এবার আকবর এগিয়ে গেলেন। ওর কাঁধের কাছটা শক্ত করে ধরে রাখো, তিনি আদেশ দিলেন। আমরা এখন দেখবো যে বেদনা সে অন্য একজনকে দিতে চেয়েছিলো তা সে নিজে কীভাবে সহ্য করতে পারে।
তারপর সঞ্জীবের ডান হাতটি কনুই এর ঠিক উপরে ধরে আকবর তার হাতের অগ্রভাগটি আগুনে প্রবেশ করালেন। সঞ্জীবের গগন ভেদী চিৎকারে চারদিক প্রকম্পিত হলো। সে সর্বশক্তিতে আকবরের কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইলো কিন্তু তিনি ইস্পাতদৃঢ় মুষ্ঠিতে তার হাতটি আরো একটু সময় আগুনের মধ্যে ধরে রাখলেন। সঞ্জীবের ক্রমাগত উচ্চ হতে থাকা আর্তনাদ এবারে পশুর চিৎকারের মতো শোনালো। বিধবা মেয়েটি পর্যন্ত এই দৃশ্য আর সহ্য করতে পারছিলো না।
হঠাৎ সঞ্জীব অজ্ঞান হয়ে গেলো এবং আগুনে কাঠ পোড়র শব্দ ছাড়া চারদিকে আর কোনো শব্দ রইলো না। সঞ্জীবের নিস্তেজ দেহটিকে দুহাতে ধরে আকবর আগুনের কাছ থেকে সরিয়ে আনলেন। তার ডান হাতটি মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে। তিনি পোড়া হাতটি কয়েক মুহূর্ত উঁচু করে ধরে রাখলেন যাতে উপস্থিত সকলে সেটা ভালো মতো দেখতে পারে, তারপর সঞ্জীবের দেহটি ছেড়ে দিলে তা মাটিতে আছড়ে পড়লো। এরপর আকবর গ্রামবাসীদের কিছু বলার জন্য ঘুরলেন, তারা একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে বেশ আতঙ্কিত, পরস্পরের সঙ্গে জড়াজড়ি করে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেনো একদল ভেড়া নেকড়ের উপস্থিতি টের পেয়েছে।
তোমরা আমার ন্যায় বিচার প্রত্যক্ষ করলে। আমি আশা করি আমার আইন সকলে মান্য করবে, তা না হলে আইন ভঙ্গকারীদের ভয়াবহ শাস্তি প্রদান করা হবে। তোমরা সকলে এই লোকটির মতোই অপরাধী। আকবর আঙ্গুলি নির্দেশ করে সঞ্জীবকে দেখালেন, তখন তার জ্ঞান ফিরে আসছে এবং তার মুখ দিয়ে যন্ত্রণাকাতর শব্দ বের হচ্ছে। তোমরা সকলে জানতে একটি নির্দোষ মেয়েকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং তা প্রতিরোধ করার জন্য তোমরা কিছুই করোনি। আমি সঞ্জীবের মতো তোমাদের আগুনের স্বাদ অনুভব করাবো না কিন্তু আমি তোমাদের দশ মিনিট সময় দেবো তোমাদের জিনিসপত্র এবং গবাদি পশু সরিয়ে ফেলার জন্য। তারপর আমার লোকেরা তোমাদের সমগ্র গ্রামটিকে একটি জ্বলন্ত চিতায় পরিণত করবে। পরবর্তী সময়ে তোমরা যখন এই গ্রামটি পুননির্মাণ করার জন্য পরিশ্রম করবে তখন তোমরা তোমাদের ম্রাটের আদেশ অমান্য করার পরিণতি কি হতে পারে সে বিষয়ে চিন্তা করার সময় পাবে।
কিছু সময় পরে সারা গ্রাম দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো। শকুন্তলা একজন রক্ষীর ঘোড়ার পিছনে বসে ছিলো। শালীনতা রক্ষার জন্য বড় আকারের একটি রুমাল দিয়ে তার মাথা ঢাকা রয়েছে। দলটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ফিরতি পথ ধরেছে। সেলিম লক্ষ্য করলো মেয়েটি এক বারও তার দীর্ঘদিনের বাসস্থানের দিকে ফিরে তাকাল না। নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে সে অনুভব করলো নিজেকে এতোটা গর্বিত তার আগে কখনোও মনে হয়নি এবং সে অকবরের পুত্র এবং একজন মোগল হওয়ার জন্য আনন্দ বোধ করলো।
*
বাবাকে অত্যন্ত চমৎকার লাগছিলো। আমি তাকে এতো ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের সঙ্গে আগে কখনোও বিচার কাজ সম্পাদন করতে দেখিনি। রাজসভার গতানুগতিক ধীর, জড়ো এবং আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের তুলনায় তা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার পিতার হিন্দু বিধবাটিকে রক্ষা করার পর থেকে সেলিম ঘটনাটি স্মরণ করে ভীষণ অনুপ্রাণিত বোধ করছিলো। বিশেষ করে তাৎক্ষণিক ভাবে কি বলতে হবে বা করতে হবে সে সম্পর্কে তার বাবার প্রজ্ঞা তাকে অভিভূত করেছে। সেটাই প্রকৃত ক্ষমতার বহিপ্রকাশ।
তিনি আমাদের ভূখণ্ডে প্রচলিত অত্যন্ত প্রাচীন রীতির উপর অন্যায় হস্ত ক্ষেপ করেছেন, হীরাবাঈ ঠাণ্ডা স্বরে বললো।
কিন্তু বাবা তো হিন্দুদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। মাত্র কয়েকদিন আগে আমি কয়েকজন মাওলানাকে তার সহনশীলতার সমালোচনা করতে শুনেছি। একজন মাওলানা বলছিলেন বাবা যমুনা এবং গঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত এলাহাবাদে হিন্দুদের একটি তীর্থস্থানে নিজে উপস্থিত থেকে প্রার্থনা করবেন। আরেকজন মাওলানা অভিযোগ করছিলো তিনি নাকি আগুন, পানি, পাথর এবং গাছের পূজা করারও মানসিকতা রাখেন…এমনকি পবিত্র গরুগুলিকে তিনি তার শহর এবং গ্রামগুলিতে মুক্তভাবে চলাফেরা করার ব্যাপারেও অনুমোদন দিয়েছেন এবং সেগুলির গোবর….
তোমার বাবার মনে যখন যা ইচ্ছা হয় তিনি সেটাই বাস্তবায়ন করেন। সতীদাহ প্রথার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার তার নেই। এটা তার এক্তিয়ারভূক্ত বিষয় নয়।
আমার মনে হয় সতীদাহের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার তার রয়েছে। কারণ তিনি এই প্রথা নিষিদ্ধ করেছেন। ঐ গ্রামের লোকেরা তার আদেশ অমান্য করতে চেয়েছিলো।
তারা তোমার বাবার চেয়েও উচ্চতর প্রভুর আদেশ পালন করছিলো। এটা তাঁদের অবাধ্যতা নয় বরং দায়িত্ব ছিলো। হীরাবাঈ এর কথা গুলি সেলিমকে মনে করিয়ে দিলো সঞ্জীব তার কৃতকর্মের বিষয়ে যে যুক্তি প্রদর্শন করেছিলো এবং জেসুইটরা তাঁদের গির্জার নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডের বিষয়ে যে যুক্তি প্রদর্শন করে, উভয়ই তার কাছে বর্বরতা বলে মনে হয়। সেলিম কোনো মন্তব্য না করে হীরাবাঈ এর বক্তব্য শুনতে লাগলো। আমার লোকেরা- তারা তোমারও স্বজাতীয় রাজপুতরা সতীদাহ প্রথা পালন করে আসছে প্রায় সময়ের আরম্ভ থেকে। আমি যখন বালিকা ছিলাম তখন বহুবার দেখেছি সম্ভ্রান্ত রাজপুত বিধবারা তাদের মৃত স্বামীর মাথা কোলের উপর নিয়ে জীবন্ত অবস্থায় চিতার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তাদের মুখের হাসি বিলীন হয়নি এবং বেদনায় তার টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি।
