তাদের এই সব আচরণ দেখে তুমি কি বুঝতে পারছো না আমার মনের অবস্থা কি? আমি চাই না আমার সন্তানরাও অর্থহীন জীবন যাপন করুক, ভবিষ্যতে তাদের ভাগ্যে কি ঘটবে সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে। তাঁদের হতাশার সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা নানা প্রলোভনে তাঁদের বশীভূত করার সুযোগ পাবে। আমি নিজে সম্রাট হয়ে আমার সন্তানদের আমার সঙ্গে কাঁধে কাধ মিলিয়ে লড়াই করার সুযোগ দিতে চাই সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধির জন্য।
তুমি অত্যন্ত অধৈর্য হয়ে পড়েছে। তোমার বাবা হয়তো আরো বহু বছর বাঁচবেন।
আমিও প্রার্থনা করি তিনি আরো অনেক দিন বেঁচে থাকুন। তুমি যদি ভেবে থাকো আমি আমার বাবার মৃত্যু কামনা করছি তাহলে তুমি ভুল করছে। কিন্তু আমার পক্ষে আরো বহু বছর এরকম উদ্দেশ্যহীন জীবন কাটানো সম্ভব নয় কোনো প্রকার সত্যিকার কর্মোদ্যোগ ছাড়া। তাহলে আমার অবস্থা আমার রক্ষিতাদের মতো হবে যারা সারাদিন তাকিয়ায় হেলান দিয়ে অলস সময় কাটায় এবং উপাদেয় মিষ্টান্ন আহার করে দিন দিন নাদুসনুদুস হচ্ছে।
কিম্বা হেরেমের খোঁজাদের মতো দশাসই গড়নের অধিকারী হবো কিন্তু একটি ছোরা বা তলোয়ার হাতে তুলে নেয়ার সামর্থ থাকবে না। আমি একজন তরুণ, একজন যোদ্ধা, আমার এখন যোগ্যতা প্রমাণের জন্য সুযোগ দরকার। কিন্তু বাবা যদি আমাকে এভাবে অকেজো করে রাখেন তাহলে আমার জীবনের কোনো তাৎপর্য থাকে না। এখন আর সেই যুগ নেই যখন একজন মোগল যুবরাজ নিজের অনুসারীদের নিয়ে নতুন ভূখণ্ড জয় করার জন্য বেরিয়ে পড়তেন এবং নিজের জন্য নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তুলতেন, যেমনটা আমার প্রপিতামহ বাবর করেছিলেন। ক্ষমতা লাভ করার পর তিনি প্রথমে ফারগানা, সমরকন্দ এবং কাবুল শাসন করেছেন হিন্দুস্তান আসার আগে। তিনি আমার অর্ধেক বয়সে পৃথিবীর বুকে তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছিলেন।
জাহাপনা, আপনার স্ত্রী রাজকুমারী যোধ বাঈ আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন, সেলিমের একজন কোৰ্চি এসময় সেখানে হাজির হয়ে জানালো।
সেলিম মাথা ঝাঁকালো। যোধ বাঈ এর কথা মনে হতেই তার মনের বিষাদ অনেকটা কেটে গেলো। গর্ভবতী হতে পেরে তার এই গোলাকার মুখমণ্ডলের অধিকারী স্ত্রীটির চেহারা আরো বেশি গোলাকার ও আকর্ষণীয় রূপ ধারণ করেছে। তার ইতোমধ্যে যা রয়েছে তার জন্য তার সন্তুষ্টি বোধ করা উচিত। সুলায়মান বেগ ঠিক কথাই বলেছে, তার ধৈর্য ধারণ করা প্রয়োজন।
আমি এখনই ওর কাছে যাচ্ছি। আর সুলায়মান, আমি যখন ফিরে আসব তখন তোমার পরমর্শ অনুযায়ী আনন্দ-ফুর্তি করা যাবে।
এবং এ কথাও ভুলে যেও না যে একটা বিষয়ে তুমি তোমার বাবার তুলনায় এগিয়ে আছে। নিজের বংশধর পয়দা করতে ওনার তোমার চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগেছিলো।
*
আকবর তাঁর নতুন নাতিটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তোমার নাম রাখছি খুররম যার অর্থ উচ্ছল। তোমার জীবন আনন্দময় হোক এবং তোমার চারপাশের সকলের জীবনেও তুমি খুশি বয়ে আনতে সক্ষম হও এই কামনা করছি। এর থেকেও যা বড় তা হলো তুমি আমাদের সাম্রাজ্যকে আরো মাহান করে তুলতে সমর্থ হও। আকবর খুররমের ছোট্ট মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর তিনি তার সভাসদ এবং সেনাপতিদের দিকে ফিরলেন। তিন দিন আগে খুররমের জন্মের সময় গ্রহ-নক্ষত্রের যে অবস্থান ছিলো তা পর্যালোচনা করে রাজজ্যোতিষীগণ ঘোষণা করেছে যে তা আমার মহান পূর্বপুরুষ তৈমুরের জন্মক্ষণের অনুরূপ। সে কারণে এটা নিসন্দেহে একটি শুভক্ষণ, এবং আরো বিষয় রয়েছে: এটা ইসলামিক বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী সহস্রাব্দ এবং আমার এই নাতিটির জন্ম মাসেই আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই শিশুটি আমাদের সাম্রাজ্যের মুকুটে নতুন সংযোজিত একটি রত্ন এবং এর উজ্জ্বল্য সূর্যের চেয়েও বেশি।
খুররমের দিকে তাকিয়ে সেলিমের চেহারা গর্বে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তার পিতা এই নতুন নাতিটিকে পেয়ে সীমাহীন আনন্দিত হয়েছেন। খুররমের জন্মের কয়েক ঘন্টা পর জ্যোতিষীরা যখন তৈমুরের সঙ্গে তার জন্মের যোগসূত্র নির্ণয় করে বিষয়টি আকবরকে জানায় তার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেলিমকে দুটি জুড়ি মেলানো কালো স্ট্যালিয়ন ঘোড়া উপহার পাঠান এবং যোধ বাঈকে সূক্ষ্ম রেশমী কাপড় এবং সুগন্ধি। খুররমকে কোলে নিয়ে তার পিতার চোখে মুখে যে উচ্ছলতা প্রকাশ পাচ্ছিলো তা প্রত্যক্ষ করে সেলিম নতুন আশায় উজ্জীবিত হলো। এই শিশুটির মাধ্যমে তার এবং তার পিতার মধ্যকার সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ট হবে এবং তিনি হয়তো তাকে সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করবেন। সেলিমের মনে হচ্ছে খুররমকে এমন দিনে পৃথিবীতে পাঠিয়ে স্বয়ং ঈশ্বর তার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
আকবরের কোলে অবস্থানরত নিজের পুত্রের দিকে তাকিয়ে সেলিমের ইচ্ছা হলো দীর্ঘ বছর গুলিকে এক পলকে অতিক্রম করে ভবিষ্যতে গিয়ে দেখতে ঐ ভজ বিশিষ্ট চামড়ার অধিকারী ছোট ছোট হাত পা বিশিষ্ট শিশুটির প্রাপ্তবয়স্ক রূপটি কেমন। জ্যোতিষীদের গণনা যদি ঠিক হয় তাহলে ঐ শিশুটি একদিন একজন বীর যোদ্ধা এবং মহান বিজেতায় পরিণত হবে, সে এমন একজন শাসকে পরিণত হবে যার নাম বহু শতাব্দী পর্যন্ত মানুষ স্মরণ রাখবে।
