আবুল ফজল এবং তার পিতা সংক্রান্ত চিন্তায় বাধা পড়লো, সেলিম দেখলো তার সহযাত্রী সুলায়মান বেগ হাওদার পর্দাগুলি টেনেটুনে ঠিকঠাক করছে কারণ প্রবল উত্তরীয় হাওয়ার প্রভাবে বৃষ্টির ছাট হাওদার মধ্যে আসতে শুরু করেছে। কাশ্মীরের এই দ্বিতীয় অভিযানের উদ্দেশ্য যেমন ভিন্ন তেমনি আবহাওয়াও। এখানে এখন বসন্তকাল চলছে। যখন থেকে তারা সংকীর্ণ গিরিপথ এবং গিরিসঙ্কটের মধ্যে প্রবেশ করেছে তখন থেকেই অঝর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির ভারে পাহাড়ের ঢালে জন্মে থাকা বেগুনি ফুল শোভিত রডোডেন গাছ গুলি নুয়ে পড়েছে। সেলিম হাওদার পর্দার ফাঁক দিয়ে ডান দিকে তাকালো, দেখলো পাহাড়ী ঢলের পানি কাশ্মীর মুখী সংঙ্কীর্ণ সর্পিল পথের উপর তীব্র বেগে আছড়ে পড়ছে। রাস্তার বাম পাশের ভূতল প্রায় পঞ্চাশ ফুট নিচু এবং সেখানে প্রবাহিত হচ্ছে খরস্রোতা বরফ গলা নদী যাতে বৃষ্টির পানি যুক্ত হয়ে স্রোতের তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রতিবার যখন আমি তাকাচ্ছি দেখতে পাচ্ছি নদীর জলসীমার উচ্চতা বৃদ্ধি পায়েছে, সুলায়মান বেগ বললো।
হ্যাঁ। আমাদের সম্মুখে যারা রয়েছে তাবু খাটানোর জন্য শুকনো ভূমি খুঁজে পেতে তাঁদের অসুবিধা হবে।
হঠাৎ সামনের রাস্তার তীক্ষ্ম বাঁকের দিক থেকে একটি পতনের শব্দ সেলিমের কানে এলো সেই সাথে গুড় গুড় করে যেনো কিছু গড়িয়ে পড়লো এবং তারপর মানব কণ্ঠের ভয়ার্ত চিৎকার শোনা গেলো। ওটা কিসের শব্দ? নিশ্চয়ই কোনো ধরনের আক্রমণ হয়নি।
না, আমার মনে হয় ওটা ভূমিধ্বসের শব্দ। সুলায়মান বেগ উঠে দাঁড়িয়ে গভীর সঙ্কীর্ণ উপত্যকার দিকে তাকালো।
সেলিম তার দুধভাই এর আঙ্গুল দ্বারা নির্দেশিত দিকে তাকালো। মাটি এবং পথের পড়ে নদীতে আংশিক বাধ সৃষ্টি হয়েছে। ওখানে কি একটি হাতি পড়ে রয়েছে না? মাহুত, তোমার হাতিকে হাঁটতে ভর দিয়ে বসাও! সেলিম আদেশ দিলো। হাতিটি পুরোপুরি বসতে পারার আগেই সেলিম ও সুলায়মান বেগ উভয়েই মাটিতে লাফিয়ে পড়ে কাদাপানি ছিটকে সম্মুখে দৌড়ে গেলো কি ঘটেছে দেখার জন্য।
রাস্তার বাঁক ঘুরে তার স্ত্রী এবং সন্তানদের বহনকারী হাতিগুলি নিরাপদে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে দেখে সে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলো। তবে যে দুর্ঘটনাটি একটু আগে ঘটেছে তাও স্পষ্ট বোঝা গেলো। পাহাড়ের ঢাল থেকে পাথরের চাই খসে পড়ে ত্রিশ ফুটের মতো বিস্তৃত রাস্তা ভেঙ্গে নিয়ে নদীতে পড়েছে। ধ্বসে পড়া পাথর এবং মাটির মধ্যে একটি হাতির দেহের অংশ বিশেষ বের হয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে; দ্বিতীয় আরেকটি হাতির অর্ধেক দেহ নদীতে এবং অর্ধেক দেহ পারে পড়ে রয়েছে এবং সেটার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জল জানোয়ারটির রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে। সেটার ভগ্ন হাওদাটি পাশেই পড়ে রয়েছে, নদীতে ছড়ানো পাথরের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে টুকরো হয়ে গেছে। ধ্বসের পাশে জমে উঠা ভিড় ঠেলে অগ্রসর হতে হতে সেলিম জিজ্ঞাসা করলো, ঐ হাতিগুলির পিঠে কারা ভ্রমণ করছিলো?
আপনার দাদীমার পরিচারিকাদের কয়েকজন জাঁহাপনা, ভিড়ের মধ্য থেকে একজন উত্তর দিলো।
আমি পরিতাপের সঙ্গে জানাচ্ছি তাঁদের একজন ছিলো বৃদ্ধা জোবায়দা, আপনার শৈশবের একজন পরিচর্যাকারী। আপনার দাদী ভেবেছিলেন পাহাড়ের ঠাণ্ডা আবহাওয়া তার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হবে, একজন শীর্ণ দেহের অধিকারী বৃদ্ধ মন্তব্য করলো। সেলিম তাকে তার দাদীর খেদমতগার হিসেবে চিনতে পারলো। মনে হয় আমি বুঝতে পেরেছি তার হাওদাটি কোথায় পড়েছে।
নদীর তীরে যেটা চৌচিড় হয়ে পড়ে রয়েছে সেটা?
না, ওটাতে আপনার দাদীর অন্য চারজন ভৃত্য ছিলো এবং আমার ধারণা তারা সকলে মারা গেছে। তাদের একজনের দেহকে আমি নদীর স্রোতে ভেসে যেতে দেখেছি। জোবায়দার হাওদাটি সম্ভবত পতনের প্রাথমিক পর্যায়ে হাতিটির পিঠ থেকে ছুটে যায়। আমি বোধহয় সেটাকেই পাহাড়ের একটি খাজে জন্মে থাকা কিছু গাছপালার সঙ্গে আটকে থাকতে দেখেছি, তবে সেখানকার মাটি ও পাথর ক্রমশ পানির তোড়ে খসে যাচ্ছে।
সুলায়মান, আমার কোমর বন্ধনীটা ধরো, বলে সেলিম ঢালের কিনারে উপুর হয়ে শুয়ে পড়ল এবং যতোটা সম্ভব সামনে ঝুঁকে নিচে দেখার চেষ্টা করলো। সেলিম দেখতে পেলো হওদাটি পাহাড়ের খাঁজের কোথায় আটকে আছে। কিন্তু সেটার আরোহীরা কোথায়? ভূমিধ্বসের পাথর-মাটি জমে থাকার জন্য আর কিছু এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না।
সুলায়মান, শক্ত করে আমাকে ধরো। আমি চেষ্টা করছি আরো একটু ভালোমতো দেখার জন্য। যখন সেলিম আরো সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লো, সে নীচ থেকে অস্পষ্ট একটি চিৎকার শুনতে পেলো। কেউ বেঁচে রয়েছে। যারা খাদে পড়ে গেছে তাদের উদ্ধার করতে হলে দ্রুত কিছু করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি সেলিমের কাছে কিছুটা নৈরাশ্যজনক মনে হলো। পাহাড়ের ঐ খাজে কারো পক্ষে পৌঁছান সম্ভব নয়। কিন্তু তারপর তার মাথায় একটি বুদ্ধি এলো। কাদায় আটকে যাওয়া গাড়ি টেনে তুলার জন্য যে দড়ি ব্যবহার করা হয় তা নিয়ে এসো। আমি দড়ির সাহায্যে ঝুলে ওখানে নামতে চাই।
বরং আমি নামি সেলিম, সুলায়মান বেগ বললো।
না, এটা আমার দায়িত্ব। আমি জোবায়দার কাছে ঋণী, তাই আমারই যাওয়া উচিত। শৈশবে তিনি আমার অনেক যত্ন নিয়েছেন। আমার এখনও মনে আছে আমার বয়স যখন তিন তখন আমি একটি কাঁটা গাছে পাখির বাসা সংগ্রহ করতে গিয়ে আটকে গিয়েছিলাম। তখন জোবায়দা আমাকে অনেক কষ্ট করে উদ্ধার করেন।
