আঠারো ঘন্টা পর বর্তমানে পাহাড়ের ঢাল ছেয়ে থাকা রডোডেনড্রন ফুলের দিকে তাকিয়ে সেলিম এখনোও সেই উত্তেজনা অনুভব করছে। হঠাৎ সবচেয়ে ঘন বিন্যস্ত ঝোঁপ যেখানে রয়েছে তার পেছনে সে নড়াচড়া দেখতে পেলো। ওখানে কি হলো? শত্রুরা নয়তো? সেলিম সুলায়মান বেগকে জিজ্ঞাসা করলো।
না, ওটা সামান্য একটা হরিণ, তার দুধভাই উত্তর দিলো। তার ধারণাকে সত্য বলে প্রমাণ করতেই যেনো ঝোঁপের পিছন থেকে একটি হরিণ লাফিয়ে বেরিয়ে এলো। এক সৈনিক তীর ছুঁড়ে সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে হত্যা করলো।
অন্তত কিছু লোকের ভাগ্যে আজ রাতে ভালো খাবার জুটবে, কি বলল সুলায়মান?
দশ মিনিট পর দূরে তাকিয়ে সেলিমের মনে হলো সে আবারো গাছপালার মধ্যে নড়াচড়া দেখতে পেলো। জায়গাটি পর্বতশীর্ষের গাছের সারি বিশিষ্ট সরু ভূমিরেখার উপরে অবস্থিত এবং প্রায় এক মাইলের মতো দূরে। যেহেতু আগের বার তার ভুল হয়েছিলো তাই এবার সংযতভাবে সে সুলায়মান বেগের হাত ধরে সেদিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো এবং ফিসফিস করে বললো, তুমি কি কিছু দেখতে পাচ্ছ?
সুলায়মান উত্তর দিতে পারার আগেই স্পষ্ট বোঝা গেলো সেটা কোনো হরিণ নয়। সেই মুহূর্তে একজন মোগল তথ্যসংগ্রহকারীর শিঙ্গার দূরাগত আর্তনাদ শোনা গেলো এবং সেলিমের দেখা পর্বতশীর্ষের সেই জায়গাটিতে তাকে ঘোড়া পিঠে চড়ে হাজির হতে দেখা গেলো। তৎক্ষণাৎ উন্মত্তভাবে হাত-পা চালিয়ে সে তার ঘোড়াটিকে গাছপালা ঝোঁপঝাড়ের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচের দিকে ছোটালো। তার পেছনে বন্দুকের গুলির শব্দ হলো। সেই মুহূর্তে তাকে ধাওয়াকারী কাশ্মীরি সৈন্যরা সেখানে আবির্ভূত হলো। মোগল তথ্য সংগ্রাহকারীটি এঁকে বেঁকে ঘোড়া ছোটানো সত্ত্বেও শত্রুপক্ষের একজন কালো ঘোড়ার সওয়ারী তার অত্যন্ত কাছে চলে এলো। মোগলটির কাছ থেকে প্রায় বিশ গজ দূরে কাশ্মীরিটি থমকে গেলো এবং কিছু নিক্ষেপ করলো-সম্ভবত ছোরা-এবং মোগলটি ছুটন্ত ঘোড়ার উপর থেকে পড়ে গেলো।
ইতোমধ্যে আরো কাশ্মীরিকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মোগল সৈন্যদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেলো ঝোপঝাড় মাড়িয়ে। পাশের দিকে থাকা মোগল অশ্বারোহীরা তাদের ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে আক্রমণকারীদের দিকে ফিরলো এবং ঘোড়ার পিঠে থাকা বন্দুকধারীরা লাফিয়ে মাটিতে নেমে তাদের বন্দুক প্রস্তুত করতে লাগলো। কোনোভাবে কাশ্মীরিরা আব্দুল রহমানের তথ্যসংগ্রকারীদের ব্যুহ ভেদ করেছে, হয়তো তাঁদের সবাইকে হত্যা করেছে কোনো প্রকার সংবাদ প্রেরণের আগেই একমাত্র তাকে ছাড়া যে একটু আগে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসছিলো।
সেলিমের হৃদস্পন্দন দ্রুততর হলো এবং সে অনুভব করলো তার সমস্ত ইন্দ্রিয় উদ্দীপ্ত হয়ে উঠছে। তার হাওদার পিছনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন দেহরক্ষী গুলি করার জন্য তাদের বন্দুক প্রস্তুত করছে। তার সামনে অবস্থিত হাতিগুলির আরোহীরাও একই কাজে ব্যস্ত। প্রত্যেক হাতির কানের পিছনে দুজন করে মাহুত বসে আছে এবং তারা চেষ্টা করছে। হাতিগুলির মুখ শত্রুদের দিকে ফেরাতে, কারণ এতে করে শত্রুদের লক্ষ হিসেবে তাদের আকার অপেক্ষাকৃত ছোট হয়ে আসবে। হঠাৎ সেলিমের সামনে থাকা দুই নম্বর হাতির পিঠ থেকে একজন সৈন্য নিচে পড়ে গেলো, সে ঘাড়ের উপর তীরবিদ্ধ হয়েছে। মাটিতে পড়ে যাওয়া সৈন্যটির পেছনের হাতিটি সাবধানে তার উপুড় হয়ে পড়ে থাকা শরীরটিকে পাশ কাটিয়ে গেলো যদিও হয়তো ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়েছে। এসময় সেলিম দেখতে পেলো ইস্পাতের বক্ষবর্ম এবং মাথায় ময়ূরের পালক গোজা গম্বুজাকৃতির শিরোস্ত্ৰাণ পরিহিত কাশ্মীরি যযাদ্ধারা সঙ্বদ্ধভাবে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে মোগল অশ্বারোহী বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তাদের নেমে আসার তীব্র গতির ধাক্কায় বেশ কিছু মোগল সৈন্য তাঁদের ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলো। কিছু কাশ্মীরি যখন মোগল অশ্বারোহীদের ব্যুহ ভেদ করে হাতিবাহিনীর দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিলো তখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আরো অধিক সংখ্যক কাশ্মীরি নেমে এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছিলো। তাঁদের কেউ কেউ সবুজাভ-নীল রঙের যুদ্ধ পতাকা বহন করছিলো। মাঝে মাঝে একজন দুজন কাশ্মীরি বা তাদের ঘোড়া মোগলদের ছোঁড়া গুলি বা তীরের আঘাতে পড়ে যাচ্ছিলো।
একজন সবুজ পাগড়ি পরিহিত মোগল সেনাকর্তাকে একজন পতাকা বহনকারী কাশ্মীরিকে আক্রমণ করতে দেখা গেলো। মোগলটি তার চোখ বরাবর তলোয়ার চালালো এবং আঘাতের কারণে দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে কাশ্মীরিটি ঘোড়া থেকে পড়ে গেলো। কিন্তু আরেকজন কাশ্মীরি সেনাকর্তাটির পেট লক্ষ্য করে তার বর্শা চালালো যখন সে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে ফিরে আসার উদ্যোগ নিচ্ছিলো। মোগলটি তার ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলো কিন্তু তার পা রেকাবে আটকে রইলো এবং তার ঘোড়াটি কাশ্মীরি বাহিনীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় তার মাথা মাটিতে বাড়ি খেতে খেতে অগ্রসর হলো। অবশেষে তার দেহটি অগ্রসরমান কাশ্মীরি যোদ্ধাদের ঘোড়ার খুরের নিচে পিষ্ট হতে থাকলো।
অন্য কাশ্মীরি অশ্বারোহীরা এখন সেলিমের হাতির কাছ থেকে মাত্র পঞ্চাশ গজের মতো দূরে রয়েছে। সজোরে তাঁদের ঘোড়ার পাজরে লাথি মেরে তারা মোগল অশ্বারোহীদের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে এবং দুপাশে প্রবলভাবে তলোয়ার চালাচ্ছে। সেলিম এবং সুলায়মান উভয়েই তাঁদের ধনুকের ছিলো টেনে তীর ছুড়লো, একই সঙ্গে তাদের পিছনে অবস্থিত দেহরক্ষীরা বন্দুকের গুলি ছুড়লো। সেলিম যে অগ্রবর্তী কাশ্মীরিটিকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়েছিলো তার গালে তীরটি বিধলো এবং সে ঘোড়ার উপর থেকে পড়ে গেলো। সেলিম উল্লসিত হয়ে উঠলো। কিন্তু তার উল্লাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। তার পেছনে অবস্থিত দেহরক্ষীদের একজন যার নাম রাজেশ, সে নিজের গলা আঁকড়ে ধরে হাওদা থেকে নিচে পড়ে গেলো। কয়েক মুহূর্ত পর তার হাতিটির কানের পিছনে বসে থাকা দুজন মাহুতের একজনও আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলো। তাদের সামনের হাতিটি তখন সেটার মাহুতদের নির্দেশে কাশ্মীরিদের দিকে ঘুরছিলো এবং সেটার পায়ের নিচে তার হাতির মাহুতটি করুণভাবে পিষ্ট হলো।
