শনে আসেনি কিন্তু সে আকবরের স্থপতিদের অঙ্কিত নকশা দেখেছে এবং সে কারণেই জানতো যে আকবর দূর্গটি প্রায় সম্পূর্ণ নতুন আদলে পুনর্নির্মাণ করছেন। তিনি এর বাহ্যিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরো সুদৃঢ় করেছেন, অভ্যন্তরের অলংকরণ এবং সাজসজ্জা আরো আকর্ষণীয় করেছেন এবং সর্বোপরি একে আরো সম্ভ্রান্ত এবং রাজকীয় রূপ প্রদান করেছেন। পুরান ভবনটি লোদি রাজবংশের দ্বারা নির্মিত ছিলো যা বাবর তাঁদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন এবং সেটি ইট এবং বালুপাথরের সংমিশ্রণে তৈরি ছিলো। কিন্তু আকবর কেবল বালুপাথর ব্যবহার করেছেন এবং হিন্দু কারিগরদের দ্বারা নকশা কাটিয়েছেন যেমনটা তিনি ফতেহপুর শিক্রির ক্ষেত্রে করেছেন। নতুন উঠান এবং বাগান গুলি আলিশান স্তম্ভ দ্বারা পরিবেষ্টিত। নতুন দরবার ভবনটির ছাদ একশোর অধিক বালুপাথরে তৈরি খামের উপর স্থাপিত হয়েছে।
বলো সেলিম, তোমার কি মতো? গর্বে প্রায় চাক্ষুশ ভাবেই ফুলে উঠে আকবর সেলিমকে জিজ্ঞাসা করলেন।
দূর্গটি সত্যিই চমৎকার দেখাচ্ছে!, সেলিম তার মনের কথাটি প্রকাশ করলো, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। তার আশেপাশে অবস্থিত লাহোর থেকে আগত আকবরের সফরসঙ্গী সভাসদগণ নিজেদের মধ্যে প্রশংসাসূচক গুঞ্জন তুলে ভাব বিনিময় করছে।
এই দূর্গের পেছনে আমি যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছি তার সঙ্গে এই চমৎকারিত্ব সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু আমাদের সিন্দুক গুলির গভীরতা অনেক, এ ধরনের একশটি দূর্গ নির্মাণ করার সামর্থ আমার আছে। আকবর অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নকশা করা দেয়ালের আইরিস ও ড্যাফোডিল ফুলের অনুরূপ অলঙ্করণের উপর আলতো ভাবে হাত বুলালেন। নকশাটি এমন যেনো বহমান বাতাসের ধাক্কায় ফুলগাছ গুলি নুয়ে পড়েছে। তুমি কি বলল খুররম? তোমার কি মনে হয় কারিগরেরা ভালো কাজ করেছে?
