পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেলিমের জন্য দড়ি নিয়ে আসা হলো এবং সে তার বহিঃপোশাক খুলে ফেলে দড়িটি তার বুকের উপর বাঁধলো। শক্ত করে ধরো, সে সুলায়মান বেগকে চিৎকার করে বললো। খাদে পড়ে যাওয়াদের টেনে তোলার জন্য আরো দড়ি তৈরি রাখো। তারপর সে ঢালের নিচে অদৃশ্য হলো।
খাদের প্রথম দশ ফুট জায়গায় সেলিম ভেজা পাথরের বিভিন্ন স্থানে হাত এবং পা রাখার মতো খাজ পেলোলা। তারপর সে যেখানে পৌঁছালো সেখানে অবস্থিত পাথরের তাকের অংশ বিশেষ মাটিতে ভরে গেছে। সেখানে পা রাখতেই উপরের আলগা মাটি এবং পাথর তার ভারে খসে পড়লো। কয়েক মুহূর্তের জন্য সেলিম ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। দড়িতে বাঁধা থাকার কারণে সে পতন থেকে রক্ষা পেলো। সে ঝুলন্ত অবস্থায় দোল খেয়ে পাথরের খাঁজে জমে থাকা আলগা মাটি এবং পাথর গুলি পায়ের ধাক্কায় সরিয়ে দাঁড়ানোর মতো শক্ত অবস্থান বের করতে সচেষ্ট হলো। পা রাখার মতো শক্ত জায়গা বেরিয়ে আসতেই সেলিম সেখানে তার পা দুটি রাখলো এবং নিচের হাওদা আটকে থাকা খাজটির দিকে তাকালো।
বর্তমানে সেলিমের দৃষ্টিপথে প্রতিবন্ধকতা অনেক কম এবং সে খাজটির উপরে দুটি মানুষকে দেখতে পেলো, উভয়েই নারী। একজন মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে এবং দ্বিতীয় জনের পাকা চুল দেখে সেলিম জোবায়দা হিসেবে চিনতে পারলো, সে উপুড় হয়ে থাকা দেহটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে।
জোবায়দা, সেলিম চিৎকার করে ডাকলো। কিন্তু বাতাস এবং বৃষ্টির শব্দে জোবায়দা সেলিমের ডাক শুনতে পেলো না। জোবায়দা, সেলিম আবার ডাকলো। এই বার বৃদ্ধাটি উপরের দিকে তাকাল এবং সেলিমকে লক্ষ্য করে হাত নাড়লো। আমি আসছি, সেলিম আবার চিৎকার করে বললো। পাহাড়ের গা ঘেষে থাকো, তাহলে অনেকটা নিরাপদ থাকবে।
কয়েক মুহূর্ত পর সেলিম দেখলো জোবায়দা অন্য মহিলাটিকে টেনে পাহাড়ের দেয়ালের কাছে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। সেলিম বুঝতে পারছিলো কাজটি জোবায়দার জন্য দুঃসাধ্য, কিন্তু তবুও সে হাল ছাড়ার পাত্রী নয়। সেলিম সময় নষ্ট করলো না, তার নড়াচড়ার কারণে যাতে আবারো পাথর বা মাটি ধ্বসে না পড়ে সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করে সে নিচে নামতে লাগলো। সে যখন মহিলাদয়ের কাছ থেকে প্রায় বারো ফুট দূরে রয়েছে তখন উপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ পেলো। কোথা থেকে পাথর পড়ছে দেখার জন্য উপরের দিকে তাকাতেই একটি বড় পাথর খও তার মুখের পাশে আঘাত করলো এবং সে তার মুখের ভেতর রক্তের স্বাদ অনুভব করলো।
সেলিম যখন তার মুখে জমে উঠা রক্তাক্ত থুতু ফেললো, শুনতে পেলো জোবায়দা তাকে চিনতে পেরে চিৎকার করে বলছে, জাহাপনা, আপনি ফিরে যান, নিজের জীবন রক্ষা করুন। আপনি তরুণ। আমরা দুজন বুড়ো হয়ে গেছি। এবং ইতোমধ্যেই আমাদের দীর্ঘ জীবন উপভোগ করা হয়ে গেছে। তার বক্তব্য অব্যাহত থাকতেই আরো পাথর এবং মাটি আলগা হয়ে গড়িয়ে পড়লো। ব্যস্তভাবে তাকিয়ে সেলিম দেখতে পেলো পাহাড়ের গা থেকে পাথর এবং মাটি আলগা হয়ে গড়িয়ে পড়াতে তার হাত এবং পা রাখার জন্য বেশ কিছু গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলির সাহায্যে সে সহজেই তাকটির উপর পৌঁছাতে পারবে। দ্রুত কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে সে তার ওজন সহ্য করতে পারবে কি না তা পরীক্ষা করে করে গর্ত গুলি ব্যবহার করে তাকটির দশ ফুট দূরত্বে পৌঁছালো, অবশিষ্ট দূরত্ব সে এখন লাফিয়ে নামতে পারবে। সে তাই করলো। এবং হাঁটু ভাজ করে জোবায়দার পাশে পতিত হলো।
সেলিম যতোটা অনুমান করেছিলো জোবায়দার অবস্থা তার চাইতেও অনেক খারাপ। তার কপালের উপর বড় একটি কাটা দাগ ফুলে উঠেছে এবং সেখান থেকে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। তার বাম হাতের অগ্রভাগের হাড় ভেঙ্গে চামড়া ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে এবং সেখান থেকেও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অন্য মহিলাটির মাথা ফেটে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সে যদি মরে না গিয়ে থাকে তাহলে অজ্ঞান হয়ে আছে। শীঘ্রই তোমাদের দুজনকে উদ্ধার করে আমি হেকিমের হাতে সোপর্দ করবো, বাস্তবে যতোটা তার থেকে একটু বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেলিম বললো। সে খুব সাবধানে ভগ্ন হাওদাটির কাছে অগ্রসর হলো যে স্থানটি রাস্তার উপর থেকে চোখে পড়ে। তারপর সে দুহাত তুলে নাড়তে লাগলো পূর্বের ঠিক করা ইঙ্গিত স্বরূপ যা দেখে উপর থেকে আরো দড়ি ফেলা হবে। কয়েক মুহূর্ত পরে পাহাড়ের তাকটির কাছে আরো দুটি দড়ি নেমে এলো। সেগুলির একটি সেলিম ধরতে পারলো কিন্তু অন্যটি তার কাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরে রয়েছে। আরো দুইবার ইঙ্গিত দেয়ার পর তার হাতের নাগালের মধ্যে আরেকটি দড়ি নেমে এলো।
সেলিম প্রথম দড়িটির সঙ্গে জোবায়দাকে বাধলো, তবে ভুল করে সে তার আহত হাতটি ধরার ফলে জোবায়দার মুখ ব্যাথায় কুঁচকে উঠলো। সাহস বজায় রাখ। সেলিম তাকে উৎসাহ প্রদানের জন্য হাসলো। আমি ইঙ্গিত দেয়ার পরে রাস্তায় অবস্থিত লোকেরা তোমাকে টেনে তুলবে। তুমি তোমার পায়ের সাহায্যে ধাক্কা মেরে পাহাড়ের দেয়াল থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখবে।
জ্বী জাহাপনা, আমি বুঝতে পেরেছি।
উপরে পৌঁছে তুমি লোকদেরকে বলবে তারা যেনো আমার দড়ি এবং অন্য দড়িটি একসঙ্গে টেনে তুলে।
জোবায়দা মাথা ঝাঁকালো এবং সেলিম আবার হাওদাটির দিকে অগ্রসর হলো জোবায়দাকে টেনে তুলার ইঙ্গিত দেয়ার জন্য। শীঘ্রই সেলিমকে স্বাস্তি প্রদান করে জোবায়দার দেহটি উপরে উঠতে লাগলো এবং সেলিমের নির্দেশ অনুযায়ী সে তার খালি পায়ে ধাক্কা মেরে মেরে পাথরের দেয়াল থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখছিলো।
