সেলিম তার স্ত্রীর পাশে ঘনিষ্ট হয়ে শুয়ে আছে, তার একটি হাত মেয়েটির নরম নিতম্বের উপর স্থাপিত, সে কোনো কথা বলছে না। মেয়েটির যৌন ক্ষুধা তাকে সামান্য অবাক করেছে তবে সে এ কারণে খুশি যে তার স্ত্রী বিয়ের প্রথম রাতে কোনো সংকোচ প্রকাশ না করে অত্যন্ত আগ্রহীভাবে মিলনক্রিয়া উপভোগ করেছে। বিছনায় উঠে বসে নিজের ঘামসিক্ত চুল মুখের উপর থেকে সরাতে সরাতে মান বাঈ প্রথম কথা বললো। তুমি কি ভাবছো ফুপাতো ভাই?
ভাবছি আমার স্ত্রী ভাগ্য খুব ভালো।
আমার স্বামী ভাগ্যও খুব ভালো। মান বাঈ সেলিমের ঘাড়ে হাত রাখল। সকলে আমাকে বলেছিলো তুমি খুব সুপুরুষ, কিন্তু কনের অভিভাবকরা সর্বদাই তাঁদের জন্য নির্বাচিত বরের ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলে। তাই আমার মনে সন্দেহ ছিলো। তোমাকে আমার মনে ছিলো একজন মুখবন্ধ বিব্রত চেহারার বালক হিসেবে।
পরদিন সকালে বাসর শয্যার চাদর যথাযথভাবে পরীক্ষা করে অনুমোদন দেয়া হলো এবং বাসর রাতের সাফল্যকে ঘোষণা করতে ঢাক বাজান হলো। নতুন বরকনেকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য প্রথমে হাজির হলো আবুল ফজল। আমি রাজকীয় ঘটনাপঞ্জিতে লিপিবদ্ধ করেছি যে মহামান্য যুবরাজ সেলিম গতকাল সাম্রাজ্যের উজ্জ্বল এক কুমারীরত্বের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন, তার গতানুগতিক মধুমাখা মসৃণ কণ্ঠে আবুল ফজল ব্যক্ত করলো।
সেলিম কষ্ট করে ঠোঁটে হাসি টেনে তার বক্তব্য শ্রবণ করলো, কারণ এটাই রেওয়াজ এবং আবুল ফজল প্রস্থান করলে সে খুশি হলো।
পরবর্তী দিন গুলির উৎসব আনন্দ তেমন ভাবেই উদ্যাপিত হলো যেমনটা আকবর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সাম্রাজ্যের সকল এলাকা থেকে বিবাহের শুভেচ্ছা উপহার আসতে লাগলো: মণিমাণিক্য, ইযাশম্ পাথরের থালা, রূপা এবং সোনার বারকোশ, দ্রুতগামী আরবী ঘোড়া এবং সবচেয়ে নরম পশম দিয়ে তৈরি সোনা ও রূপার কারুকাজ করা কাশ্মীরি শাল। শেষোক্ত উপহারটিও যথারীতি কাশ্মীরের অধুনা দমনকৃত সুলতানের পাঠানো উপহার। উৎসবে অধিক বৈচিত্র যোগ করতে আকবরের নির্দেশে দুটি সিংহ যোগাড় করা হয়েছিলো, সেগুলি রাজকীয় দর্প নিয়ে লাহোরের রাস্তাগুলি প্রদক্ষিণ করেছে। রবি নদীর তীরে উটের দৌড় প্রতিযোগীতার আয়োজন করা হয়। একটি প্রতিযোগীতায় সেলিম তার দুই সৎ ভাইকে পরাজিত করতে পেরে সীমাহীন সন্তুষ্টি অনুভব করে। মাটির উঁচু বাধ দেয়া ময়দানে আকবরের সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধা হাতির জোড়াকে পারস্পরের সঙ্গে লড়াই এ নামানো হয়, লড়াই চলতে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত যতোক্ষণ না তাঁদের ধূসর গা ক্ষতবিক্ষত এবং রক্তরঞ্জিত হয়ে পড়ে। মধ্যরাতের কাছাকাছি সময়ে আরম্ভ হয় আতশ বাজির উৎসব, এতো অধিক সংখ্যক বাজি উৎক্ষিপ্ত হতে থাকে যাতে করে রাত, দিনের মতো আলোকিত হয়ে উঠতে থাকে।
কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায়, যতোই চিত্তাকর্ষক বা মোহনীয় প্রদর্শনীর আয়োজন করা হোক না কেনো, সেলিম মান বাঈ এর আগ্রহী বাহুতে ধরা দেয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠতো এবং ভোরের সূর্যের উত্তাপ রাজপ্রাসাদকে উষ্ণ করতে আরম্ভ করার পূর্ব পর্যন্ত প্রেমের মহাসাগরে অবগাহন করতে থাকতো। সুলায়মান বেগ সেলিমকে এ বিষয়ে ঠাট্টা করে বলেছিলো, সে যদি তার বর্তমান তৎপরতা অব্যাহত রাখে তাহলে তার অতি সঞ্চালনশীল উরুকে প্রশমিত করার জন্য রাজ হেকিমের মলম প্রয়োজন হবে।
*
আমার সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে আদরের সন্তান, আমি তোমার নাম রাখছি। খোসরু। কথাগুলি বলে, সেলিম স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি একটি সাদা জেড পাথরের পিরিচ হাতে নিয়ে খুব সাবধানে শিশুটির মাথায় ঢাললো। কামনা করি তোমার জীবন সাফল্যের মুকুটে আবৃত হোহাক, এর নিদর্শন স্বরূপ আমি তোমার মাথায় এই জাগতিক সমৃদ্ধির প্রতীক বর্ষন করছি। শিশুটি চোখ পিটপিট করলো, তারপর স্বচ্ছ সজীব চোখে সেলিমের দিকে তাকালো। সেলিম ভাবলো যে কোনো মুহূর্তে শিশুটির আপত্তিসূচক ক্রন্দন শুনতে পাবে, কিন্তু তার পরিবর্তে খোসরু হাসলো এবং উজ্জ্বল চিত্তে হাত-পা ছুঁড়তে লাগলো। সেলিম খসরুকে, তার মখমলের গদি সহ উঁচু করে ধরলো যাতে উপস্থিত সকলে তার স্বাস্থ্যবান নবজাত সন্তানটিকে দেখতে পারে। উপস্থিত সভাসদ এবং সেনাপতিগণ মার্জিত গুঞ্জন তুলে শিশুটির দীর্ঘায়ু কামনা করলো। সেলিম তার পাশে মার্বেল পাথরের বেদীর উপর দাঁড়িয়ে থাকা আকবরের দিকে একপলক তাকালো। এই শিশুটি আকবরের প্রথম নাতি, কিন্তু তার চেহারা এখনো সুপুরুষ এবং চোয়ালে দৃঢ়তা বিরাজ করছে যদিও তাঁর বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে, তাকে সন্তুষ্ট এবং গর্বিত দেখাচ্ছে। গতকাল সেলিম একজোড়া শিকারী চিতা উপহার পেয়েছে যাদের গায়ে ছিলো মখমলের আচ্ছাদন এবং গলায় পান্নাখচিত চামড়ার মালা-নিঃসন্দেহে তার বাবার অনুমোদনের নিদর্শন। সে এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, যেহেতু এখন সে একজন পিতার মর্যাদা লাভ করেছে সেজন্য বাবা তাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্টীয় পদে অধিষ্ঠিত করবেন যাতে সে তার যোগ্যতা প্রদর্শন করার সুযোগ পায়। যদি তাকে মোগল সৈন্যদলের নেতৃত্বে নিযুক্ত করা হয় তাহলে সে শুধু তার বাবার কাছেই নয় বরং সকলের কাছে প্রমাণ করতে পারবে যে সে একজন দক্ষ যোদ্ধা এবং সেনাপতি এবং একদিন হয়তো একজন মহান সম্রাটের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।
