এক সময় সেলিমের দৃষ্টিসীমা থেকে জোবায়দা অদৃশ্য হলো এবং সে দ্বিতীয় বৃদ্ধাটির কাছে এগিয়ে গেলো, এখনো তার শ্বাসপ্রশ্বাস পড়ছে দেখে সেলিম কিছুটা অবাকই হলো। দড়ি দিয়ে তাকে বাঁধার সময় সেলিম লক্ষ্য করলো তার চোখের পাপড়ি কেঁপে উঠলো। সে দ্রুত তাকে বেঁধে নিজের দড়িটিও টেনেটুনে পরীক্ষা করে নিলো এবং তারপর বৃদ্ধাটিকে দুহাতে তুলে নিলো। কয়েক মুহূর্ত পরে তাঁদের দেহে বাধা রশি গুলি টানটান হয়ে উঠলো। ধীরে টেনে তাদেরকে উপরের দিকে তোলা হতে লাগলো, প্রয়োজনের সময় সেলিম তার পায়ের সাহায্যে ধাক্কা মেরে পাহাড়ের দেয়াল থেকে দূরত্ব বজায় রাখছিলো। মাঝে মাঝে পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসা পাথরের প্রসারিত অগ্রভাগের সঙ্গে সেলিম প্রবল ধাক্কা খাচ্ছিলো এবং পাথরের ঘষায় তার গায়ের চামড়া ছড়ে যাচ্ছিলো। তবে শীঘ্রই তারা উপরে পৌঁছে গেলো, রক্তে এবং কাদামাটিতে মাখামাখি হলেও এখন তারা নিরাপদ। হাকিমরা খাঁটিয়াতে করে বৃদ্ধা দুজনকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেলো এবং সেলিম দেখতে পেলো তার বাবা তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছেন, উপস্থিত সকলে দুভাগ হয়ে দুপাশে সরে দাঁড়িয়েছে। আকবরের সমস্ত মুখে একটি প্রশস্ত হাসি ছড়িয়ে রয়েছে এবং তিনি তাঁর পুত্রকে আলিঙ্গন করার জন্য তাঁর দুবাহু প্রসারিত করলেন।
সেলিম, আমি তোমার জন্য গর্বিত। আমার মনে হচ্ছে তোমার শক্তি ও সাহস আমার সমপর্যায়ে পৌঁছেছে।
সেলিমের কাছে তার পিতার প্রতিটি বাক্যকে স্বর্ণের মতো মূল্যবান মনে হলো।
*
তিন মাস পরের ঘটনা। আকবর এবং সেলিম নাসিমবাগে পাশাপাশি হাঁটছে। জায়গাটি কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের কাছাকাছি অবস্থিত। তাদের পাশের গোলাপকুঞ্জের উপর দিয়ে মৃদু বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে এবং সেই বাতাসে গোলাপের পাপড়ি ঝরে পড়ছে। ডাল হ্রদের পশ্চিম তীরে মাত্র বারো মাস আগে আকবরের নির্দেশে এই বাগানটি তৈরি করা হয়েছে। বাগানের শেষ প্রান্তের ক্রমশ নিচু হয়ে যাওয়া শানবাঁধানো ধাপ গুলিতে হ্রদের স্বচ্ছ নীল পানির ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ছে। জায়গাটি নিশ্চিয়ই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম স্থান গুলির একটি, সেলিম ভাবলো।
সেলিম কি ভাবছে সেটা যেনো আঁচ করতে পেরেই আকবর বললেন, আমার সভার পারসিকরা গর্ব করে বলে তাঁদের দেশের বাগানগুলি নাকি সবচেয়ে সুন্দর, সেগুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ বাগানটির নাম তারা দিয়েছে স্বর্গের বাগান। কিন্তু আমার মনে হয় সমগ্র কাশ্মীরটি এক বিশাল স্বর্গীয় বাগান। এর বিস্তৃত তৃণভূমি বসন্তকালে মৌভি, ক্রোকাস এবং অন্যান্য বহু বর্ণের মৌসুমি ফুলের শতরঞ্জিতে ঢাকা থাকে। এর পাহাড়গুলির মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ছোট ছোট নদী, জলপ্রপাত এবং হ্রদগুলি কতো বৈচিত্রময়!
সেলিমের বহুবার মনে হয়েছে তার বাবা কাশ্মীরে অবসর যাপন করতে এলেই কেবল সম্পূর্ণ নিরুদ্বেগ ও উৎফুল্ল থাকেন। অবশ্য এর মধ্যেও তিনি হিন্দুস্তান থেকে ডাক যোগে আসা বার্তা সমূহ শ্রবণ করে সে সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন একং শ্রীনগরে নির্মানাধীন হরিপর্বত দূর্গ পরিদর্শন করছেন। সেই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদেরও অধিক সময় দিচ্ছেন। অবশ্য সেলিমের ধারণা সেটা এই কারণে যে তারা শ্রীনগরে পৌঁছানোর প্রায় সাথে সাথেই তার বাবা আবুল ফজলকে লাহোরে ফেরত পাঠিয়েছেন প্রশাসনিক কাজে সৃষ্টি হওয়া কিছু সমস্যা সমাধানের জন্য।
আমিও তাই ভাবছিলাম বাবা। হিন্দুস্তানের বর্ষাকালের বৃষ্টি এবং গুমোট গরমের তুলনায় কাশ্মীরের এই মৃদুমন্দ বাতাস এবং সবুজ তৃণভূমি ঘেরা প্রকৃতি অনেক ভালো। এখানকার আবহাওয়া আমাকে অনেক প্রাণবন্ত করে তুলে। সেলিম একটু থামলো, বাবার খোশ মেজাজের সঙ্গে নিজের মনোভাবের মিল খুঁজে পেয়ে সে তৃপ্তি অনুভব করছে। তারপর আবার শুরু করলো, আমরা যখন এখানে আসি তখন আমি প্রকৃতির প্রতি আরো অধিক আকর্ষণ অনুভব করি। আমি কিছু শিল্পীকে দিয়ে ক্রকাস এবং অন্যান্য ফুলের স্বাভাবিক আকারের তুলনায় অনেক বড় কিন্তু পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্র অংকন করাচ্ছি যাতে করে তাদের জটিল গঠনশৈলী বুঝতে পারি। তাছাড়া আমি কিছু পণ্ডিত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়েছি পাখির ডানা ব্যবচ্ছেদ করে এটা উঘাটন করার চেষ্টা করার জন্য যে কীভাবে তারা উড়ে।
তোমার গবেষণা সংক্রান্ত আগ্রহের বিষয়ে তোমার দাদীমা আমাকে জানিয়েছেন। ফুলের ছবিগুলি আমাকে দেখিও। কাশ্মীর আমাদের পরিবারের সকলের জন্যই একটি উত্তম স্থান। এর সীমারেখার মধ্যেই আমি জানতে পেরেছি তোমার সাহস কতোটুকু এবং তোমার মন কতোটা সবল।
সেলিম কিছুক্ষণ কোনো কথা বললো না, তারা উভয়ে হেঁটে নাসিমবাগের শানবাধানো ধাপগুলি পেরিয়ে ডাল হ্রদের দীপ্তি ছড়াতে থাকা পানির কাছে এগিয়ে গেলো। তারপর বর্তমান মুহূর্তের প্রবল অন্তরঙ্গতার প্রভাবে উদ্দীপ্ত সেলিম জিজ্ঞাসা করলো, আমরা যখন লাহোরে ফিরে যাবো তখন কি আমি আরো ঘন ঘন তোমার মন্ত্রণাসভার বৈঠকে অংশ গ্রহণ করতে পারবো, সেটা বেসামরিক বা সামরিক যে বিষয়েই হোক না কেনো, যাতে আমি আরো পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারি তুমি কীভাবে সাম্রাজ্য শাসন করো?
নিশ্চয়ই আমি এ বিষয়ে চিন্তা করবো। আমি আবুল ফজলের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করবো কখনো এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে তুমি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
