হুমায়ুন পুরুষদের মাঝে নিজের অবস্থানে ফিরে আসে, সৌজন্যতাবশত মেয়েদের ভালোমন্দের খোঁজ খবর নিতে গিয়ে সে নিজের হালহকিকত বিপর্যস্ত করে ফিরে এসেছে। এক ঝলক দেখা সেই অচেনা মুখটা তাঁকে এতোটাই তাড়িত করে যে খাবারের প্রতি মনোযোগ দেয়াটা তার কাছে অসম্ভব মনে হয়। সে অগত্যা তাঁর ভাইয়ের কাঁধে আলতো টোকা দেয়।
হিন্দাল, তোমার বোনের পাশে একজন অল্পবয়সী মেয়ে বসে রয়েছে, তাঁকে আমি ঠিক চিনতে পারলাম না। একটু গিয়ে দেখে আসবে, যদি তুমি তাকে চেনো তাহলে আমাকে জানাবে। হিন্দাল উঠে দাঁড়িয়ে ঘেরাটোপের দিকে এগিয়ে গিয়ে উঁকি দিয়ে ভেতরে তাকায়। তারপরে ধীরপায়ে ফিরে এসে হুমায়ুনের পাশে বসে।
চিনেছো?
হুমায়ুনের কাছে মনে হয় যে হিন্দাল উত্তর দেবার আগে একটু যেন ইতস্তত করে। মেয়েটার নাম হামিদা। আমার উজির, শেখ আলি আকবরের, কন্যা…
মেয়েটার বয়স কত?
চৌদ্দ কি পনের বছর হবে…
শেখ আলি আকবর কোনো গোত্রের লোক?
তার পরিবার পারস্য বংশোদ্ভূত, কিন্তু আমাদের আব্বাজানের সময়ে, উজবেকরা তাদের বিতাড়িত করার আগে, বহু যুগ ধরে তারা সমরকন্দের স্থায়ী অধিবাসী হিসাবে বসবাস করছিল। শেখ আলি আকবর যখন তরুণ তখন সেখান থেকে পালিয়ে আসেন এবং শেষ পর্যন্ত আমার আলওয়ার প্রদেশে এসে থিতু হন। সেখানে আমি তাকে আমার প্রধান পরামর্শদাতা হিসাবে নিয়োগ করি।
তাকে কি একজন ভালো পরামর্শদাতা বলা যাবে?
হ্যাঁ। এবং সম্ভবত তারচেয়েও বেশী কিছু। খ্যাতনামা এক সুফী সাধকের রক্ত তার ধমনীতে বইছে- জাম নগরের আহমেদ, যার ভবিষ্যতের ঘটনা আগাম বলতে পারার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় নিজের এই ক্ষমতার কারণে জিনদা-ফিল, সংহারক হস্তি নামে পরিচিত ছিলেন।
আগামীকাল সকালে আমরা রওয়ানা হবার পূর্বে শেখ আকবর আলিতে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবে। আমি তার সাথে কথা বলতে চাই।
সেই রাতে হুমায়ুন দুচোখের পাতা এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ করতে পারে না। সরকারে অবস্থানকালে মির্জা হুসেনকে যদিও সে বলেছিল নিজের সিংহাসন পুনরুদ্ধার না করে সে দার পরিগ্রহ করবে না, নিজের মনে সে খুব ভালো করেই জানে যে হামিদাকে সে অবশ্যই বিয়ে করবে। যুক্তি কিংবা ভাবনার কোনো স্থান নেই এখানে, তার পূর্বেকার কোনো প্রেমিকার জন্য সে নিজের এতো তীব্র আবেগ কখনও অনুভব করেনি, এমনকি সালিমাকেও সে এতোটা পছন্দ করতো না। এটা হামিদাকে একান্তভাবে নিজের করে পাবার আকাঙ্খ কেবল না- যদিও এটা নিশ্চিতভাবে এর একটা অংশ। সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে বুঝতে পেরেছে মেয়েটার একটা সুন্দর মন আছে, সেখান থেকে তাঁর দিকে আধ্যাত্মিক শক্তির একটা বিকিরণ ঘটছে। সে জানে যে হামিদা কেবল তাকে সুখীই করবে না, সেই সাথে সে তার পাশে থাকলে হুমায়ুন নিজেকে প্রজাপ্রিয় একজন শাসক হিসাবে গড়ে তুলতে পারবে, নিজের আকাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনে আরও যোগ্য হয়ে উঠবে। সে যতই এসব ভাবনাকে অযৌক্তিক বলে বাতিল করতে এবং এসব বয়ঃসন্ধিকালের লাজুক নম্রতার সাথে বেশী মানানসই বলে নিজেকে যতই বোঝাতে চেষ্টা করে, ভাবনাগুলো নতুন করে প্রবলভাবে ফিরে ফিরে আসতে চায়। চারণকবির দল একেই কি প্রেমে পড়া বলেছেন?
পরের দিন সকালে দিনের আলো ফোঁটার অনেক আগে হুমায়ুন শয্যা ত্যাগ করে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে রাজোচিত আলখাল্লা পরিহিত অবস্থায় পরিচারকদের সবাইকে বিদায় করে দিয়ে অসহিষ্ণুচিত্তে অপেক্ষা করতে থাকে। তাঁর লোকদের মাঝে অনেকক্ষণ পরে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিতে শুরু করে, গতরাতের আগুনকুণ্ডের গনগনে কয়লায় তারা লাথি মেরে আগুন উসকে দিয়ে নিজেদের তাবু আর অন্যান্য সরঞ্জামাদি গুছিয়ে নিতে শুরু করে যাত্রা আরম্ভ করার জন্য নিজের প্রস্তুত করতে থাকে। হুমায়ুন এবার তার তাবুর বাইরে থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসতে শুনে এবং জওহর তাবুতে প্রবেশপথের পর্দা তুলে ধরতে শেখ আলি আকবর মাথা নীচু করে ভেতরে প্রবেশ করে।
সুলতান, আপনি আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন। শেখ সাহেব দেখতে বেশ লম্বা এবং নিজের মেয়ের মতোই চমৎকার দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী। তিনি মার্জিত ভঙ্গিতে হুমায়ুনকে কুর্নিশ করে এবং অপেক্ষা করতে থাকে।
গতরাতে আয়োজিত ভোজসভায়, আমি আপনার মেয়ে হামিদাকে দেখেছি। আমি তাকে আমার স্ত্রী রূপে গ্রহণ করতে চাই। সে হবে আমার সম্রাজ্ঞী এবং ভবিষ্যত সম্রাটের জননী… হুমায়ুন গড়গড় করে বলতে শুরু করে।
শেখ আলি আকবর বিস্মিত দৃষ্টিতে কেবল তাকিয়ে থাকে।
শেখ আলি আকবর, আসলে ব্যাপারটা হল? হুমায়ুন নাছোড়বান্দার মতো বলতে থাকে।
মেয়েটা এখনও কিশোরী…
তাঁর বয়সী অনেক মেয়েরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, তার কোনো রকমের অযত্ন আমি হতে দেবো না…
কিন্তু আমাদের পরিবার এই সম্মানের উপযুক্ত না…।
আপনারা সমরকন্দ থেকে আগত সম্ভ্রান্তজন…আমার নিজের আম্মিজানের সাথে আমার আব্বাজান যে আচরণ করেছিলেন আমি যদি আপনার কন্যাকে সেভাবে আরও সম্মানিত করতে চাই তাহলে কেন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন? আমার আম্মিজানের পিতা- আমার নানাজী বাইসানগার- আপনার মতোই সমরকন্দের একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন।
