আবুল ফজল, সবসময় আবুল ফজল, সেলিম ভাবলো। সে মুখে কিছু বললো না। কিন্তু তার মনে হলো গ্রীষ্মের বেলাশেষের উষ্ণ সূর্যেটি কালো মেঘে আচ্ছাদিত হলো।
.
২১. রাজমুকুটে একটি নতুন অলঙ্করণ
এটা অত্যন্ত শুভ সংবাদ। এই উপলক্ষে আমাদের আনন্দ-ফুর্তি করা উচিত, সুলায়মান বেগ বললো। খোসরু এবং পারভেজের পরে এটি হয়তো তোমার তৃতীয় পুত্রসন্তান।
সম্ভবত।
তোমার কি হয়েছে? তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তোমার বাবা তোমাকে লাহোরের শৌচাগার গুলির পরিদর্শকের পদে নিযুক্ত করেছেন।
অথচ এই মাত্র খবর এলো তোমার সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী গর্ভবতী হয়েছে! সুলায়মান বেগ যে কোনো সময় তার মনকে হালকা করে তুলতে পারে, সেলিম ভাবলো। তোমার কথা ঠিক এবং আমি যথেষ্ট খুশি হয়েছি। যোধ বাঈও খুশি হয়েছে। ইতোমধ্যে আমি দুটি সন্তান লাভ করেছি যার কোনোটিই তার গর্ভজাত নয়, বিষয়টি তার জন্য খুবই বেদনা দায়ক ছিলো।
এবং এটাও তো সত্যি যে সে তোমার সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী, কি বলে?
হয়তো তাই। অন্তত সে আমাকে সব সময় হাসাতে পারে। তোমার মতো সেও আমার মনের অবস্থা অনুমান করতে পারে এবং ঠাট্টা তামাসা করে আমার মেজাজ ভালো করে দিতে পারে। তাছাড়া সে মান বাঈ বা অন্যান্য স্ত্রীদের মতো সর্বদা অভিযোগ করে না যে আমি তার সঙ্গে বেশি সময় কাটাই না।
তাহলে তোমার সমস্যাটি কোথায়? তুমি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে ইতস্তত বোধ করছো কেনো?
সেলিমের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, কারণ তার দুধভাই এর প্রশ্নের উত্তরটি সে নিজেও ভালোভাবে ঠাহর করতে পারছে না। একাধিক পুত্রের পিতা হতে পারা খুবই উত্তম বিষয়। কিন্তু ওদের দেয়ার মতো আমার কি আছে?
আমি কি ওদের আমার মতো উদ্দেশ্যহীন জীবনই উপহার দেবো? বাবার সঙ্গে যখন কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়েছিলাম তখন মনে হয়েছিলো তিনি আমার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন করেছেন। এটাও মনে হয়েছিলো আমার মতামত শ্রবণ করার বিষয়েও তিনি কিছুটা আগ্রহী। কিন্তু লাহোরে ফেরার পর থেকে তিনি আবার আমাকে উপেক্ষা করা শুরু করেছেন। এসবের জন্য আবুল ফজলই দায়ী। সে সর্বদা চাটুকারী বাক্যবাণ দিয়ে বাবার কান ভারী করছে এবং অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে আমি অধিক নিশ্চিত যে আমার প্রতি বাবার অবহেলার প্রধান কারণ সে। সে আমাকে এবং আমার সৎ ভাইদের সবকিছু থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে কারণ সে মনে করে বাবার উপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে আমরা তার প্রতিদ্বন্দ্বী।
সুলায়মান বেগ কাঁধ ঝাঁকালো। হয়তো তোমার বাবা মনে করছেন প্রশাসনিক কাজে অংশ গ্রহণ করার জন্য যতোটা পরিপকৃতা প্রয়োজন তা তুমি এখনোও অর্জন করতে পারনি।
আমি এখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। আমি বাবাও হয়েছি। আমি যুদ্ধক্ষেত্রে আমার সাহসের প্রমাণ রেখেছি। আমি এতোদিন ধৈর্যধারণ করেছি এবং বাবার সব নির্দেশ পালন করেছি। তিনি এর বেশি আমার কাছ থেকে আর কি আশা করেন? মাঝে মাঝে আমার মনে হয় তিনি ইচ্ছা করে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক গুলিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত করেন। তিনি এমন আচরণ কেনো করেন?
কারণ তিনি এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন যে তিনি আমাকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নির্বাচন করতে চান কি না। তিনি আমাকে সত্যিকার কোনো ক্ষমতা বা দ্বায়িত্ব দিতে অনিচ্ছুক কারণ তাঁর আশঙ্কা তাহলে সেটা আমার জন্য এবং অন্যদের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হবে- এই মর্মে যে তিনি আমাকেই তার ওয়ারিস হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
তুমি এ বিষয়ে এতো নিশ্চিত হচ্ছ কীভাবে? হয়তো তিনি অন্য যে কাউকেই কোনো প্রকার ক্ষমতা প্রদান করার ব্যাপারে কুণ্ঠিত। বর্তমানে তাঁর বয়স কতো?
আগামী অক্টোবর মাসে তার বয়স ঊনপঞ্চাশ হবে।
এটাই তাহলে আসল কারণ। যদিও তিনি দেখতে সুগঠিত এবং শক্তিশালী কিন্তু বাস্তবে তিনি আর তরুণ নেই। ভেতরে ভেতরে এটা উপলব্ধি করে তিনি তোমাকে এবং ভবিষ্যতে যাদের তার স্থান দখল করার সম্ভাবনা রয়েছে তাদেরকে অপছন্দ করেন। তার অবস্থা এখন অনেকটা বুড়ো বাঘের মতো, যাকে বনের অন্য একটি তরুণ বাঘ শিকার করা থেকে বঞ্চিত করতে আরম্ভ করে।
এ বিষয়ে তুমি নিজেকে এতো বিজ্ঞ মনে করছো কেনো?
সুলায়মান বেগ কাধ ঝাঁকিয়ে দাঁত বের করে হাসলো। আমার বাবার বয়সও প্রায় তোমার বাবার সমান এবং তিনি আমার সঙ্গে একই রকম আচরণ করেন। আমার দোষ উদঘাটন করাই যেনো তার একমাত্র কাজ এবং তিনি কোনো বিষয়ে কখনোই আমার মতামত জানতে চান না। আমিও তাকে এড়িয়ে চলি। তোমার বাবা যদি আবার তাকে বাংলায় পাঠান তাহলে ভালো হয়।
তোমার কথাই বোধহয় ঠিক। আমার বাবা সম্ভবত আমাকে ইচ্ছাকৃত ভাবে অবজ্ঞা করেন না। আর এটাও স্পষ্ট যে তিনি আমার অন্য সৎ ভাইদের প্রতিও আমার তুলনায় বেশি আনুকূল্য প্রদর্শন করছেন না। মুরাদ এবং দানিয়েল আমার মতোই উদ্দেশ্যহীন জীবন কাটাচ্ছে।
কিন্তু তারা তাদের সান্ত্বনার পথ ঠিকই খুঁজে নিচ্ছে।
তার মানে?
সুলায়মান বেগের একটি ভ্রূ ধনুকের মতো বেঁকে কিছুটা উপরে উঠে গেলো। ইদানিং তারা যে রকম আনন্দ-ফুর্তি করে সে সম্পর্কে নিশ্চয়ই তোমার জানা আছে? মাঝে মাঝে তারা এতো মাতাল থাকে যে নিজেদের পায়ে হেঁটে বিছানায় পৌঁছাতে পারে না। তাদের পরিচারকরা ধরাধরি করে তাঁদের কক্ষে নিয়ে যায়। দুই সপ্তাহ আগে মুরাদ বাগানের একটি খালে পড়ে প্রায় ডুবতে বসেছিলো।
