আকবর হাত তুলে সবাইকে চুপ হতে বললেন, বোঝা গেলো তার আরো কিছু বলার আছে। যেহেতু এই শিশুটির জন্মক্ষণ অত্যন্ত শুভ তাৎপর্য মণ্ডিত তাই ওর লালন পালনের দায়িত্ব স্বয়ং আমি নিলাম।
বাবার বক্তব্য হজম করতে সেলিমের রীতিমতো কষ্ট হলো, তিনি কি তার পুত্রকে তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তা করছেন? পিতার পরবর্তী কথা গুলি শ্রবণ করে তার উদ্দেশ্য সেলিমের কাছে স্পষ্ট হয়ে এলো।
যুবরাজ খুররমকে আমার স্ত্রী রোকেয়া বেগমের তত্ত্বাবধানে আমার হেরেমে রাখা হবে যাতে দিন বা রাতের যে কোনো সময় আমি তার মুখ দর্শন করতে পারি। সে যখন বড় হতে থাকবে তখন আমি তার জন্য বিশেষ যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক নিযুক্ত করবো এবং আমি নিজেও তাকে কিছু কিছু প্রশিক্ষণ প্রদান করবো।
সে তার সন্তানকে নিজেই মানুষ করতে পারবে এ আস্থাও কি তার পিতার নেই? সেলিম অনেক কষ্টে নিজের দৃষ্টিকে মেঝের দিকে নিবদ্ধ রাখল কারণ তার মনে হলো সরাসরি বাবার দিকে তাকালে হয়তো তার মুখ ফসকে কোনো বিরুপ মন্তব্য বেরিয়ে যাবে। রাজসভার সবচেয়ে প্রবীণ সদস্যগণ উপস্থিত রয়েছেন, সে নিজেকে বোঝালো, তার এক হাতের নখ আরেক হাতের তালুতে এমন জোরে এটে বসলো যে মনে হলো রক্ত বেরিয়ে যাবে। এই মুহূর্তে কোনো গোলযোগ সৃষ্টি করা অচিন্তনীয়। সে নিজের চিন্তাগুলিকে স্থির এবং শ্বাসপ্রশ্বাসকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে লাগলো, সেগুলি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিলো এবং তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। তখন আরেকটি চিন্তা তীব্র শক্তিতে তার মাথায় আঘাত হানলো। বাবা কি পর্যায়ক্রমে খুররমকে নিজের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করবেন? নিশ্চয়ই না…পাশে তাকিয়ে সেলিম দেখতে পেলো আবুল ফজল তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। ঘটনাপঞ্জিকারের ছোট ছোট চোখ গুলিকে কৌতূহলী মনে হচ্ছিলো, যেনো সে অনুধাবন করার চেষ্টা করছে সেলিম এই ঘোষণাটিকে কীভাবে গ্রহণ করলো। বাবার এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে আবুল ফজল কি ভূমিকা রেখেছে? নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার জন্য কি সে বাবাকে খুররামের প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শন করতে উৎসাহ দিয়েছে? খুররম যদি অল্প বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করে তাহলে আবুল ফজল তার অভিভাবকত্ব করার সুযোগ পাবে। এই চিন্তাটি সেলিমের মনে আকস্মিক ভাবে এমন তীব্র ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটালো যে তার মনে হলো এই মুহূর্তে কোমর থেকে ছোরা বের করে দুই লাফে আবুল ফজলের কাছে পৌঁছে তার থলথলে গলায় সেটা সমূলে বসিয়ে দেয়।
কিন্তু না, তার বাবা তাকে যে মারাত্মক আঘাত করলেন সেই ক্ষত চিহ্নটি সে ঐ চাটুকারটির সামনে সে মেলে ধরবে না। সে জোর করে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো কিন্তু তার মন বাধ মানলো না, বার বার চেষ্টা করলো কোনো উপায় উদ্ভাবনের যার ফলে বাবাকে তার সন্তান চুরি করা থেকে বিরত করা যায়। একটাই সান্ত্বনা, খুররম শ্রেষ্ঠ সেবা সমূহ লাভ করবে এবং রোকেয়া বেগম একজন দয়ালু মহিলা। সেলিম তাকে সমগ্র জীবন ধরে জানে। সাধারণ মুখমণ্ডল এবং পাকা চুল বিশিষ্ট এই মহিলাটি আকবরের এক চাচাতো বোন। তার বাবা অর্থাৎ আকবরের চাচা হিন্দাল অনেক আগে মারা গেছেন এবং তার বয়স আকবরের সমান ছিলো। রোকেয়া বেগম নিঃসন্তান। তার সঙ্গে আকবরের বিয়ে তাঁর অন্যান্য অনেক বাগদানের মতোই তেমন পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। না, খুররমকে নিয়ে তার আশঙ্কার কিছু নেই। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সে নিজে এবং যোধ বাঈ, তারা প্রতিদিন নিজ সন্তানের মুখ দর্শন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যোধ বাঈ এর কথা মনে হতেই সেলিমের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে একটি সন্তান লাভের জন্য বহু দিন অপেক্ষা করে ছিলো। সেই বহু প্রতীক্ষিত সন্তানকে অন্য কোনো নারীর কাছে সমর্পণ করা তার জন্য অসহনীয় বেদনা দায়ক হবে। তার সন্তান রোকেয়া বেগমের নিযুক্ত করা দুধমাদের স্তন্য পান করবে এবং খুররম রোকেয়া বেগমের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠবে। ভোজ উৎসব সমাপ্ত হতেই সেলিম সবার অলক্ষে যোধ বাঈ এর সঙ্গে দেখা করার জন্য হেরেমে উপস্থিত হলো। যোধ বাঈ এর চোখ ক্রমাগত ক্রন্দনের কারণে লাল হয়ে আছে। তার সন্তানের মতো খোসরুকে যদি মান বাঈ এর কোল থেকে কেড়ে নেয়া হতো তাহলে মান বাঈ শোকের আঘাতে উন্মাদ হয়ে যেতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যোধ বাঈ একটি হলুদ মখমলের আসনে নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিলো। সেলিম কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে চুমু খেলো। আমি দুঃখিত। বাবার পরিকল্পনা সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিলো না।
যোধ বাঈ এক মুহূর্ত কোনো কথা বললো না। যখন সে কথা বললো, তার কণ্ঠস্বর শান্ত শোনালো। তোমার বাবা আমাকে আরেকটি উপহার পাঠিয়েছেন। ধীরে সে তার হাতের মুঠি খুললো- তার হাতের তালুতে একটি চমৎকার সোনার হার দেখা গেলো যাতে পদ্মরাগমণি (রুবি) এবং বড় বড় মুক্তা জ্বল জ্বল করছে। সৈন্যরা এর চেয়েও কম মূল্যবান মণিমাণিক্যের জন্য লড়াই এ অবতীর্ণ হয়। এই হারটি অত্যন্ত সুন্দর কিন্তু সম্রাট যদি এটার পরিবর্তে আমাকে আমার সন্তান ফেরত দিতেন তাহলে আমি অনেক বেশি খুশি হতাম। উজ্জ্বল হারটি তার শিথিল হয়ে যাওয়া হাত থেকে পায়ের কাছে শতরঞ্জির উপর পড়ে গেলো।
