বিয়েটা কবে হবে বাবা?
সম্ভবত আট সপ্তাহ পরে, তোমার হবু স্ত্রীর অম্বর থেকে এখানে পৌঁছাতে এরকম সময়ই লাগবে। আকবর হাসলেন। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ থেকে অতিথিদের আসতেও ওরকম সময়ই লাগবে এবং সেই সঙ্গে অন্যান্যদের তোমার বিয়ের উপহার পাঠাতে। আমার ইচ্ছা তোমার বিয়ের অনুষ্ঠানটি লাহোরে অনুষ্ঠিত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হোক এবং ইতোমধ্যেই আমি এ বিষয়ে আবুল ফজলকে নিয়ে পরিকল্পনা করা শুরু করে দিয়েছি। উৎসবটি একমাস ধরে চলবে এবং এতে অন্তর্ভূক্ত থাকবে শোভাযাত্রা, উটের দৌড়, পোলো প্রতিযোগীতা এবং হাতির লড়াই। এছাড়া প্রতি রাতে অনুষ্ঠিত হবে ভোজসভা এবং আতশবাজীর প্রদর্শনী। এসো। এখন আমরা আবার লক্ষ্যভেদের অনুশীলন শুরু করি।
সেলিম হতাশ হলো। কারণ বাবাকে তার আরো অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করার ছিলো। কিন্তু আকবর ইতোমধ্যেই তার বন্দুকে বারুদ ভরা আরম্ভ করে দিয়েছেন।
*
মান বাঈ প্রাসাদের সোনর কারুকাজ খচিত চাদোয়ার নিচে বসে ছিলো। প্রাসাদটি অম্বর থেকে আসা অতিথিদের জন্য বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে সাজান হয়েছে। দুই দিন আগে সূর্যাস্তের সময় অম্বরের রাজপুত সেনারা সেলিমের হবু স্ত্রীকে নিয়ে দীর্ঘ শোভাযাত্রা সহকারে লাহোরে এসে পৌঁছেছে। মিছিলটির সম্মুখভাগে ছিলো ঘিয়া রঙের স্ট্যালিয়ন ঘোড়ার পিঠে উপবিষ্ট চল্লিশজন রাজপুত যোদ্ধা। তাঁদের বক্ষবর্ম এবং বর্শার শীর্ষভাগ অন্তিম সূর্যের আলোতে ঝলসে উঠছিলো। তাদের পিছনে ছিলো ছয়টি হাতি, সেগুলির রূপার মস্তক আবরণ মণিমাণিক্য খচিত এবং সোনার গিলটি করা হাওদার মধ্যে অবস্থান করছিলো মান বাঈ এর ভ্রমণকালীন ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা। এর পরেই ছিলো মান বাঈকে বহনকরী হাতিটি যার সাজসজ্জা আরো অধিক জাঁকজমকপূর্ণ। সোনার পাত মোড়া এবং টাকোয়াজ (সবুজাভ-নীল রঙের রত্ন) রত্ন খচিত হাওদাটি মাছরাঙার পাখার অনুরূপ উজ্জ্বল নীল বর্ণের রেশমের পর্দায় ঢাকা ছিলো মান বাঈকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখার জন্য। এই হাতিটিকে অনুসরণ করে উটের পিঠে চড়ে অগ্রসর হচ্ছিলো তার পরিচারিকারা। তাঁদের পিছনে ছিলো আর এক দল রাজপুত যোদ্ধা, এদের পোষাক এবং ঘোড়া উভয়ই কালো রঙের। সকলের শেষে অবস্থান করছিলো সবুজ পতাকা বহনকারী একদল মোগল নিরাপত্তা রক্ষী। রাজপুত শোভাযাত্রাটিকে পথ প্রদর্শন করা এবং তাদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আকবর তাদের পাঠিয়েছিলেন।
সেলিম সেদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেছে বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে কনের প্রসাদে যাওয়ার জন্য। আকবরের নির্দেশ অনুযায়ী সেখানে অম্বর দাশের সৌজন্যে হিন্দু রীতিতে বিবাহ অনুষ্ঠান পরিচালিত হবে। উচ্চ তারে বাজতে থাকা বাঁশি এবং ঢাকের তালে তালে আকবরের প্রিয় হাতিটির জাঁকজমকপূর্ণ হাওদায় পাশাপাশি বসে পিতা ও পুত্র অগ্রসর হচ্ছে বিবাহ অনুষ্ঠানের প্রসাদের দিকে। তাদের সম্মুখে সারিবদ্ধভাবে অগ্রসর হচ্ছে পরিচারকরা। তাঁদের হাতে ধরা বারকোশে রয়েছে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী- মণিমুক্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপাদেয় মসলা এবং কাশ্মীরের সুলতানের পাঠান শ্রেষ্ঠ মানের জাফরান।
এ সময় শেখ মোবারক এবং আরো দুজন মাওলানা কোরান তেলাওয়াত আরম্ভ করলেন এবং সেলিম তার হাতের দিকে তাকালো, অনেক ভোরে তার মা হীরাবাঈ এবং তার সহচরী সৌভাগ্যের চিহ্নস্বরূপ সেখানে মেহেদী ও হলদী পড়িয়ে দিয়েছেন। সেলিমকে একাধারে বিস্মিত ও স্বস্তি প্রদান করে তার মা নিজের ভাগ্নির সঙ্গে তার বিয়েকে স্বাগত জানিয়েছেন। এই মিলনের ফলে যে সন্তান জন্ম নেবে তার তিনচতুর্থাংশ হবে রাজপুত এমন কিছু বিবেচনা করে হয়তো তিনি আপত্তি করেননি, সেলিম ভাবলো। মাথায় পড়া বিয়ের মুকুটটির ওজন বিবেচনায় নিয়ে সেলিম একটু নড়েচড়ে বসলো। হীরা এবং মুক্তা বসান মুকুটটি আকবর নিজের হাতে তার মাথায় পড়িয়ে দিয়েছেন।
মাওলানাদের কোরান তেলাওয়াত শেষ হলো এবং শেখ মোবারক মান বাঈকে খুব কাছ থেকে মুসলিম রীতি অনুযায়ী জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি এই বিয়েতে রাজি আছেন? সেলিম তার প্রচ্ছন্ন সম্মতিসূচক বাক্য শুনতে পেলো এবং দেখলো তার মাথাটি একদিকে সামান্য কাত হলো। একজন পরিচারক লাল সবুজ রঙের গোলাপ জলের জগ নিয়ে এগিয়ে এলো এবং সেলিমের দুই হাতের একত্রিত তালুতে তা ঢাললো। তারপর আরেকজন পরিচারক তার হাতে একটি পনির পানপাত্র দিলো তাতে চুমুক দিয়ে বিবাহ বন্ধন নিশ্চিত করার জন্য। আমি এখন একজন বিবাহিত পুরুষ, সেলিম ভাবলো যখন সেই ঠাণ্ডা তরল তার গলা বেয়ে নিচে নামতে লাগলো। সবকিছু এই মুহূর্তে তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।
ভোজসভা আরম্ভ হলো সেই সঙ্গে রাজপুত নর্তকীদের নৃত্য এবং বাজিকরদের দৈহিক কসরৎ। কিন্তু সেলিম সেদিকে খুব একটা মনোযোগ দিতে পারছিলো না। জালির আড়ালে অবস্থিত রাজপরিবারের মহিলা সদস্যদের চাপা কণ্ঠের হাসির শব্দ ভেসে আসছিলো, তারাও নাচ গানের অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করছে সকলের দৃষ্টির অন্তরালে থেকে। সেলিম তার সামনে থাকা শত রকমের উপাদেয় খাদ্যের প্রতিও আকর্ষণ বোধ করছে না। ফিজন্ট পাখি এবং ময়ূরের ঝলসানো মাংস; শুকনো ফল, বাদাম এবং মসলা দিয়ে রান্না করা বিরানী ও আস্ত কচি ভেড়ার রোস্ট; পেস্তা, কাঠবাদাম, কিসমিস ও জাফরান দিয়ে তৈরি উপদেয় মিষ্টান্ন প্রভৃতি খাবার থরে থরে টেবিলের উপর সাজান রয়েছে। সর্বক্ষণ সে শুধু ভাবছে, আমাকে এই মুহূর্তটি মনে রাখতে হবে। এটা আমার স্বয়ংম্পূর্ণ পুরুষে পরিণত হওয়ার মুহূর্ত। এখন থেকে আমার নিজের সংসার হবে এবং স্ত্রী, যে আমার মায়ের সমপর্যায়ের সম্ভ্রান্ত বংশীয়। এক নতুন আত্মবিশ্বাস তার শিরা উপশিরায় প্রবাহিত হচ্ছিলো। সেলিম তার পাশে বসা ঝলমলে অবয়বের দিকে তাকালো, এই নতুন নারীটিকে আবিষ্কার করার ভাবনায় তার সমগ্র দেহে উত্তেজনার তরঙ্গ প্রবাহিত হলো।
