করে সন্ধির আবেদন করে। সেলিমের মনে পড়ে গেলো সেই ক্ষণটির কথা যখন সুলতান মাথা নিচু করে আকবরের রক্তলাল নিয়ন্ত্রণ তাবুর সম্মুখে মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো এবং মোগল সম্রাটের নামে খুতবা পাঠ করা হচ্ছিলো। আকবর সুলতানকে জীবন ভিক্ষা দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু সেই সঙ্গে কাশ্মীরের উপর দৃঢ় মোগল নিয়ন্ত্রণও আরোপ করেছেন। তবে এই
বিজয় বা সাম্রাজ্যের সীমা বর্ধনে আত্মতৃপ্তিবোধ না করে আকবর ইতোমধ্যেই সিন্ধু আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা শুরু করেছেন।
কিন্তু আমি কাকে বিয়ে করবো?
আমার উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা করে আমি তোমার মামাতো বোন মান বাঈকে তোমার স্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করেছি। তার পিতা অম্বরের রাজা ভগবান দাশ ইতোমধ্যেই আমার প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন।
সেলিম তার বাবার দিকে তাকালো। মান বাঈ তার আপন মামাতো বোন। সে তাকে একবারই দেখেছে যখন তারা উভয়েই শিশু ছিল এবং তার কেবল একটি শান্তশিষ্ট, পাতলা গড়ন ও লম্বা লম্বা পা বিশিষ্ট এবং মাথার চুল বেনি করা মেয়েকে মনে আছে।
তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ অবাক হয়েছে। আমি ভেবেছিলাম এই মধ্যবর্তী অবস্থান থেকে পূর্ণপুরুষে রুপান্তরিত হতে তুমি আগ্রহী হবে। তাছাড়া আমি শুনেছি বাজারের মেয়েদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার বিষয়ে তোমার যথেষ্ট উৎসাহ রয়েছে।
সেলিমের মুখ লজ্জায় আরক্ত হলো। সে এতোদিন মনে করত তার গোপন অভিযান সম্পর্কে কেউ অবগত নয়। কাশ্মীর থেকে ফেরার পথে সে এবং সুলায়মান বেগ রাতের বেলা তাদের তাবু থেকে বের হয়ে সহযাত্রীদের মধ্যে ইচ্ছুক কোনো মেয়ে পাওয়া যায় কি না তার সন্ধান করতো। এক রাতে তাদের অনুসন্ধান সফল হয় এবং সেলিম এক দারুচিনি ঘ্রাণ বিশিষ্ট তুর্কি রমণীর কাছে তার কৌমার্য হারায়। জায়গাটি ছিলো ঠাণ্ডা বায়ু প্রবাহিত এক গিরিপথ। লাহোরে ফিরে এসে তারা দুজন রাতের বেলা গোপনে রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে একই রকম অভিযান চালাতে থাকে লাহোর শহরে। একটি নির্দিষ্ট সরাইখানায় সে গীতা নামের নধর দেহের অধিকারী এক নর্তকীর সন্ধান পায়। তার বক্ষযুগল উঁচু এবং সুগোল এবং সে মিলনের কলাকৌশল সম্পর্কে বিশেষ পারদর্শী। আর সুলায়মান বেগও তার বোনের তত্ত্বাবধানে ভালোই সময় কাটাতো। পরে কঠিন গোপনীয়তায় প্রাসাদে ফিরে তারা নিজেদের শৌর্য সম্পর্কে অতিরঞ্জিত গল্প বলে একে অন্যকে নিজের তুলনায় দুর্বল প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করতো। কিন্তু বাজারের কোনো মেয়েকে নাড়াচাড়া করা এবং একজন স্ত্রী গ্রহণ করার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।
আমি সত্যিই অবাক হয়েছি। বিয়ের চিন্তা আমার মনে একদম আসেনি…
এখনো তোমার বয়স খুব একটা বেশি নয়, কিন্তু এই চিন্তা তোমার করা উচিত। আমাদের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত এবং সম্মানিত জায়গীদারদের সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনের মাধ্যমে আমাদের সাম্রাজ্যের ভিত আরো শক্ত হবে। আমাদের বিপদের সময় তারা আমাদের সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করবে এই জন্য নয় যে তারা আমাদের ভালোবেসে বরং এই জন্য যে এতে তাদেরও উপকার হবে। আকবর থামলেন, তাঁর দৃষ্টি সেলিমকে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি তার পুত্রের সঙ্গে এতো আন্তরিকভাবে কদাচিৎ কথা বলেন। আমাদের বিরুদ্ধে খুব অল্প সংখ্যক বিদ্রোহের ঘটনা ঘটছে আজকাল এবং প্রতি বছর আমরা আরো অধিক ধনসম্পদের অধিকারী হয়ে উঠছি। এসব কেনো ঘটছে বলে তুমি মনে করো? তাছাড়া ওলামারা এখন কেনো আর আমার ধর্মীয় সহনশীলতা নিয়ে খোলা মেলা ভাবে প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না অথবা আমার হিন্দু স্ত্রীগণের বিষয়ে নাক গলায় না বা দিন-ই ইলাহী কে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে না? এ সব কিছুর প্রধান কারণ বৈবাহিক মৈত্রীর মাধ্যমে আমি এমন শক্তিশালি অবস্থান গড়ে তুলেছি যাতে আক্রমণ করার সাহস কারো নেই। আমার বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করো সেলিম, এটা তোমার নিজস্ব ইচ্ছা বা অনন্দ উপভোগের বিষয় নয়। তার জন্য তুমি নিজের রক্ষিতা সম্বলিত হেরেম গড়ে নিতে পারো। এটা দায়িত্বের প্রশ্ন। তোমার মাকে আমি আমার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছি।
বিয়ে সম্পর্কে তার বাবার দৃষ্টিভঙ্গী আকর্ষণ, আবেগ, ভালোবাসা এবং আনন্দ বর্জিত, সেলিম ভাবলো। অথচ তার দাদীর দৃষ্টিভঙ্গী সম্পূর্ণ বিপরীত। দাদা হুমায়ূন এবং তার মাঝে যে পারস্পরিক ভালোবাসা এবং সহযোগীতার সম্পর্ক ছিলো সে গল্প তিনি বহুবার সেলিমকে শুনিয়েছেন। সম্ভবত তার মায়ের সঙ্গে বাবার ভালোবাসাহীন সম্পর্কই এই আবেগহীনতার মূল কারণ। এই বৈবাহিক সম্পর্ক যেহেতু রাজনৈতিক মৈত্রী ব্যতীত প্রকৃত প্রেম-ভালোবাসা প্রসব করতে পারেনি তাই বাবা হয়তো তার পরবর্তী স্ত্রীদের কাছেও নিজেকে সম্পূর্ণ মেলে ধরতে পারেননি। তিনি তাঁর স্ত্রীদের কারো প্রতিই কখনোও ভালোবাসার উচ্ছ্বাস বা আবেগ প্রকাশ করেননি, বরং বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে যে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জিত হয়েছে তা নিয়েই বেশি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
যাইহোক, মা হীরাবাঈ নিশ্চয়ই এই বিয়েতে অত্যন্ত খুশি হবেন। মান বাঈ এর গর্ভে যে সন্তান জন্ম নেবে সে হয়তো ভবিষ্যতে মোগল সম্রাট হবে। এবং একজন মোগলের তুলনায় তার মধ্যে রাজপুত রক্তের প্রভাবই বেশি থাকবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে নিজ ভাই ভগবান দাশ সম্পর্কে হীরাবাঈ এর মন্তব্যটি সেলিমের মনে পড়ে গেলো: মানুষকে যে কোনো সময় কেনো যায়… সবসময় যেমন হয় তেমন ভাবেই সেলিমের মন সন্দেহ এবং অনিশ্চয়তার মেঘে ছেয়ে গেলো, তবে সে অনুভব করছিলো তার খুশি হওয়া উচিত যেহেতু তার পিতা তার জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ রাজ সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন। সে নিজের চেহারায় কৃতজ্ঞতার ভাব আনার চেষ্টা করলো- অন্তত তার হৃদয়ে সে তেমনই অনুভব করছে।
