তার সৎ ভাইদের কারো মধ্যে তার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার যোগ্যতা নেই, বাবা নিশ্চয়ই সেটা বোঝেন। মুরাদ তিন মাস আগে বিয়ে করছে এবং সে তার বিবাহের প্রীতিভোজের সময় সম্পূর্ণ মাতাল হয়ে পড়ে। পরে তাকে প্রায় চ্যাংদোলা করে তার বাসরশয্যায় নিয়ে যেতে হয়েছিলো। সেলিম মুরাদের সুরাআসক্তির কথা আগেই জানতো। কিন্তু নিজের বিবাহের আসরে মাতাল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার সৎ ভাইটি তার মাতলামির অভ্যাসের বিষয়টি আকবরের কাছ থেকে গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছিলো। আকবর এতো ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে অল্প কয়েক দিন পরেই তিনি মুরাদকে সাম্রাজ্যের দক্ষিণে বিজয় অভিযানে যাওয়ার আদেশ দেন। মুরাদের উপর নজর রাখার জন্য তিনি তার সঙ্গে একজন উচ্চপদস্থ সেনাপতিকে পাঠান এবং তাকে আদেশ দেন এক ফোঁটা মদও যাতে তার পুত্রের ঠোঁট অতিক্রম না করে সেদিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে। দানিয়েলও মুরাদের পথেই অগ্রসর হচ্ছিলো। বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর আরাম আয়েশ এবং ইন্দ্রিয়সুখ চরিতার্থ করাই তার প্রধান মনোযোগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেলিমের সঙ্গে তার সৎ ভাইদের সরাসরি সাক্ষাৎ হতো না ঠিকই কিন্তু তাদের কীর্তিকলাপের গল্প তার কানে আসতো। দানিয়েল সম্পর্কে যে অভিনব ঘটনাটি সে শুনেছে সেটা হলো, তার প্রাসাদ কক্ষের সম্মুখের উঠানে অবস্থিত সবচেয়ে বড় মার্বেল পাথরের ফোয়ারাটি থেকে সে পানির পরিবর্তে গজনীর উত্তম আঙ্গুরের তৈরি মদ প্রবাহের ব্যবস্থা করেছে। দানিয়েল এবং তার বন্ধুরা নগ্ন হয়ে সেই ফোয়ারার মদে নেমে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে উঠে। মুরাদের আচরণ আরেকটু জটিল। কিছু দিন আগে সে মাতাল অবস্থায় নর্তকীদের নাচের পোশাক পড়ে শুধু তার সভাসদদের সামনেই নয়, গোয়া থেকে আগত এক পর্তুগীজ প্রতিনিধি দলের সম্মুখেও অশোভন নৃত্যকলা প্রদর্শন করে।
খোসরুকে তার একজন দুধমায়ের কোলে হস্তান্তর করতে করতে সেলিম হাসলো, সে সুলায়মান বেগের বোন। এবং সেই মুহূর্তে সে মনে মনে শপথ করলো যে তার শিশুকালে আকবর তার সঙ্গে যতোটা সময় কাটিয়েছেন সে তার পুত্রের সঙ্গে তার তুলনায় অনেক বেশি সময় কাটাবে। সে তার পিতার তুলনায় অধিক সন্তানও জন্ম দেবে- মান বাঈ ছাড়াও ইতোমধ্যে আরেকজন রাজপুত রাজকুমারী যোধ বাঈ এবং আকবরের এক সেনাপতির কন্যা সাহেব জামালের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। নিজের ক্রমবর্ধমান হেরেম নিয়ে সে আনন্দিত। আকবর সর্বদাই তাকে বিয়ের মাধ্যমে মিত্রতা তৈরির জন্য তাগাদা দিয়ে আসছিলেন কিন্তু বাস্তবে এ বিষয়ে তার বাড়তি উৎসাহের প্রয়োজন ছিলো না। যে কোনো নতুন নারী, যদি সে অল্প বয়সী এবং সুন্দরী হয় তাকে সেলিমের কাছে অনাবিস্কৃত ভূখণ্ডের মতো মনে হতো। আর রাজনৈতিক প্রয়োজনে যদি কোনো কুৎসিত মেয়েকে তার বিয়ে করতে হয় তাতেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ সকল স্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার মিলিত হতে হবে এ ধরনের কোনো বাধা ধরা নিয়ম নেই এবং সে যাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করবে সে হেরেমে একটি সম্মানজনক অবস্থান লাভ করবে। তার পিতা এমন নীতিই অনুসরণ করে আসছেন। আকবর তার বিপুল সংখ্যক স্ত্রীর জন্য গর্ববোধ করেন এবং তার বহু স্ত্রী গ্রহণের নীতি রাজ্যের শান্তি এবং সংহতিতে যথেষ্ট অবদান রাখছে। সে নিজেও একই নীতি অনুসরণ করলে সমস্যা কোথায়? সেলিম ভাবলো।
সেলিমের এই নতুন নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের পথে একমাত্র বাধা মান বাঈ, পুত্রের জন্ম উপলক্ষে আয়োজিত ভোজসভায় যোগ দিতে যাওয়ার সময় তার মনে হলো। মান বাঈ এখনো রতিক্রিয়ায় সেলিমকে উত্তেজিত এবং আগ্রহী করে তুলে কিন্তু তাকে বিয়ে করার ছয় মাস পরে আকবর যখন ঘোষণা দেন সেলিমকে আবার বিয়ে করাবেন তখন সে ঈর্ষন্বিত হয়ে পড়ে। মান বাঈ চোখের জলে বুক ভাসিয়ে তাকে দ্বিতীয় বিয়ে না করতে অনুরোধ জানায়। সেলিমের দ্বিতীয় বিয়ের দিন ঘনিয়ে এলে সে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। সেলিম তাকে বার বার বোঝানোর চেষ্টা করে যে পিতার আদেশ তাকে মান্য করতেই হবে কিন্তু এতে সে কর্ণপাত করে না। এক সময় সে চিৎকার করে বলতে থাকে সেলিম তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। এক রাতে সন্ত্রস্ত এক পরিচারক সেলিমকে হেরেমে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছে সে দেখতে পায় মান বাঈ উঠান থেকে ত্রিশ ফুট উঁচুতে অবস্থিত ঝুলবারান্দার কার্ণিশে ঝুঁকে নিচে লাফিয়ে পড়তে উদ্যত হয়েছে। আমার করুণ পরিণতির জন্য তুমি দায়ী হবে, সেলিমকে দেখে সে চিৎকার করে বলে উঠে। তুমিই আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছ। আমার ভালোবাসা কি তোমার জন্য যথেষ্ট ছিলো না? আমি এখনো গর্ভধারণ করতে পারিনি বলেই কি আমার উপর এই অবিচার করতে যাচ্ছ?
মান বাঈ এর উশকোখুশকো চুল, লাল চোখ এবং রোগা দেহ প্রত্যক্ষ করে সেলিমের এক পাগলীর কথা মনে পড়ে যায় যাকে সে মাঝে মাঝে বাজারে দেখতো। পাগলীটি জনে জনে গিয়ে তাঁদের কাছে কোনো কাল্পনিক আঘাতের জন্য গালাগালি করতো এবং ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তার দিকে ঢিল ছুড়তো। নিজের সুন্দরী রাজপুত-পত্নীর এমন বিকারগ্রস্ত চেহারা দেখে সেলিমের তাকে অচেনা মনে হয়। মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে সেলিম তাকে কার্ণিশের কাছ থেকে সরিয়ে আনে। তারপর ধৈর্য সহকারে নরম সুরে বারে বারে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে একজন মোগল যুবরাজ হিসেবে পিতার আদেশ না মানলে তার প্রতি তিনি রুষ্ট হবেন এবং তাহলে তাঁদের উভয়ের ভবিষ্যতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এবং আরেকটি বিয়ে করলেও তার প্রতি তার ভালোবাসায় একটুও কমতি হবে না।
