আমাদের?
অবশ্যই। আমাদের মরহুম আব্বাজান যদিও আমাকে সম্রাট বলে ঘোষণা করেছেন, কিন্তু আমরা সবাই বাবরের সন্তান, সবাই মোগল নিয়তির অংশীদার তুমি, আমি এবং এমনকি কামরান আর আসকারিও। আমাদের সবার দায়িত্বও একই। আমাদের রাজবংশ বয়সে নবীন, ভিনদেশী এই মাটিতে এর শেকড় এখনও ভালোমতো প্রোথিত হয়নি, কিন্তু আমরা পারবো- আমরা হবও মহান যতক্ষণ না আমরা নিজেদের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে না ফেলবো বা একে অপরের সাথে লড়াই করে নিজেদের রাজবংশকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবো।
আপনি সম্ভবত ঠিকই বলেছেন। মাঝেমাঝে, যদিও পুরো ব্যাপারটাই একটা বোঝার মতো মনে হয় যে আমার তখন কাবুলে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, যে আমাদের মরহুম আব্বাজান হিন্দুস্তানের কথা কখনও শোনেননি… হিন্দালের তামাটে চোখের দৃষ্টিতে কেমন একটা অপ্রত্যয়ী অভিব্যক্তি এবং তাঁর দীর্ঘ, চওড়া দেহের কাঠামোটা মনে হয় যেন হতাশ হয়ে ঘোড়ার পর্যানে নুইয়ে পড়েছে।
হুমায়ুন হাত বাড়িয়ে ভাইয়ের পেষল কাঁধ স্পর্শ করে। আমি বুঝি, সে মৃদুকণ্ঠে বলে, কিন্তু জন্মগত কারণে আমরা যা পরিচয় সেখানে আমাদের আমাদের পছন্দের কোনো অবকাশ ছিল না।
তিনঘন্টা পরে, একটা নীচু, পাথুরে পাহাড়ের বায়ু আচ্ছাদিত দিকে রাতের মতো অস্থায়ী ছাউনির আগুন প্রজ্জ্বলিত করা হয় যা আহমেদ খান- নিজের গুপ্তদূতদের সাথে পুরো বহরের অগ্রে গমন করে- যা খুঁজে পেয়েছেন। হিন্দালের তাবুর ঠিক পাশে হুমায়ুনের টকটকে লাল রঙের বিশাল তাবুটা অস্থায়ী শিবিরের ঠিক কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়। পঞ্চাশ গজ দূরে খানজাদা এবং গুলবদন আর তাঁদের পরিচারিকা এবং হিন্দালের সফরসঙ্গী হিসাবে যে গুটিকয়েক মহিলা রয়েছে তাদের জন্য তাবুর বন্দোবস্ত করা হয়েছে, পুরো এলাকাটার চারপাশে বৃত্তাকারে মালবাহী শকটের ঘোড়ার গায়ের দড়িগুলো পরস্পরের সাথে গিট বাঁধা অবস্থায় নিরাপত্তা ব্যুহ তৈরা করে রয়েছে।
মাটিতে আসনসিঁড়ি হয়ে বসে লোকেরা, তন্দুরের আগুনে সেঁকার জন্য ময়দা আর পানি দিয়ে মণ্ড তৈরী করছে। কাঠের ধোয়ার গন্ধের সাথে অচিরেই ভেড়ার মাংসের সুগন্ধ মিলেমিশে যেতে থাকে যখন রাঁধুনির সহকারীরা সদ্য জবাই করা ভেড়ার মাংসের টুকরোয় নুন মসলা মাখিয়ে সূক্ষপ্রান্তযুক্ত দণ্ডে বিদ্ধ করে আগুনের উপরে ঘোরাতে শুরু করে। আগুনের লকলক করতে থাকা শিখায় চর্বি গলে পরতে একটা হিসহিস শব্দ ভেসে আসে। তাবুর ভিতরে হুমায়ুন যখন হাতের দস্তানা খুলছে আর জওহর তার কোমর থেকে তরবারির পরিকর আলগা করছে তখন তার পাকস্থলী এই গন্ধে মোচড় দিয়ে উঠে।
জওহর লাহোর ত্যাগ করার পরে আমি এই প্রথম কোনো ভোজের আয়োজন করলাম। আমি নিজের প্রাসাদে একসময়ে যেমন ভোজসভার আয়োজন করেছি তার তুলনায় আজকের আয়োজনটা বেশ গরীবি হালে করা হয়েছে, চমৎকার একটা প্রদর্শনী করে আমাদের অবশ্যই সেটা পুষিয়ে নিতে হবে। প্রত্যেকে অবশ্যই তাদের পেট ভরে পানাহার করবে…আমার তাবুতে যারা আহার করবে তাদের জন্য সোনা আর রূপার পাত্র বের কর…এবং আমি চাই আজ তুমি আমাদের বাঁশি বাজিয়ে শোনাবে। আমি অনেক দিন তোমার বাঁশি বাজান শুনিনি।
সেদিন রাতে, হরিণের চামড়ার নরম পাতলুনের উপরে গাঢ় সবুজ রঙের জোব্বা পরিহিত হয়ে এবং কোমড়ের হলুদ পরিকরে রত্নখচিত খঞ্জর খুঁজে নিয়ে হুমায়ুন নিজের চারপাশে সন্তুষ্টির সাথে তাকায়। তার বামপাশে, হিন্দাল আর অন্যান্য বয়োজ্যোষ্ঠ আধিকারিকেরা অর্ধবৃত্তাকারে মাটিতে উপবিষ্ঠ অবস্থায় গল্পগুজবে মত্ত। জাহিদ বেগ ভেড়ার একটা হাড় নিয়ে মনের সুখে কামড়াচ্ছে। লোকটা দেখতে হ্যাংলা পাতলা হলে কি হবে, হুমায়ুনের যেকোনো সেনাপতিকে সে অনায়াসে খাবার প্রতিযোগিতায় হারাতে সক্ষম এবং সে নিজের এই দানবিক খাদ্যরুচির জন্য যারপরনাই গর্বিত। হুমায়ুন হাসিমুখে তাকিয়ে দেখে সে হাড়টা ফেলে দিয়ে নিজের ছুরির সাহায্যে রোস্ট করা মাংসের আরেকটা বড় টুকরো কেটে নেয়।
তাবুর দূরবর্তী প্রান্তে উঁচু পর্দার একটা ঘেরাটোপ যা তাঁদের অন্যদের দৃষ্টির আড়ালে রেখেছে, মহিলাদের ছোট দলটা আহারে বসেছে যেখানে গুলবদন আর খানজাদাও রয়েছে। তাঁদের কথোপকথনের ধ্বনি প্রায় নম্র নিঃশব্দ এবং তাঁদের হাসি পুরুষদের চেয়েও বেশী চাপা যদিও প্রায় একই রকম নিয়মিত। হুমায়ুন আশা করে যে তারা তাদের চাহিদামতো সবকিছু পেয়েছে এবং নিজে গিয়ে সেটা দেখবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। ঘেরাটোপের কিনারা থেকে ঘুরে তাকিয়ে সে গুলবদনকে পা নিজের দেহের নীচে মার্জিত ভঙ্গিতে ভাঁজ করে রেখে, তাঁর পাশেই বসা এক অল্পবয়সী মেয়ের সাথে কথা বলতে দেখে। মেয়েটার মুখের উপরে আলো আধারি খেলা করছে কিন্তু একটা পাত্র থেকে মিষ্টান্ন তুলতে সে যখন সামনে ঝুঁকে আসে, মোমের আলো তার মুখাবয়ব আলোকিত করে তুলে।
মেয়েটার মরাল গ্রীবার উপরে মার্জিত ভঙ্গিতে স্থাপিত তাঁর ছোট মাথা, তাঁর মুখমণ্ডলের ধুসর উপবৃত্তাকৃতি, মাথার ঝলমলে কালো চুল পেছন দিকে টেনে নিয়ে কারুকার্যখচিত চিরুনি দিয়ে আটকানো, আর তাঁর উজ্জ্বল দুটো চোখ, তাকিয়ে দেখতে গিয়ে হুমায়ুন টের পায় তার তলপেটে হাজার প্রজাপতির ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে, সহসা তাঁর দৃষ্টির আবেক্ষণ সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠতে, সে ঘুরে তাঁর দিকে তাকায়। তার চাহনীতে একাধারে বিস্ময় এবং বাস্তবতা- সম্রাটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে বলে সেখানে কোনো প্রকার উত্তেজনা ছাপ পড়েনি- এবং এটা প্রায় আন্ত্রিক বিহ্বলতার একটা ঝাপটার মতো তাঁকে আপুত করে। হুমায়ুন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে মেয়েটা তাঁর চোখ নীচু করে এবং পুনরায় গুলবদনের দিকে তাকায়। তাঁর মুখপার্শ্বে- তার হাসির ভঙ্গি দেখে মনে হয় দুজনে কোনো একটা রসিকতা উপভোগ করছে- নিখুঁত চিবুক আর ক্ষুদে একটা নাক ফুটে আছে। তারপরে, পেছনে হেলান দিতে সে পুনরায় অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
