.
২২. আগ্রার দূর্গপ্রাচীর
কি ব্যাপার? সারা বিকাল তোমাকে অন্যমনষ্ক মনে হচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম আমাকে বলার জন্য তোমার মনে অনেক কথা জমে আছে।
তোমার ধারণা ঠিক। আমার বাবা আবুল ফজলকে দিল্লীতে পরিদর্শনের কাজে পাঠিয়েছিলেন, সে শীঘ্রই রাজধানীতে ফিরে আসবে, সেলিম সুলায়মান বেগকে বললো। বেশ কিছুক্ষণ রবি নদীর তীরে ঘোড়া ছুটানোর পর পশুগুলিকে ঠাণ্ডা হওয়ার সুযোগ দেয়ার জন্য তারা নদীর অগভীর জলে নেমেছে। সুলায়মান বেগ তার বাবার সঙ্গে পাঞ্জাবে গিয়েছিলো এবং গত কয়েক মাস দুই বন্ধুর মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হয়নি।
তাতে কি হয়েছে? আবুল ফজলকে নিয়ে তুমি এতো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কেনো?
এর পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
সে তোমার পিতার আস্থাভাজন এটা সত্যি কিন্তু এর অর্থ তো এই নয় যে সে তোমার শত্রু।
কিন্তু আমি নিশ্চিত সে আমাকে এবং আমার ভাইদেরকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে। এ কারণেই সে মুরাদ এবং দানিয়েল এর প্রতিটি দোষ এবং অসতর্ক আচরণের কথা বাবাকে অবহিত করে। আমি নিজে তাকে এ ধরনের কাজ করতে দেখেছি।
হয়তো সে মনে করে এটা তার দ্বায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাছাড়া তোমার ভাইগুলিও আহাম্মক।
তারা বোকা সেটা মূল কথা নয়। যেটা মূল বিষয় তা হলো সে আমাকেও বাবার কাছে অপদস্ত করার চেষ্টা করে।
তোমার সাঙ্গে তার সেই তর্ক হওয়ার পর দুই বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু সে বিষয়ে সে তোমার বাবাকে আজ পর্যন্ত কিছু জানায়নি। এটা তো সত্যি?
বাবা সে বিষয়ে আমাকে কিছু বলেনি। কিন্তু বিষয়টি আবুল ফজলের জন্যেও হয়তো তিকর ছিলো।
অথবা সে উপযুক্ত শিক্ষা পেয়েছে।
না। এখনো সে সবকিছু থেকে আমাকে বাদ দেয়ার চেষ্টা করে। তুমি যখন রাজধানীতে ছিলে না তখন বাবা আমাকে বলেছিলেন যেহেতু ইতোমধ্যে সিন্ধু জয় করা হয়ে গেছে তাই এখন তার ইচ্ছা মোগল সৈন্য পাঠিয়ে কান্দাহার দখল করা। এ সময় সেলিমের ঘোড়াটি নদীর ঘোলা পানি পান করার জন্য মাথা নামালো এবং সেলিম সেটার ঘর্মাক্ত ঘাড়ে আলতো টোকা দিলো। আমি বাবাকে অনুরোধ করলোম এই সেনা অভিযানে আমাকে তার একজন সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করতে…আমি যুক্তি দেখালাম যে কাশ্মীর অভিযানের সময় আমি আমার যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছি তাই আমাকে আরো সুযোগ দেয়া উচিত। আমি তাকে আরো বলেছি যে এটা আমাদের পারিবারিক মর্যাদার বিষয়-আমার পিতামহ হুমায়ূনের মৃত্যুর পর আমরা পারসিকদের কাছে কান্দাহার হারিয়েছি এবং তার জেষ্ঠ্য নাতি পুনরায় তা অধিকার করবে এটাই সবদিক থেকে ন্যায্য।
তিনি কি বললেন?
তিনি সিন্ধু জয়ের কারণে এতোটা উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে আমার মনে হয়েছিলো তিনি এক কথাতেই রাজি হয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি আমাকে বললেন বিষয়টি নিয়ে তিনি যুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী সভায় আলোচনা করতে চান। কিন্তু পর দিন আবুল ফজল আমাকে বাবার সিদ্ধান্ত জানালো-আমাকে সে বললো বাবা জানিয়েছেন তিনি মনে করেন এতো দূরবর্তী যুদ্ধাভিযানের জন্য আমার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। বাবার এই বার্তাটি আমার প্রতি তার গতানুগতিক উপদেশ বাক্য দিয়ে শেষ হয়েছে-ধৈর্য ধারণ করো। কিন্তু আমি জানি এটা প্রকৃতপক্ষে কার বার্তা।
তুমি এতো নিশ্চিত হচ্ছ কীভাবে? হয়তো তোমার বাবা তোমার নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন।
অথবা হয়তো আবুল ফজল চাচ্ছে না বিজয় গৌরবের মাঝে আমি কোনো অবদান রাখি…প্রায় প্রতিদিনই বার্তাবাহকরা খবর আনছে যে আমাদের সৈন্যরা সফল ভাবে কান্দাহারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং গিরিপথ দখল করে থাকা বেলুচিস্তানী গোত্র গুলিকে পরাজিত করছে। গতকাল রাতে বাবার প্রধান সেনাপতি আব্দুল রহমানের কাছ থেকে বার্তা এসেছে যে কান্দাহারের পারসিক সেনাপতি আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এটা অত্যন্ত শুভ সংবাদ। যদি তা সত্যি হয়, এর অর্থ দাঁড়াবে তোমার বাবার উত্তর সীমান্ত আরো প্রসারিত হলো…এখন তার সাম্রাজ্য উত্তরে কান্দাহার থেকে দক্ষিণে দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত বিস্তৃত এবং পূর্বে বাংলা থেকে পশ্চিমে সিন্ধু পর্যন্ত…আমাদের সৈন্যরা অপরাজেয়। বর্তমানে আর কে মোগলদের বিরোধীতা করার সাহস পাবে? কিন্তু সুলায়মান বেগের চেহারার উচ্ছ্বাস ফিকে হয়ে এলো সেলিমের মলিন মুখ দেখে।
এটা শুভ সংবাদ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমার পিতা একজন মহান ব্যক্তি- আমি সেটা জানি এবং অন্য সকলের মুখের আমি একই কথা শুনি। তিনি আমাদের সাম্রাজ্যকে যে উচ্চতায় নিয়ে এসেছেন তা ইতোপূর্বে কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু আরো ভালো হতো এই বিজয় গৌরবের মাঝে যদি অমিও কিছুটা অবদান রাখতে পারতাম এমন নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে না থেকে এবং সেই সুযোগের আশায় না থেকে যা আমার ভাগ্যে ধরা দিচ্ছে না। বলতে বলতে সেলিম তার ঘোড়ার লাগাম ধরে এতো জোরে টান দিলো যে জানোয়ারটি প্রতিবাদ সূচক তীব্র হ্রেষাধ্বনি করে উঠলো। তারপর সে তার ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে নদীর পারে উঠে এলো এবং সুলায়মান বেগের জন্য অপেক্ষা না করে লাহোরের দূর্গের দিকে সবেগে ঘোড়া ছুটালো। কোনো সন্দেহ নেই ইতোমধ্যেই তার বাবা কান্দাহার বিজয়ের উৎসব পালনের জন্য তোরজোর আরম্ভ করে দিয়েছেন। আকবরের মতো একজন মানুষ যিনি তরুণ বয়স থেকেই সাফল্য এবং গৌরব অর্জন করে অভ্যস্ত তার পক্ষে সেলিমের অনুপ্রেরণাহীন নিষ্ফল জীবনের দুঃসহ বেদনা অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
