আপনার এই পরিকল্পনার মাঝে ঈশ্বরের অবস্থান কোথায়-আপনার ডান হাতে, নাকি তাকে আপনি সেই সুযোগও দিতে চান না? মনে হলো ক্ষোভের যন্ত্রণায় জেসুইটটির দম বন্ধ হয়ে আসছে।
ঈশ্বর আমাকে দীন-ই-ইলাহীর মূল প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করেছেন এবং পৃথিবীর বুকে আমি তার ছায়া হিসেবে ভূমিকা পালন করবো, আকবর শান্ত কণ্ঠে বললেন। আমি ঈশ্বরকে প্রতিস্থাপন করতে চাই না কারণ তাহলে সত্যিই ঈশ্বরদ্রোহীতা সংঘটিত হবে।
আপনি যদি আপনার এই পথভ্রষ্ট নির্বুদ্ধিতা অব্যাহত রাখেন তাহলে আমি এবং আমার সঙ্গী পাদ্রীগণ আপনার রাজসভা ত্যাগ করবো। আমি পরিতাপের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমি আর আপনার পুত্র যুবরাজ মুরাদের শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে পারবো না।
তোমাদের ইচ্ছা হলে তোমরা চলে যেতে পারো। তোমাদের রুদ্ধ মন আমাকে হতাশ করেছে। এখন আমি ভাবছি তোমার মতো লোকদেরকে ভবিষ্যতে আমি আমার সাম্রাজ্যে পা রাখার অনুমতি দেবো কি না। আমাকে যদি আরো চটাও তাহলে আমি তোমার ইউরোপীয় অনুগামীদের আমার সাম্রাজ্যে গড়ে তোলা বাণিজ্যবসতি উচ্ছেদ করবো।
সত্যের আলোকে আপনি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং আপনি নিজেকে যতোটা মহান ভাবেন তার থেকেও মহত্ত্বম কারো কাছে আপনাকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। ফাদার এ্যান্টোনিওর মুখ থেকে যেনো সত্যিকার বিষ উদগিরণ হলো। তারপর সে সামান্য কুর্ণিশ করলো এবং ঘুরে গটমট করে হেঁটে খোলা দরজা পথে প্রহরীদের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
সেলিম দেখলো তার বাবা এবং আবুল ফজল পরস্পরের মধ্যে কৌতুক মিশ্রিত হাসি বিনিময় করলো। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তারা পাদ্রীর প্রতিক্রিয়া কি হবে তা আগেই অনুমান করতে পেরেছিলেন। সেলিমের নিজের মনেও একাধিক প্রশ্নের আগুন জ্বলছিলো এবং সে প্রথম বারের মতো তা প্রকাশ করতে ভয় পেলো না। কেনো তুমি এই নতুন ধর্ম প্রবর্তন করতে চাচ্ছ। বাবা? এতে কি উলামাবৃন্দ ক্ষুব্ধ হবেন না? সে বললো।
সেলিমের প্রশ্নের উত্তর দিলো আবুল ফজল। উলামাগণ যা খুশি ভাবুক। এটি একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ইতোমধ্যে মহামান্য সম্রাট তার রাজ্যের ইসলাম ধর্ম বিষয়ক প্রধান হয়েছেন কিন্তু তার প্রজারা বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী। দীন-ই-ইলাহী ধর্মটি সকলের জন্য উন্মুক্ত এবং প্রত্যেকে তাঁদের নিজ নিজ ধর্ম বজায় রেখেও এই ধর্ম অনুসরণ করতে পারবে। ফলে এই ধর্মটি প্রবর্তন করার মাধ্যমে আমাদের স্মাট সকল প্রজার কাছে তাঁদের নিজেদের একজন বলে স্বীকৃত হবেন তিনি আর তার পিতা বা পিতামহের মতো বিদেশী হানাদার বলে বিবেচিত হবেন না। দীন-ই-ইলাহী, হিন্দু ধর্মের পুনর্জন্ম এবং পরমেশ্বরের সঙ্গে মিলিত হওয়াই বিশ্বাসীর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, এমন বিশ্বাসকে ধারণ করবে। সব কিছুর উপরে এই ধর্ম মানুষকে দয়া, সহানুভূতি, সহনশীলতা এবং সকল জীবের প্রতি সম্মানবোধ শিক্ষা দেবে। ফলে মানুষের আধ্যাত্মিক সত্যের অনুসন্ধানের প্রয়াস সহজ হবে এবং একই সাথে মোগল সাম্রজ্যের বুনিয়াদও শক্ত হবে।
সেলিমের প্রশ্নের উত্তর দানে আবুল ফজলের ভূমিকায় সন্তুষ্ট হয়ে ইতোমধ্যে আকবর তুহিন দাশের নকশার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। তাই তিনি খেয়াল করলেন না তার পুত্র আবুল ফজলের বক্তব্য পুরোপুরি সমর্থন করতে না পেরে কুটি করছে। সেলিমের মনে হলো এটি একটি অনিশ্চিত পদক্ষেপ। এই নতুন আধ্যাত্মিক বিশ্বাস যতো সহজে মানুষকে বিদ্রোহী করে তুলতে পারে, অনুরূপভাবে কি তাদের মধ্যে মোগল শাসকদের প্রতি মৈত্রীর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারবে?
*
জাহাপনা, একজন রাজ বর্তাবাহক খবর এনেছে যে, দূরের এক গ্রামে এক বিধবাকে জীবন্ত অবস্থায় তার মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় দাহ করা হবে আজ সূর্যাস্তের সময়। মৃত ব্যক্তিটি সেই গ্রামের প্রধান ছিলো। আপনি আদেশ দিয়েছিলেন এ ধরনের সব ঘটনা তাৎক্ষণিক ভাবে আপনাকে জানানোর জন্য।
গ্রামটি কোথায় অবস্থিত?
এখান থেকে দশ মাইল উত্তরে।
আমি পরিষ্কার ঘোষণা দিয়েছি এ ধরনের বর্বর ধর্মীয় রীতি আমি বরদাস্ত করবো না। তারা আমার আদেশ অমান্য করার সাহস কীভাবে পেলো? আমি নিজে সেখানে যাবো। আমার ঘোড়া প্রস্তুত করো এবং দেহরক্ষীদের আমার সঙ্গে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে বলো।
সেলিম তার পিতাকে জনসম্মুখে এতো ক্রুদ্ধ হতে কাদাচিৎ দেখেছে। আকবর তার পরিচারকদের সাহায্যের অপেক্ষা না করে নিজেই তার রেশমের জোব্বাটি খুলে ফেললেন ভ্রমণের পোশাক পড়ার জন্য।
তুমিও আমার সঙ্গে চলো সেলিম। এটা তোমার জন্য একটি মূল্যবান শিক্ষা হবে। সতীদাহ ছাড়া হিন্দু প্রজাদের অন্যসব ধর্মীয় আচারের বিষয়ে আমি তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছি। তুমি নিশ্চয়ই জানো সতীদাহ কি, তাই না? হিন্দুরা এই বিধবাদের বলে ভালোবাসা ও সাহচর্যের জ্বলন্ত মশাল কিন্তু বাস্তবে তারা বর্বরতার শিকার। পারিবারিক মর্যাদা রক্ষা করা সম্পর্কে এক বিকৃত ধারণা থেকে স্বামীর আত্মীয় স্বজনেরা বিধবাদের বলপূর্বক মৃত স্বামীর সঙ্গে অগ্নিদগ্ধ করে। আকবরের মুখমণ্ডল কঠোর দেখালো। আমি আল্লাহকে এই জন্য ধন্যবাদ জানাই যে আমাদের ধর্মে এ ধরনের কোনো নিয়ম প্রচলিত নেই। মোগলদের জন্য যুদ্ধ ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করা সবচেয়ে গর্বের বিষয়। আমাদের মধ্যে এমন কোনো ব্যক্তি কি আছে যে যুদ্ধ ময়দানের পরিবর্তে নিজ বিছানার গৌরবহীন মৃত্যু বেছে নেবে? কিন্তু আমাদের কারো মৃত্যুর পর আমাদের স্ত্রীরা যদি আত্মহত্যা করে তাকে কি আমরা যুদ্ধ ময়দানে মৃত্যুর মতো গৌরবের মনে করবো? তুমি কি আমার সঙ্গে একমত সেলিম? সেই মুহূর্তে আকবরের পরিচারকগণ তাঁকে জোব্বা এবং পালুন পড়ান শেষ করে তার পেশীবহুল কোমরে কোমর বন্ধনী বাঁধছিলো।
