আমার তুলনায় বেশি উপযুক্ত? কিন্তু রাজসভার সবাইতো জানে মুরাদ সর্বদা এতো মাতাল থাকে যে, কারো সাহায্য ছাড়া ঠিক মতো দাঁড়িয়েও থাকতে পারে না।
আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত যে আপনিও একজন উত্তম প্রশাসক হওয়ার সকল যোগ্যতা ধারণ করেন, প্রশ্নটির সোজা উত্তর এড়িয়ে গিয়ে আবুল ফজল মন্তব্য করলো।
এই পদটিতে নিয়োগের বিষয়ে বাবা কি আপনার পরামর্শ চেয়েছিলেন?
আবুল ফজল এক মুহূর্ত ইতস্তত করলো। আমি আপনাকে পূর্বেই বলেছি জাহাপনা, মহামান্য সম্রাট এই সব সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়ে থাকেন। আমি কেবল সেগুলি আমার ঘটনাপঞ্জিতে লিপিবদ্ধ করার ভূমিকা পালন করি।
আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি না।
জাহাপনা?
আবুল ফজলের চেহারা দেখে মনে হলো বাস্তবেই সে ভীষণ আহত হয়েছে। সেলিম একটি বিষয় উপলব্ধি করলো যে, ঘটনাপঞ্জিকার যে দীর্ঘ সময় ধরে তার পিতার চাকুরীতে নিযুক্ত রয়েছে এই সময়ের মধ্যে তারা দুজন আগে কখনোই এভাবে পরস্পরের মুখোমুখী হয়নি। আকবর যেহেতু রাজধানী থেকে বহু দূরে অবস্থান করছেন, এই পরিস্থিতি সেলিমকে অনেকটা স্বাধীনতা প্রদান করেছে। শুধু প্রশাসক নিয়োগ সংক্রান্ত হতাশাই নয়, আবুল ফজলকে কেন্দ্রকরে দীর্ঘ সময় ধরে তার মনে যে সন্দেহ এবং ঘৃণা পুঞ্জিভূত হয়েছে তার সবটুকু আজ সে তার সামনে উগরে দিতে চাইলো।
আমি তো বললোমই, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না। আমার বাবা সব বিষয়ে আপনার সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং আমি নিশ্চিত মালওয়া ও গুজরাটের প্রশাসক নিয়োগের বিষয়েও তিনি আপনার সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
আবুল ফজলের মুখের হাসি ভাব ক্রমশ উধাও হলো। আমার সঙ্গে আপনার পিতার যে সব আলোচনা হয় তা অত্যন্ত গোপনীয়। সে সব বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করার অর্থ তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা। আপনি নিশ্চয়ই তা বোঝেন জাহাপনা।
আবুল ফজলের কণ্ঠে এখন আর অতিবিগলিত ভাব বজায় নেই এবং জীবনে প্রথম বারের মতো সেলিম উপলব্ধি করলো লোকটি কতোটা দুর্ধর্ষ। কিন্তু সে পরাজয় স্বীকার করবে না। আমি জানি বাবা আপনার সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ ধারণা পোষণ করেন।
আমিও তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান করি। আমি তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রজা। আবুল ফজলের কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা প্রকাশ পেলো।
কিন্তু আপনার বিশ্বস্ততা আমার পিতার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতিও কি প্রসারিত হওয়া উচিত নয়? সেলিম আবুল ফজলের দুকাঁধ ধরে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালো। আমি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র, কিন্তু শৈশব থেকেই আমি লক্ষ্য করছি নানা উপায়ে আপনি তার সঙ্গে আমার দূরত্ব সৃষ্টি করতে তৎপর। আপনি বাধা সৃষ্টি না করলে বাবা অবশ্যই তার যুদ্ধবিষয়ক সভা গুলিতে আমাকে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ দিতেন। এটা কি আপনি অস্বীকার করেন?
আবুল ফজল বিচলিত না হয়ে শান্ত ভাবে উত্তর দিলো, আমি সর্বদাই মহামান্য সম্রাটকে উত্তম পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করি। আপনি যদি সত্যি কথাটি জানতে চান সেটা হলো, তিনি আপনাকে সভায় আমন্ত্রণ জানাননি কারণ তিনি মনে করেছেন আপনাকে সেখানে ডাকা অর্থহীন। উনি স্বয়ং আমাকে বলেছেন আপনার আচরণ তাঁকে হতাশ করে।
সেলিম আবুল ফজলের কাঁধ ছেড়ে দিলো। এই সংক্ষিপ্ত কথা গুলি তাকে যে কোনো অস্ত্রের চাইতে বেশি মারাত্মক ভাবে আহত করেছে। তার নিজের মনেও তো এমন আশঙ্কা ছিলো যে, সে তার বাবাকে সন্তুষ্ট করতে অপারগ, যততা ঐকান্তিক ভাবেই চেষ্টা করুক না কেনো? সে কিছুতেই চায় না আবুল ফজল তার আশঙ্কা এবং ভীতি গুলি সম্পর্কে অবহিত হয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠুক। এটাও প্রকাশ পেলে চলবে না তার মন্তব্য তাকে আহত করেছে। সে অন্তরে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললো, আপনি সর্বদা আমার এবং আমার পিতার মধ্যকার সম্পর্কে অনিষ্ট সাধনের চেষ্টা করে গেছেন। আপনি সর্বদা তার কানে বিষ না ঢাললে তার এবং আমার মাঝে এতো ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে না। আপনি ঠিকই বলেছেন, আপনি তার প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত। তবে এই বিশ্বস্ততা আপনার ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উপায় ব্যতীত আর কিছু নয়। সেটা আপনি ভালো করেই জানেন। আমি সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি, কিন্তু আমি সেই দিনটির অপেক্ষায় রইলাম যেদিন আমার বাবাও সেটা উপলব্ধি করতে পারবেন।
তারা বর্তমানে পরস্পরের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেলিম উপলব্ধি করছিলো ঘটনাপঞ্জিকারের সঙ্গে আরো বেশি নগ্ন তর্কে জড়িয়ে পড়ার অর্থ তার অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করা। কারণ এ বিষয়ে আবুল ফজল যখন তার ভাষ্য আকবরকে প্রদান করবে তখন তিনি তার প্রতি রুষ্টই হবেন। হয়তো ইতোমধ্যে যে সে সব কথা বলে ফেলেছে তা সঠিক হয়নি, কিন্তু এর জন্য সে কোনো অনুশোচনা বোধ করছে না। তবে এখন থেকে আবুল ফজল তার ব্যাপারে আরো বেশি সতর্ক হয়ে উঠবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং সে নিজে তাকে সর্বদা পর্যবেক্ষণে রাখবে তার দুর্নীতি বা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির প্রমাণ উদ্বাটনের জন্য। সে রকম কিছু পেলেই সে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। ঝট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে সেলিম আবুল ফজলের কক্ষ থেকে প্রাসাদের রৌদ্র আলোকিত উঠানে বেরিয়ে এলো। একবার পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেলো জানালা দিয়ে আবুল ফজল তার দিকে চেয়ে রয়েছে।
