তুমি কি জানো আমি কে?
না, জনাব। সঞ্জীব মাথা নাড়লো। তবে সেলিম লক্ষ্য করলো সঞ্জীব ধীরে আকবরের ঘোড়ার জাঁকজমকপূর্ণ সাজসজ্জা এবং এর আরোহীর পোশাক এবং গলা ও হাতের রত্ন গুলি পর্যবেক্ষণ করে তার মর্যাদা বোঝার চেষ্টা করছে। তারপর সে সশস্ত্র রক্ষীদেরও পর্যবেক্ষণ করলো এবং ভীতির পরিবর্তে তার বসন্তের দাগ সমৃদ্ধ কুৎসিত চেহারায় বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়লো।
আমি তোমাদের সম্রাট। আমি খবর পেয়েছি তোমাদের এখানে একজন বিধবাকে জীবন্ত অবস্থায় তার মৃত স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারার আয়োজন করা হচ্ছে। বিষয়টি কি সত্যি?
সঞ্জীব আবারও মাথা নাড়লো, তবে এক মুহূর্তের জন্য সে কাছাকাছি অবস্থিত খড়ের তৈরি একটি কুড়ে ঘরের দিকে তাকালো। আকবরও তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকালেন এবং সঙ্গে সঙ্গে রক্ষীদের ইশারা করলেন ঘরটি তল্লাশী করার জন্য। কয়েক মুহূর্ত পর একজন রক্ষী একটি অল্পবয়সী সাদা শাড়ী পড়া অচেতন মেয়েকে কোলে করে এনে আকবরের সামনে মাটিতে শুইয়ে দিলো। সেলিম দেখলো মেয়েটির চোখ দুটি ভোলা কিন্তু কি ঘটছে তা বুঝতে পারছে বলে মনে হলো না।
কেউ ওর জন্য একটু পানি নিয়ে এসো। আকবর আদেশ দিলেন। গ্রামবাসীদের মধ্যে থেকে একটি বালক দৌড়ে মাটির পাত্রে করে সামান্য পানি নিয়ে এলো। আকবর ঘোড়া থেকে নেমে ছেলেটির হাত থেকে পানির পাত্রটি নিলেন তারপর মেয়েটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তার মুখে পাত্রটি কাত করে ছোঁয়ালেন। প্রথমে কিছু পানি তার গাল গড়িয়ে পড়ে গেলো কিন্তু তারপর সে তার মাথাটি সামান্য সোজা করে পানি পান করতে লাগলো। সেলিম ঝুঁকে তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো চোখের মণি দুটি সম্প্রসারিত হয়ে অনেক বড় আকার ধারণ করেছে।
এই মেয়েটি কে? এক্ষুনি জবাব দাও নইলে আল্লাহর কসম আমি এই মুহূর্তে ধর থেকে তোমার গর্দান নামিয়ে দেবো! আকবর ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন।
সঞ্জীব হাত কচলালো। ও আমার পিতার বিধবা স্ত্রী শকুন্তলা-আমার আসল মা মারা যাওয়ার এক বছর পরে আমার পিতা ওকে বিয়ে করে এবং এখন থেকে তিন মাস আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ওর বয়স কত?
পনেরো জাহাপনা।
তুমি তাকে মাদক দিয়ে নেশাগ্রস্ত করেছে, তাই না?
আমি ওকে ওপিয়ামের গুলি সেবন করিয়েছি। আপনি বুঝবেন না জাঁহাপনা। কারণ আপনি হিন্দু নন। পরিবারের মর্যাদা রক্ষার জন্য একজন বিধবার দায়িত্ব নিজ স্বামীকে জ্বলন্ত চিতা পর্যন্ত অনুসরণ করা…আমি ওর কষ্ট কমানোর জন্য ওকে মাদক দিয়েছি।
তুমি ওকে মাদক দিয়েছে যাতে চিতার আগুনে তুমি ওকে নিক্ষেপ করার সময় সে প্রতিবাদ না করে।
মেয়েটি তখন উঠে বসেছে এবং বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাচ্ছে। তার পেছনে অবস্থিত চিতার আগুন আরো উঁচুতে লাফিয়ে উঠছে, কাঠ ফাটার শব্দ হচ্ছে এবং অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছিটকে আসছে। সুগন্ধি তেল এবং ঘি সহ মাংস পোড়ার ফলে অত্যন্ত ঝাঁঝালো গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ সে কোথায় রয়েছে এবং কি ঘটছে বুঝতে পেরে শকুন্তলা কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে চিতার দিকে ঘুরলো। চিতার মাঝখানে তখন তার মৃত স্বামীর দেহটি মশালের মতো জ্বলছে। শকুন্তলার আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই মৃতদেহের মাথাটি সশব্দে ফাটলো এবং একে অনুসরণ করে কিছু ভাজা হওয়ার ছ্যাত ছ্যাত শব্দ পাওয়া গেলো-বোঝা গেলো মগজ ভস্মীভূত হলো।
সঞ্জীব ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে শকুন্তলার দিকে তাকালো, মুহূর্তের জন্য সে আকবর এবং তার সফরসঙ্গী অথবা নিশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামবসীদের উপস্থিতির কথা ভুলে গেলো। তোমার স্বামীকে গ্রাস করা ঐ আগুনে নিজেকে সমর্পণ করা তোমার পবিত্র দায়িত্ব। আমার নিজের মা যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে তিনি তাই করতেন এবং এর জন্য তিনি গর্ববোধ করতেন। তুমি আমাদের পরিবারের সুনামের উপর কালিমা লেপন করছে।
ও নয়, তুমি একটি জঘন্য অপরাধ করতে যাচ্ছিলে। আমি আমার সমগ্র রাজ্যে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেছি, বিধবা নিজে মৃত্যুবরণ করতে রাজি হোক অথবা না হোক। আমি এধরনের বর্বর কাজ বরদাস্ত করবো না। আকবর মেয়েটির দিকে ফিরলেন। তুমি এখানে থাকলে তোমার জীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। আমি আকবর, তোমার সম্রাট। আমি তোমাকে এই সুযোগ দিচ্ছি যে, তুমি যদি চাও তাহলে আমার সঙ্গে আমার রাজপ্রাসাদে আসতে পারো। সেখানে তুমি আমার হেরেমে পরিচারিকা হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে। তুমি কি রাজি আছো?
জ্বী জাহাপনা, মেয়েটি উত্তর দিলো। এর আগে সে বুঝতে পারেনি আকবর কে এবং সেলিম লক্ষ্য করলো মেয়েটি তার বাবার চোখে চোখে তাকাতে সাহস পাচ্ছে না।
এবারে তোমাকে নিয়ে আমি কি করবো শোনো, আকবর সঞ্জীবের দিকে তাকালেন, তার চেহারায় কিছুটা অবজ্ঞার ভাব বিরাজ করছিলো। তোমার ধর্মে যদি এমন নিয়ম থাকতো যে পিতার সঙ্গে তোমাকেও চিতার আগুনে জ্বলতে হবে তাহলে কি তুমি স্বেচ্ছায় জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ দিতে? আমার মনে হয় না। রক্ষী, ওকে ধরে চিতার কাছে নিয়ে যাও।
সঞ্জীবের বসন্তের দাগবিশিষ্ট মুখটি হঠাৎ ঘামে ভিজে তেলতেলে হয়ে উঠলো এবং সে ঘন ঘন শ্বাস নিতে শুরু করলো। জাহাপনা, দয়া করুন…. সে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলো যখন দুজন রক্ষী দুদিক থেকে তাকে শক্ত করে ধরে আগুনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। তার গড়ন এতো হালকা পাতলা যে রক্ষীরা তাকে সহজেই একগুচ্ছ খড়ের মতো আগুনে ছুঁড়ে দিতে পারে, সেলিম ভাবলো।
