সেলিম সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। কিন্তু সেলিম তার বাবার কাছে প্রকাশ করলো না যে সতীদাহের বিষয়টি একাধারে তার মনে বিতৃষ্ণা এবং রোমাঞ্চ উভয়ই সৃষ্টি করে। অল্প কয়েক দিন আগে তার সমবয়সী এক বালক গুটিবসন্ত হয়ে দুদিনের মধ্যেই মারা গেছে। সেলিমের মতো একজন অল্প বয়সী ছেলের জন্য মৃত্যুর মতো বিষয় কিছুটা দুর্বোধ্য। এই রহস্যের জন্যই হয়তো ব্যাপারটি কিছুটা অসুস্থ্য রোমাঞ্চ সৃষ্টি করে। আধো অপরাধবোধ সম্পন্ন কৌতূহল নিয়ে সে বিধবাদের চিতায় দাহকালীন আর্তচিৎকারের কাহিনী শুনেছে বহুবার। সে এমন গল্পও শুনেছে যে চুলে এবং পড়নের কাপড়ে আগুন লেগে যাওয়া এক বিধবা পালাতে চেষ্টা করে কিন্তু তার স্বামীর আত্মীয়রা পুনরায় তাকে আগুনে নিক্ষেপ করে।
জলদি করো সেলিম। আমরা সেখানে সময় মতো পৌঁছাতে পারলে হয়তো বিধবাটিকে বাঁচাতে পারবো।
ফতেহপুর শিক্রি থেকে বেরিয়ে পিতা ও পুত্র পাশাপাশি ঘোড়া ছুটিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তাঁদের সম্মুখে চারজন অগ্রদূত শিঙ্গা বাজানোর মাধ্যমে সতর্ক সংকেত দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করছে এবং পেছন থেকে দেহরক্ষীরা তাঁদের অনুসরণ করছে। পিতার সঙ্গী হতে পেরে সেলিম গর্ব বোধ করছে, সেইসঙ্গে এই অভিযানের অভূতপূর্ব রোমাঞ্চের স্বাদ তার পেটের মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি সৃষ্টি করছে।
এটা মার্চের শেষের দিকের এক উষ্ণ দিন এবং তখন মধ্যাহ্ন পেরিয়ে গেছে। ঘোড়ার খুরের আঘাতে রৌদ্রতপ্ত উষ্ণ ভূমি থেকে ফ্যাকাশে ধূলো উড়ছে। তির্যক দৃষ্টিতে পরিচ্ছন্ন নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে সেলিম দেখতে পেলো সূর্য তখনো অনেক উপরে রয়েছে। শেষকৃত্য যদি সূর্যাস্তের সময় সম্পন্ন হয় তাহলে তাদের হাতে যথেষ্ট সময় রয়েছে। কিন্তু আকবরের মাঝে ছোটার গতি কমানোর কোনো লক্ষণ দেখা গেলো না। তার বাদামি রঙের স্ট্যালিয়নটির শরীর ঘামে ভিজে গেছে এবং সেলিম লক্ষ করলো তার নিজের ঘোড়াটিরও একই অবস্থা। যুদ্ধ যাত্রা করার সময় কি এরকমই পরিস্থিতি হয়? সেলিম ভাবলো। যুদ্ধের বিষয়ে সেলিমের কোনো অভিজ্ঞতা নেই কিন্তু সে এ বিষয়ে ভীষণ কৌতূহলী।
এই মুহূর্তে তারা একটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরের উঠছে যা সামনের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে গেছে এবং এঁকে বেঁকে চূড়ার দিকে অগ্রসর হয়েছে। সেটি একটি সমতল চূড়া বিশিষ্ট পাহাড়। সেখানে সেলিম কিছু সাধারণ ভাবে নির্মিত ঘর দেখতে পেলো। আরো দূরে বাদামি ধোয়ার রেখা দেখা গেলো।
সেলিম আকবরের চিৎকার শুনতে পেলো, ওরা আমাদের আগমনের খবর জেনে গেছে এবং তরিঘড়ি করে চিতায় আগুন জ্বালিয়েছে। এর জন্য ওদের কঠিন শাস্তি পেতে হবে। পিতার দিকে তাকিয়ে সেলিম দেখলো তার দৃঢ় চোয়াল বিশিষ্ট মুখটি ক্রোধ এবং হতাশায় শক্ত হয়ে উঠেছে। ঘন ঘন শ্বাস নিতে থাকা ঘোড়া গুলিকে তারা যখন পাহাড় চূড়ার দিকে ছুটালো, আকবর তাঁর লোকদের চিৎকার করে বললেন, জলদি করো। সময় নষ্ট করা যাবে না।
পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছে সেলিম দেখতে পেলো তারা একটি মালভূমিতে উপস্থিত হয়েছে। তাঁদের বাম পাশে একগুচ্ছ মাটির ইটে তৈরি ঘর যার মাঝখানে একটি কুয়া রয়েছে এবং ডান পাশে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের একটি বাড়ি, যদিও সেটি একতলা কিন্তু নিচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এটা সম্ভবত গ্রাম-প্রধানের বাসস্থান। সেখানে একটি নিম গাছের নিচে একটি দড়ির চারপায়াতে দুটি শিশু ঘুমিয়ে আছে। চারপায়াটির পাশে মাটিতে একটি কুকুরের ছানা শুয়ে আছে। সেখানে আর কোনো মানুষ জন নেই। তবে সেলিম দেখলো সেখান থেকে তিন চারশ গজ দূরে মেটে বর্ণের পোশাক পরিহিত কিছু সংখ্যক মানুষ জড়ো হয়ে আছে। তাদের সামনে জ্বলন্ত চিতা থেকে ঘন কালো ধোয়া উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।
আকবর তার ঘোড়াটির পাঁজরে জোরে লাথি মেরে চিৎকার করে উঠলেন, এগিয়ে চলো সবাই! কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তারা ছোট খাট ঝোঁপ জঙ্গল পেরিয়ে একটি খোলা জায়গায় এসে উপস্থিত হলো, যেখানে ইতোমধ্যেই কাঠ সাজিয়ে উঁচু করে বানানো চিতার চারপাশে উত্তম ভাবে আগুন ধরে গেছে। চিতার শীর্ষে একটি সাদা মসলিন জড়ানো মৃতদেহ শোয়ানো রয়েছে যাতে এখনো আগুন লাগেনি। দুই জন লোক বারে বারে সামনে ঝুঁকে পাত্র থেকে ঘি অথবা তেল জাতীয় কিছু মৃতদেহটির উপর ছিটিয়ে দিচ্ছিলো। হলুদ বর্ণের সেই তরল আগুনের সংস্পর্শে এসে ছ্যাত ছ্যাত শব্দে জ্বলে উঠছিলো। সেই মুহূর্তে মৃতদেহটির গায়ে পেচানো কাপড়ে আগুন ধরলো এবং তাজা মাংস পোড়ার গন্ধ সেলিমের নাকে এলো। চিতাটির দশ গজের মধ্যে পৌঁছে আকবর তার ঘোড়া থামালেন। উপস্থিত ভিড়টি এতো বেশি মনোযোগ দিয়ে চিতাটি প্রত্যক্ষ করছিলো যে আগত অশ্বারোহীদের ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ধীরে হলো।
চিতাটি ঘিরে ফেলো, আকবর তার দেহরক্ষীদে চিৎকার করে আদেশ দিলেন। ভিড়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে তিনি কঠোর স্বরে জানতে চাইলেন, তোমাদের নেতা কে? আকবর হিন্দিতে কথা বললেন যা এখানকার আঞ্চলিক ভাষা। তিনি হিন্দি এবং ফার্সীতে সমান দক্ষ।
আমি, আগুনে যে দুজন লোক তেল ছুড়ছিলো তাদের একজন জবাব দিলো। আমরা আমার পিতার মরদেহ দাহ করছি, তিনি এই গ্রামের প্রধান ছিলেন। আমি তার বড় ছেলে সঞ্জীব।
