ত্রিশ গজ দূরে থাকা আরেকজন কাশ্মীরিকে লক্ষ্য করে সেলিম তীর ছুড়লো। তবে এবারে তার তীরটি লক্ষ্যচ্যুত হয়ে অশ্বারোহীটির ঘোড়ার ঘাড়ে বিধলো। মাথা ঝাঁকিয়ে তীব্র হ্রেষাধ্বনি দিয়ে ঘোড়াটি একপাশে আছড়ে পড়লো, সেটার আরোহী হাতের বর্শা ফেলে প্রাণপণে ঘোড়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিলো। একটি পতনের শব্দের সঙ্গে সেলিম অনুভব করলো তার হাওদাটি ভীষণভাবে দুলে উঠলো। পেছনে তাকিয়ে সে দেখতে পেলো তার দ্বিতীয় দেহরক্ষীটি হাওদার মেঝেতে পড়ে আছে। ইতোমধ্যে সুলায়মান বেগ তার ডান উরুতে সৃষ্ট গুলির ক্ষততে একটি হলুদ রুমাল জড়িয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করছে।
আবার সামনের দিকে তাকিয়ে সেলিম দেখলো মোগল অশ্বারোহীবাহিনীর একটি শক্তিশালী সঙ্বদ্ধ দল কাশ্মীরিদের আঘাত হানতে অগ্রসর হচ্ছে। রাজকীয় দেহরক্ষীদের একজন দলপতি অব্যর্থ নিশানায় স্থূলকায় এবং ঘন দাড়ি বিশিষ্ট এক কাশ্মীরির দিকে তার বর্শাটি ছুঁড়ে মারলো এবং বর্শাবিদ্ধ হয়ে কাশ্মীরিটি ঘোড়া থেকে পড়ে গেলো। মোগল সেনার যুদ্ধকুঠারের আঘাতে আরেকজনের মস্তক ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। সেলিম অনুভব করলো যুদ্ধক্ষেত্রে মোগলদের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার হাতিটি প্রবলভাবে দুলে উঠলো। হাতিটির কানের পেছনে বসে থাকা দ্বিতীয় মাহুতটিও আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেছে। প্রবলবেগে ড় নাড়তে নাড়তে মাহুতবিহীন জানোয়ারটি সংঘর্ষের এলাকা থেকে সরে যেতে লাগলো এবং যাওয়ার সময় একজন মোগল অশ্বারোহীকে ধাক্কা মেরে তার ঘোড়া থেকে ফেলে দিলো। এই মুহূর্তে সেলিম যদি কোনো ব্যবস্থা না নেয় তাহলে হাতিটি আরো সৈন্যকে হতাহত করবে এবং ঘোড়াগুলিকে আতঙ্কিত করবে।
চারপাশের ভয়ানক সংঘর্ষ এবং চিৎকার উপেক্ষা করে সেলিম দ্রুত তার হাওদার সমানের কাঠের কার্ণিশ টপকালো। তারপর দুদিকে পা দিয়ে কসরৎ করে হাতিটির ঘাড়ের উপর বসে ঘষটে ঘষটে সেটার কানের পিছনের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হতে লাগলো। জায়গামতো পৌঁছে হাতিটির মাথার ইস্পাতের শিরোস্ত্রাণ ধরে নিজেকে স্থির করলো। তারপর খাপ থেকে তলোয়ার টেনে নিয়ে উল্টো করে ধরে সেটার হাতলের সাহায্যে মাহুতরা যেভাবে হাতির মাথায় টোকা দেয় শান্ত করার জন্য সেভাবে ঠুকতে লাগলো। এসময় তলোয়ারের ধারালো অংশে ঘষা লেগে কয়েক জায়গায় তার হাত কেটে গেলো। হাতিটি তার ঘাড়ের উপর পুনরায় সওয়ারীর ওজন অনুভব করে এবং মাথায় থামার সংকেত স্বরূপ টোকা খেয়ে ক্রমশ স্থির হয়ে এলো। উ ভ্রান্ত হাতিটি ইতোমধ্যে লড়াই এর কেন্দ্র থেকে পঞ্চাশ গজের মতো দূরে সরে এসেছে। সেদিকে তাকিয়ে সেলিম দেখলো আক্রমণ শেষে যে সব কাশ্মীরি এখনোও জীবিত রয়েছে তার রণেভঙ্গ দিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের অনেকেই পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে পালাতে সক্ষম হলো না। সেলিম দেখলো ঘিয়া রঙের পাগড়ি পড়া এক কাশ্মীরি তাকে ধাওয়া করা মোগল সেনাদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারবে না বুঝতে পেরে তার কালো ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে মোগলদের দিকে পুনরায় ধেয়ে এলো। একজন মোগল সেনা তার তলোয়ারের আঘাতে নিহত হলো ঠিকই কিন্তু তারপর সে নিজেও মাথায় তলোয়ারের আঘাত পেয়ে লুটিয়ে পড়লো।
সেইদিন সন্ধ্যায় আবার সেলিমের ডাক পড়লো আকবরের যুদ্ধ সংক্রান্ত সভায়। এবারে সে যখন রক্তবর্ণের যুদ্ধনিয়ন্ত্রণ তাবুতে প্রবেশ করলো দেখতে পেলো তাকে ছাড়াই আগের মতো সভা আরম্ভ হয়ে যায়নি। বরং সে সেখানে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে সকলের দৃষ্টি তার উপর নিবদ্ধ হলো এবং তার বাবার নেতৃত্বে উপস্থিত সেনাপতিরা তাকে উদ্দেশ্য করে করতালি প্রদান করতে লাগলো। আকবরের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে সে তার বাবার সিংহাসনের পাশে স্থাপিত টুলের দিকে অগ্রসর হলো। তার মনে এ বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ রইলো না যে আর কর্মকাণ্ডে তার পিতা সন্তুষ্ট কি না।
.
১৯. কৌমার্যের রত্ন
তোমার বয়স বর্তমানে পনেরো। এখন তোমার প্রথম স্ত্রী গ্রহণ করার সময় হয়েছে। সেলিম উত্তর দিতে পারার আগেই আকবর লক্ষ্যবস্তু পর্যবেক্ষণ করতে এগিয়ে গেলেন। তারা লাহোর রাজপ্রাসাদের সামনে অবস্থিত কুচকাওয়াজের ময়দানে রয়েছে এবং সেলিম ও আকবর গাদাবন্দুক ছোঁড়ার অনুশীলন করছে। একটি গাছের গুঁড়ির উপর রাখা মাটির পাত্রকে লক্ষ্য করে এই মাত্র সেলিম গুলি করেছে। তিনশ গজ দূর থেকে সে দেখতে পাচ্ছে তার বাবা মধ্যের পাত্রটি আগেই গুলি করে ভেঙ্গেছেন। তিন মাস আগে কাশ্মীর বিজয় করে ফেরার পর থেকে আকবর অনেক বার তাকে শিকার, বাজপাখি উড়ানো এবং বন্দুক ছোঁড়ার অনুশীলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
সেলিম তৎক্ষণাৎ তাকে অনুসরণ করলো। বাবা, তুমি কি বললে?
বলেছি তোমার বিয়ে করার সময় হয়েছে। তোমার বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি আমাদের কাশ্মীরের মহান বিজয়ের উৎসব উদ্যাপন করতে চাই। তাছাড়া সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ শক্ত করার জন্যেও আমি নাতিদের মুখ দেখতে চাই। আকবর হাসলেন। সেলিম জানতো আকবর ভাবতে পারেননি কাশ্মীর এতো সহজে তাঁর করতলগত হবে। কাশ্মীর রাজ্যের চারদিক ঘিরে থাকা পাহাড়ের প্রাচীর মোগল বাহিনীর দুর্দমনীয় ঐকান্তিকতার কাছে কোনো প্রতিবন্ধকতা নয় এই বাস্তবতা অনুধাবন করে কাশ্মীরের সুলতান সময় নষ্ট
