কিন্তু বাস্তবে ভালোবাসার কমতি ঘটলো। মান বাঈ এর যুক্তিহীন উন্মত্ত আচরণ প্রত্যক্ষ করে সেলিমের মনে নতুন করে প্রশ্ন জাগলো সে তার মামাতো বোন সম্পর্কে আর কি কি বিষয় এখনো জানে না। সেলিম আরো উপলব্ধি করলো এতোদিন সে মান বাঈ এর প্রতি যে আকর্ষণ অনুভব করত সেটা ভালোবাসার কারণে নয়- নিছক যৌনতার কারণে। মোগল রাজপ্রাসাদের জাঁকজমক এবং বিলাসিতায় তার খুশি থাকা উচিত যার প্রাচুর্য একজন রাজপুত রাজকুমারীর প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধার তুলনায় অনেক বেশি। সে ঘন ঘন তার বিছানায় গেছে যেখানে তারা ইন্দ্রিয়সুখ আদান প্রদানের ক্ষেত্রে পরস্পরের সমকক্ষ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। সেটাই মান বাঈ এর যথেষ্ট প্রাপ্তি বলে গণ্য করা উচিত। কিন্তু সেলিমের একমাত্র স্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা নিছক তার নির্বুদ্ধিতা। মান বাঈ এর অপ্রত্যাশিত ঈর্ষাকাতরতা সেলিমকে তার প্রতি ক্রমশ নিরাসক্ত করে তুলতে লাগলো। তার সঙ্গে সেলিমের মিলিত হওয়ার প্রবণতা কমে গেলো এবং তার আত্মহত্যার হুমকির অল্প কিছুদিন পরেই সেলিম যোধা বাঈকে বিয়ে করলো। তার কোমল দেহ এবং ডিম্বাকৃতি মুখ যদিও মান বাঈ এর মতো সুন্দর নয় কিন্তু তার বুদ্ধিমত্তা ও কৌতুক বোধের কারণে সেলিম না হেসে থাকতে পারতো না এবং যৌন মিলন ছাড়াও তার সঙ্গ সেলিমের ভালো লাগতো।
তার সঙ্গে যোধ বাঈ এর বিয়ে হওয়ার চার মাস পর এবং সাহেব জামালের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার অল্প আগে, মান বাঈ এর গর্ভে খোসরু এলো- মোগল রাজবংশের পরবর্তী প্রজন্মের প্রথম সন্তান। এর ফলে মান বাঙ্গ যে মর্যদা লাভ করলে তাতে তার সন্তুষ্ট হওয়া উচিত, কিন্তু সে যদি সন্তুষ্ট না হয় তাহলে সেলিমের কিছুই করার নেই এবং সে বিষয়টি নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তাও করবে না। কিন্তু সেলিম দুশ্চিন্তা থেকে অব্যাহতি পেলো না, তার মনে হতে লাগলো মান বাঈ এর স্বার্থপর মানসিকতার প্রভাব হয়তো তার সন্তানের মধ্যেও পড়বে।
আকবরের গম্ভীর কণ্ঠস্বর সেলিমের চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করলো। এই নতুন যুবরাজের জন্ম উপলক্ষ্যে এখন এসো আমরা সকলে ভোজে অংশ গ্রহণ করি। আমি খোসরু এবং সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি কামনা করছি।
ভোজসভায় তার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে আসন গ্রহণ করে, সেলিম তার নিজের সমৃদ্ধির জন্য মনে মনে প্রার্থনা করলো। সে যদি পরবর্তী মোগল সম্রাট হতে পারে তাহলে তার পুত্রদের জন্য সে কতো কিছুই না করতে পারবে।
৫.১ ব্যাপক প্রত্যাশা
পঞ্চম খণ্ড – ব্যাপক প্রত্যাশা
২০. অতল গহ্বর
আবারো প্রায় তিন বছরের বেশি সময় পরে তার প্রথম যাত্রার পর সেলিম একটি হাতির পিঠের হাওদার উপর বসে ছিলো যেটি দোদুল্যমান গতিতে কাশ্মীরের পথে এগিয়ে চলেছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের এই দীর্ঘ ভ্রমণের লক্ষ্য এখন শান্তি এবং প্রমোদ, যুদ্ধ বা বিজয়াভিযান নয়। সে এবং তার পিতা উভয়েই কাশ্মীরের সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েছে, এর শান্তিময় উপত্যকা, টলমলে স্বচ্ছ জল বিশিষ্ট হ্রদ, ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকা তৃণভূমি একং সবকিছুর উপরে এর স্বস্তিকর শীতল আবহাওয়া। সেলিমের সম্মুখে আরো এক ডজন হাতি রয়েছে, সেগুলি মোগল যোদ্ধাদের বহন করছে না, বহন করছে তার হেরেমের সদস্যদের। সবচেয়ে কাছের হাতিটিতে রয়েছে মান বাঈ, দুই বছর বয়সী খোসরুকে নিয়ে। পরের দুটি হাড়িতে রয়েছে সাহেব জামাল সঙ্গে পারভেজ, এই শিশুপুত্রটিকে সে তিন মাস আগে জন্ম দিয়েছে, তারপরে রয়েছে যোধ বাঈ। সেলিমের দল থেকে কিছুটা সামনে রয়েছে তার বাবার হেরেমের সদস্যরা। তাঁদের মধ্যে সেলিমের মা হিরা বাঈ ছিলেন না, কাশ্মীরের ঠাণ্ডা পাহাড়ী আবহাওয়াকে অবজ্ঞা করে তিনি নিজের রৌদ্রতপ্ত দেশে বেড়াতে গেছেন। কিন্তু সেলিমের দাদীমা হামিদা ছিলেন এবং সেলিম তাতেই সন্তুষ্ট। সেলিম বিয়ের পরেও তাঁকেই তার সবচেয়ে আস্থাভাজন আত্মীয় হিসেবে গণ্য করে। আকবর যথারীতি সবচেয়ে অগ্রভাগের হাতিটির পিঠে ভ্রমণ করছিলেন।
যদিও সেলিম তার বাবার সকল আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে, তার জন্য তাঁর পরিকল্পিত সকল বিয়েতে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে, তথাপিও কাশ্মীরের সুলতানকে দমন করার সময় বাবার সঙ্গে সে যে অন্তরঙ্গতা অনুভব করেছিলো তাতে ক্রমশ ভাটা পড়েছে। সে আশা করেছিলো আকবরের প্রথম নাতির জন্মদাতা হওয়ার সুবাদে আকবর তার প্রতি এবং তার সন্তানের প্রতি আরো উষ্ণ নৈকট্য প্রদর্শন করবেন। কিন্তু সেলিমকে ক্রমবর্ধমান হতাশার অন্ধকারে ডুবিয়ে তার বাবা সাম্রাজ্যবিস্তার এবং এর সাবলীল পরিচালনার বিষয়ে বেশি মনোযোগ প্রদান করেছেন এবং তাঁর দার্শনীক চিন্তাভাবনায় ব্যস্ত থেকেছেন। জ্যেষ্ঠ পুত্রকে অধিক সময় দেয়া কিম্বা তাকে প্রশাসনিক কাজে অন্তর্ভূক্ত করার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ তার পিতার মাঝে সে দেখতে পাচ্ছে না। অথচ আবুল ফজলের সঙ্গে তাঁর অন্ত রঙ্গতা অনেক বেশি, সেলিমের দৃঢ় বিশ্বাস আবুল ফজল তার চাটুকারী জিহ্বার সাহায্যে উপকারের পরিবর্তে তার পিতার ক্ষতিই সাধন করছে। যে সব প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সেলিমের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করা উচিত ছিলো ভবিষ্যতের জন্য তাকে তৈরি করার জন্য সে সব বিষয়ে তিনি আবুল ফজলের সঙ্গে পরামর্শ করেন। বিভিন্ন পদে আবুল ফজলের বন্ধু ও আস্থাভাজনরাই নিয়োগ পায়। এমনও গুজব শোনা যাচ্ছিলো যে বিভিন্ন পদে তার বন্ধুদের নিয়োগ প্রদানের সুপারিশ করার জন্য সে প্রচুর পরিমাণে ঘুষও গ্রহণ করছিলো এবং তার ভোজন বিলাসিতাও চরমে পৌঁছেছে। আবুল ফজলের বাবুর্চি সেলিমের ভূত্যকে গর্ব করে বলেছে সে নাকি দৈনিক সাড়ে তেরো কেজি খাদ্য গ্রহণ করে এবং কোনো কোনো রাতে এর অতিরিক্ত নাস্তা খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে।
