সেটা তাদের ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো…স্বাভাবিক মৃত্যুর সময় উপস্থিত হওয়ার আগেই কেনো তারা জীবন দেবে? এতে কি মঙ্গল সাধিত হতে পারে?
এর মাধ্যমে তাঁদের অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রমাণিত হয়, সেই সঙ্গে সাহস এবং ভক্তি এবং এই আত্মত্যাগ তাদের পরিবারে সম্মান বয়ে আনে। আমি তোমাকে আগেও বলেছি আমরা রাজপুতরা আগুন এবং সূর্যের সন্তান। আগুনের দহন শক্তি আমাদের পরিচ্ছন্ন এবং মর্যাদা সম্পন্ন করে এমন বিশ্বাস অন্য যে কোনো শ্রেণীর হিন্দুদের তুলনায় আমাদের মধ্যে অনেক বেশি। আমাদের ইতিহাসে বহুবার এমন ঘটেছে এবং শেষ বার তা ঘটেছে যখন তোমার বাবা চিত্তরগড় অবরোধ করেছিলো। যখন বোঝা গিয়েছিলো আমাদের পুরুষদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিশ্চিত মৃত্যু বরণ করতে হবে, তখন রাজপুত নারীরা তাদের উত্তম পোশাক এবং গহনা পরিধান করে, যেনো সেটা তাদের বিয়ের দিন। তারপর তারা তাদের রানীকে অনুসরণ করে দলবদ্ধ ভাবে রাজকীয় তত্ত্বাবধানে নির্মিত বিশাল চিতার মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন অবসান করে।
এমনটা কখনোও ঘটবে না যে তার মাকে আকবরের চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সম্ভ্রম রক্ষা করতে হবে যেহেতু মুসলমানরা তাদের মৃতদেহ দাহ করে না, সেলিম ভাবলো। মায়ের যুক্তিহীন অহঙ্কারী চেহারার দিকে তাকিয়ে সেলিমের মনে হলো তিনি যদি কোনো রাজপুতের স্ত্রী হতেন তাহলে তিনি খুশি মনে তার চিতায় আত্মাহুতি দিতেন। কিন্তু শকুন্তলার আতঙ্কিত মুখের স্মৃতি সেলিমের মনে এই অর্থহীন জীবন বিসর্জনের মেকি অহঙ্কার সম্পর্কে বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করলো। তার থেকে মাত্র দুই বছরের বড় এই মেয়েটি মৃত্যুর পরিবর্তে জীবন বেছে নিয়েছে এবং তার মন বলছে সে ঠিক কাজটিই করেছে। বহুবার সে তার মা এবং বাবার আচরণ মূল্যায়ন করার সময় এ ব্যাপারে বিভ্রান্ত বোধ করেছে যে কে সঠিক। কিন্তু সতীদাহের বিষয়ে সে নিশ্চিত ভাবেই তার বাবার সিদ্ধান্ত সমর্থন করে।
.
১৮. যোদ্ধা যুবরাজ
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার রাজধানী ফতেহপুর শিক্রি থেকে লাহোরে স্থানান্তর করবো। অবিলম্বে তার প্রস্তুতি আরম্ভ হবে। দুই মাসের মধ্যে আমি আমার সভাসদদের নিয়ে লাহোরের উদ্দেশ্যে রওনা হবো। সভা এখানেই সমাপ্ত হলো।
সেলিম সভাকক্ষের পিছন দিকে দাঁড়িয়ে ছিলো। তার হৃদস্পন্দন দ্রুততর হলো যখন আকবর দেহরক্ষীসহ তার পাশের দরজা দিয়ে রৌদ্র আলোকিত উঠানে বেরিয়ে গেলেন। সভায় উপস্থিত সদস্যদের হতভম্ব চেহারা এবং উত্তেজিত হৈ হল্লা শুনে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিলো আকবরের এই ঘোষণায় তারা অবাক এবং অসন্তুষ্ট হয়েছেন। আজকের সভার প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিলো বাজারের উপর আরোপিত করের হার পুণঃনির্ধারণ করা, তার মাঝে হঠাৎ এ ধরনের ঘোষণায় সকলের অবাক হওয়ারই কথা। একমাত্র আবুল ফজলকে অবিচলিত মনে হলো যখন সে সভার কার্যবিবরণী লিপিবদ্ধ করা শেষ করলো। তার মাংসল মুখে লেগে থাকা মুচকি হাসি দেখে বোঝা যাচ্ছিল-সম্ভবত হাসিটি ইচ্ছাকৃত ভাবে আরোপিত-আকবরের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সে পূর্বেই অবগত ছিলো। কেনো তার সর্বদা মনে হয় এক ঘুষি মেরে আবুল ফজলের মুখের ঐ অবজ্ঞামিশ্রিত হাসি বিলুপ্ত করে দেয়? সেলিম ভাবলো। হয়তো সে আশা করে তার বাবা নিজের চিন্তাভাবনা গুলি নিয়ে তার সঙ্গেই বেশি আলোচনা করুক। বিশেষ করে এই রাজধানী পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি। বিষয়টি তাকে ভীষণ কৌতূহলী করে তুলেছে, কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্তও। তার বাবা কদাচিৎ আবেগ তাড়িত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন। এই রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্তটি নিশ্চয়ই তার বাবার ভবিষ্যত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কি সেই পরিকল্পনা? পিতার জ্যেষ্ঠপুত্র হিসেবে পিতাকে তার যথেষ্ট বোঝা উচিত তার উদ্দেশ্য গুলি অনুমান করার জন্য। তার চেয়েও বড় বিষয় হলো এর ফলে তার উপর কি প্রতিক্রিয়া হবে? তাকেও কি নতুন রাজধানীতে নিয়ে যাওয়া হবে? তার মা হীরাবাঈ এর ভাগ্যে কি ঘটবে? তাকে কি এই ফতেহপুর শিক্রির রাজ প্রাসাদে রেখে যাওয়া হবে? এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এখনো সেলিমের ভালো লাগে, যদিও তা অনিয়মিত এবং বাবার প্রতি তিনি এখনো অবিচল ঘৃণা প্রদর্শন করেন। তাকে তার অভিভাবকদের একজনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে এমন চিন্তা মাথায় আসতেই সেলিম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। তাকে জানতে হবে বাবা তার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ বিষয়ে সরাসরি তাঁকে জিজ্ঞাসা করার অধিকার কি তার নেই?
তর্করত সভাসদদের ভিড় ঠেলে সেলিম দ্রুত সভা কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। দৌড়ে উঠান পেরিয়ে সে তার পিতার ব্যক্তিগত কক্ষের সামনে হাজির হলো। তাকে দেখে রক্ষীরা কক্ষের দরজা খুলে দিলো প্রবেশ করার জন্য। ভিতরে ঢুকে সেলিম দেখতে পেলো আকবর তাঁর আনুষ্ঠানিক তলোয়ারটি কোমর থেকে খুলে রাখছেন। তার মনে একটু আগে সৃষ্টি হওয়া আত্মবিশ্বাসে হঠাৎ করেই ঘাটতি দেখা দিলো এবং সে ইতস্তত বোধ করলো। সে বুঝতে পারছে না কি বলে শুরু করবে কিম্বা যে রকম দ্রুত বেগে এসেছে সেভাবেই প্রস্থান করবে কি না। যাই হোক, আকবর তাকে কক্ষে ঢুকতে দেখেছেন এবং তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, সেলিম, তুমি কি চাও?
