আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, একদিন আমি এই বঞ্চনার উপযুক্ত মাসুল আদায়ের উপায় আবিষ্কার করবো এবং খুররমও তাই করবে। সে চিরদিন শিশু থাকবে না এবং তার পিতামহের দ্বারা বশীভূতও থাকবে না। তাছাড়া পরিস্থিতি যাই হোক না কেনো একজন মায়ের সঙ্গে তার পুত্রের বন্ধন সর্বদাই অত্যন্ত দৃঢ়। অন্তত সে নিজে বিষয়টি গভীর ভাবে উপলব্ধি করে, সেলিম ভাবলো। তার কল্পনার দৃষ্টির সামনে হীরা বাঈ এর গর্বিত মুখটি ভেসে উঠলো।
আমাদের কি কিছুই করার নেই? যোধ বাঈ জিজ্ঞাসা করলো, সে অন্তরে ভীষণ অস্থিরতা অনুভব করছে। নিশ্চিতভাবেই নেই। তোমার বাবা হলেন মহামান্য সম্রাট এবং এটা অত্যন্ত সম্মানের বিষয় যে তিনি আমাদের সন্তানের লালন পালনের ভার নিয়েছেন। আমার অভিযোগ করা উচিত নয়।
যে মুখটি কৌতুকবোধে সর্বদা সজীব থাকে সেখানে এখন তীব্র শোকের ছায়া। সেলিম অনুভব করলো তার নিজের চোখের পাতাও ভিজে উঠেছে। এই অশ্রু স্ত্রীর প্রতি সহমর্মিতার অশ্রু, এই অশ্রু নিজের অক্ষমতা জনিত হতাশার। কিন্তু এই চোখের জল তার মাঝে নতুন উদ্দীপনাও সৃষ্টি করলো। নিজের আবেগকে গোপন করো, সে নিজেকে বললো; ধৈর্যশীল হও। একদিন তোমার সময়ও আসবে…তুমি শাসন ক্ষমতার অধিকারী হবে।
*
কিন্তু পরবর্তী মাস গুলিতে সেলিম যখন তার অশ্রুসিক্ত উদ্দীপনার কথা গুলি স্মরণ করতে লাগলো, সেগুলি তার কাছে নিতান্তই ফাঁকা বুলি মনে হতে লাগলো। ধৈর্য নয় বরং অক্ষমতাই তার অবস্থা ক্রমশ শোচনীয় করে তুলছে, সে উপলব্ধি করলো। প্রতিদিন একটি মাত্র বোধই তাকে ক্ষতবিক্ষত করতে লাগলো, তার কিছুই করার নেই। সে আকবরের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল, নাতির প্রতি যার আগ্রহ এবং উৎসাহে ভাটা পড়ার কোনো লক্ষণই নেই। সেলিম বুঝতে পারছিলো খুররমের প্রতি তার বাবার এই ভালোবাসার জন্য তার খুশি হওয়া উচিত এবং তার নিজের প্রতি আকবর কখনোও এমন মমতা প্রকাশ করেননি এই বিষয়েও তার ক্ষুব্ধ হওয়া উচিত নয়। কিন্তু তা মেনে নেয়া তার জন্য কঠিন। যোধ বাঈ এর সঙ্গে খুররমের বিরল সাক্ষাৎকার গুলির দৃশ্যও তার কাছে অসহনীয় লাগছিলো। কারণ খুররম তার আসল মায়ের অপরিচিত কোলে গিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করতো এবং ছোট্ট দেহটি মুচড়ে চিৎকার করে কেঁদে রোকেয়া বেগমের নিযুক্ত করা দুধমায়ের কোলে ফিরে যেতে চাইতো। যোধ বাঈ নিজের কষ্ট লুকাতে চেষ্টা করতো কিন্তু সেলিম জানতো বেদনার ঘুণপোকা ভেতরে ভেতরে তাকে ক্ষয় করে ফেলছিলো।
সেলিমের সকল রোষের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো আবুল ফজল, সেলিমের ধারণা ঐ লোকটিই তার আশাগুলিকে একে একে হত্যা করছে। লোকটি তার শত্রু এ বিষয়ে যদি কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ দরকার হয়, সেলিম নিশ্চিত ইতোমধ্যেই সে তা পেয়ে গেছে, গ্রীষ্মের এক উষ্ণ বিকেলে লাহোর দূর্গে আবুল ফজলের কক্ষের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় সেলিম ভাবছিলো।
জাহাপনা, আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে আপনি আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি মহামান্য সম্রাটের আগ্রাদূর্গ পুনঃনির্মাণ কাজ পরিদর্শনের জন্য সেখানে গমনের বিষয়টি ঘটনাপঞ্জিতে লিপিবদ্ধ করেছিলাম। সেলিম কক্ষে প্রবেশ করতেই আবুল ফজল উঠে দাঁড়িয়েছে। তার থলথলে মুখে বিগলিত হাসি ছড়িয়ে পড়েছে কিন্তু তার ছোট ছোট চোখ দুটিকে বেশ সতর্ক মনে হলো।
বাবার সঙ্গে আপনি যাননি দেখে আমি বেশ অবাক হয়েছি।
মহামান্য সম্রাট প্রায় দুই মাসের জন্য আগ্রায় গিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এমন বহু কিছু ঘটতে পারে যা তাৎক্ষণিক ভাবে তার জানা দরকার হতে পারে। সেই কারণে তিনি আমাকে এখানে রেখে গেছেন। আবুল ফজলের মসৃণ যুক্তিপূর্ণ বাক্য এবং তার অধিকতর মসৃণ বিগলিত হাসি সেলিমকে সর্বদাই ধৈর্যের শেষ সীমায় ঠেলে দেয়, তবে এই মুহূর্তে সে নিজের প্রকৃত অনুভূতি গোপন করার চেষ্টা করলো না।
একটু আগে আমি জানতে পারলাম আমার সৎ ভাই মুরাদকে মালওয়া এবং গুজরাটের প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে।
আপনি সঠিক তথ্যই পেয়েছেন জাঁহাপনা। আগামী এক মাসের মধ্যে যুবরাজ মুরাদ লাহোর ত্যাগ করে তার কর্মস্থলে যোগ দিবেন।
ঐ পদটি বাবার কাছে আমি চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন সে বিষয়ে তিনি চিন্তা ভাবনা করবেন। কিন্তু এটা কি হলো?
এই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর একমাত্র মাননীয় সম্রাটই দিতে পারবেন। আপনি তো জানেন, তিনিই আমাদের সকল প্রাদেশিক প্রশাসকদের নিয়োগ দান করেন।
আমি নিজে তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারছি না। কারণ তিনি এখন লাহোরে নেই। সে জন্যই আমি আপনার কাছে জানতে চাইছি। আপনি তার মুখ ও কানের ভূমিকা পালন করেন। তাই আমার মনে হয়েছে সবকিছু আপনি ভালোই জানেন।
সেলিমের কণ্ঠস্বরে কিছুটা ঘৃণা মিশ্রিত ছিলো। সে অনুভব করছিলো আবুল ফজল তার আক্রমণে অসন্তুষ্ট হওয়ার পরিবর্তে নিজের অহংকার বজার রাখার চেষ্টা করছে। সে কিছু জানে না, এই মুহূর্তে এমন ভাব বজায় রাখা আবুল ফজলের জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে পড়েছে, তবে এই যুদ্ধে হার না মানার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও তাকে খুব একটা উৎসাহী মনে হলো না। তার গম্ভীর মুখ ক্রমশ সহজ হয়ে এলো এবং সেখানে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। আমি যতোদূর জানি তা হলো, মহামান্য সম্রাটের বিবেচনায় মনে হয়েছে যুবরাজ মুরাদ উক্ত পদটির জন্য উপযুক্ত।
