*
মে মাস চলছে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই বর্ষাকাল শুরু হবে, চারদিকে গুমোট গরম। বাজিয়েরা লম্বা পিতলের বাঁশি এবং ঢোল বাজিয়ে রাজপ্রসাদ থেকে শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের পেছনে রয়েছে আট জন দেহরক্ষী যারা জন্মের পর থেকেই আকবরের সবচেয়ে প্রিয় নাতি খুররমকে নিরাপত্তা দিয়ে আসছে। তাদের পেছনে জুড়ি মেলানো ঘিয়া রঙের টাটুঘোড়ায় চড়ে অগ্রসর হচ্ছে আট বছর বয়সী খোসরু এবং ছয় বছর বয়সী পারভেজ, তাদের মাথায় শোভা পাচ্ছে সারসের পালক যুক্ত রেশমের পাগড়ি।
রাজপরিবারের সদস্যদের জন্য নির্মিত বিদ্যালয়ের কারুকাজ সম্বলিত বালুপাথরের প্রবেশ পথের বাম পাশে সেলিম আকবরের কিছু উচ্চপদস্থ সভাসদ এবং সেনাপতিদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলো। সে ভাবছে তার বড় দুই পুত্রকে কতোই না গম্ভীর দেখাচ্ছে এবং কেমন স্থির ভাবে তারা তাদের ঘোড়ার উপর বসে আছে। অথচ এধরনের অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাঁদের পূর্বপরিচয় নেই। আকবর সেলিম বা সেলিমের অন্য ভাইদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা লগ্নে এমন জাঁকজমক পূর্ণ উৎসবের আয়োজন করেননি। কিন্তু মোগল ঐতিহ্য অনুযায়ী এই রাজবংশের যুবরাজদের বয়স চার বছর, চার মাস, চার দিন হওয়া মাত্রই এ ধরনের অনুষ্ঠান পালনের রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে এবং আজ খুররম ঐ বয়সে পদার্পন করেছে। খোসরু এবং পারভেজের পেছনে সেলিম একটি বাচ্চা হাতির পিঠে সওয়ার খুররমকে দেখতে পাচ্ছিল। এই হাতিটির মস্তক আবরণে আটকান সোনার শিকলটি আকবরের বাহনের সঙ্গে যুক্ত, তিনি স্বয়ং তাঁর প্রিয় নাতির পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বাচ্চা হাতিটির পিছন পিছন অগ্রসর হচ্ছে আকবরের দেহরক্ষী দলের অধিনায়ক।
খুররম তার হাতির পিঠে একটি উন্মুক্ত হাওদায় বসে ছিলো। হাওদাটি রূপা দিয়ে তৈরি এবং সেটি টাকোয়াজ পাথরে অলংকৃত- এই রত্নটি তৈমুরও পরিধান করতে পছন্দ করতেন। খুররমের পেছনে দাঁড়ানো একজন পরিচারক একটি মুক্তার ঝালর বিশিষ্ট সবুজ রেশমের তৈরি ছাতা তার মাথার উপর ধরে রয়েছে তাকে রোদ থেকে আড়াল করার জন্য। সেলিম অনুভব করলো তার কাধ বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, অবশ্য সেও রেশমের শামিয়ানার নিচে দাঁড়িয়ে আছে। সোভাযাত্রাটি যখন তার কাছাকাছি পৌঁছালো সেলিম বুঝতে পারলো এতো গরমের মাঝেও তার কনিষ্ট পুত্রটি বর্তমানের আনুষ্ঠানিকতার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজকীয় পোক- কিংখাবের কোট এবং সবুজ পালুনে তার বড় দুই ভাই যেমন অস্বস্তি প্রকাশ করছিলো তাকে দেখে সেরকম মনে হলো না। তার গলায়, হাতের আঙ্গুলে এবং কোমরে আটকানো ছোট আকৃতির আনুষ্ঠানিক ছোরাতে বিভিন্ন বর্ণের রত্ন শোভা পাচ্ছিলো। যদিও তাকে দেখাচ্ছিলো একটি রত্নখচিত পুতুলের মতো তবুও বোঝা যাচ্ছিলো সে অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত উচ্ছ্বাসের সঙ্গে উপভোগ করছে। সে সৈন্যদের ঘেরের বাইরে অবস্থিত উল্লাসরত জনতার দিকে তাকিয়ে হাসছিলো এবং হাত নাড়ছিলো। বিদ্যালয়ের সিঁড়ির সামনে বড় আকারের লাল এবং নীল রঙের পারসিক শতরঞ্জি বিছান। সেখান থেকে বিশ পদক্ষেপ দূরে থাকতেই বাদক দল বাজনা থামিয়ে দিলো এবং শোভাযাত্রাটি দুদিকে বিভক্ত হয়ে আকবর এবং খুররমকে বিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ করে দিলো। আকবর অগ্রসর হয়ে শতরঞ্জিটির কেন্দ্রবিন্দুতে থামলেন এবং দ্রুত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার কনিষ্ঠ নাতিটি নিজ আসনে নিরাপদে বসে আছে কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিয়ে উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে তাঁর বক্তব্য আরম্ভ করলেন। আমি তোমাদের সকলকে এখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রত্যক্ষ করার জন্য। আমার অতিপ্রিয় নাতি যুবরাজ খুররম আজ থেকে তার বিদ্যার্জন শুরু করবে। আমি রাজ্যের ভিতর এবং বাইরে থেকে শ্রেষ্ঠ পণ্ডিৎ ব্যক্তিদের সংগ্রহ করেছি। তারা সাহিত্য এবং গণিত থেকে শুরু করে জ্যোতিবিদ্যা পর্যন্ত এবং আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস সহ সকল বিষয়ে আমার নাতিকে প্রশিক্ষণ দেবে। তাদের তত্ত্বাবধান এবং নির্দেশনায় আমার প্রিয় নাতি খুররম শৈশব থেকে তারুণ্যে পদার্পণ করবে।
ঠিক তাই, সেলিম ভাবলো এবং তার পিতা খুররমের শিক্ষকমণ্ডলীর মধ্যে আবুল ফজলের পিতা শেখ মোবারককেও অন্তর্ভূক্ত করেছেন যে তাকে ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করবে। আবুল ফজল সেলিমের কাছ থেকে কয়েক পদক্ষেপ দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো, যথারীতি তার চামড়ায় বাঁধাইকৃত খতিয়ান খাতাটি বগলের নিচে ধরা রয়েছে, সন্দেহ নেই অনুষ্ঠান সম্পর্কে কিছু অতি অলংকৃত বাক্য সেটাতে লিখে ফেলার জন্য সে প্রস্তুত। সেলিম তাকে পর্যবেক্ষণ করছে বুঝতে পেরেই হয়তো সেও সরাসরি এক পলক সেলিমের দিকে তাকালো তারপর অন্য দিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। সেলিম আবার তার পিতার দিকে মনোযোগ দিলো।
যুবরাজ খুররম ইতোমধ্যেই তার অসাধারণ সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, আকবর বলতে লাগলেন। আমার জ্যোতিষীগণ ভবিষ্যতবাণী করেছে সে একদিন বহু মহৎ কর্ম সমাধা করবে। এসো খুররম, সময় হয়েছে।
আকবর নিজে এগিয়ে গিয়ে খুররমের হাওদার ছিটকানি খুলে তাকে কোলে করে নামিয়ে আনলেন। তারপর শিশুটির হাত ধরে ধীরে উঁচু খিলান বিশিষ্ট প্রবেশ পথের দিকে অগ্রসর হলেন। তারা যখন সেলিমের কয়েক ফুট সামনে দিয়ে অগ্রসর হলো, খুররম সেলিমের দিকে তাকিয়ে এক ঝলক হাসলো কিন্তু আকবর তার দৃষ্টি সম্মুখে স্থির রেখেই এগিয়ে গেলেন। কয়েক মুহূর্ত পর তারা বিদ্যালয়ের ভিতরে অদৃশ্য হলো। সেলিম তার মনের ভাবনা গুলির মাঝে সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা করলো। সন্তানের প্রতি যাবতীয় কর্তব্য পালনের সুযোগ তার পিতার থাকা উচিত। খুররমকে তার শিক্ষাজীবন শুরুর প্রথম দিনে আকবরের পরিবর্তে তারই নিয়ে আসাটা যুক্তিযুক্ত হতো। যেমনটা সে খোসরু এবং পারভেজের ক্ষেত্রে করেছে। আকবর নয় তারই উচিত ছিলো নিজ পুত্রের শিক্ষক নির্বাচন করা। কিন্তু আকবর তার এই সব অধিকার আত্মসাৎ করেছেন।
