বেশ, তাঁদের জন্য দারুণ একটা চমক অপেক্ষা করছে।
২.৬ আকবর জননী, হামিদাবানু
১১. আকবর জননী, হামিদাবানু
হুমায়ুন নিজে সর্বাগ্রে অবস্থান করে প্রধান তোরণদ্বারের নীচ দিয়ে, যার চূড়া থেকে মোগলদের সবুজ নিশান নামিয়ে নেয়া হয়েছে, অতিক্রম করার চার ঘন্টা পরে দূর্গ প্রাসাদ সরকার অবশেষে তাঁদের দৃশ্যপট থেকে মিলিয়ে যায়। উত্তরপশ্চিম দিকে মন্থর গতিতে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে চলার সময় হুমায়ুন নিজের ভাবনায় বিভোর হয়ে পড়ে। মির্জা হুসেনের বাড়াবাড়ি রকমের আতিথিয়তার মাত্রা যদিও অব্যাহত ছিল কিন্তু সিন্ধে শুধু শুধু বসে থেকে সময়ক্ষেপনের কোনো মানে হয়না। তাঁকে সমর্থন করার লোকের সংখ্যা যখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, তাকে সাহায্য করার জন্য মির্জা হুসেনের উপরে চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা এখন হুমায়ুনের নেই এবং প্রতিটা দিন মনে হয় যেন তার জন্য অভিভব বয়ে আনছে।
পুনরায় যাত্রা শুরু কায়, সে একদিক দিয়ে স্বস্তি লাভ করে আর তাঁর অগ্রসর হবার গতি শ্লথ করে দেবে বলে যে চারটা কামান সে রেখে আসবে বলে মনস্থির করেছিল তার বদলে সে মির্জা হুসেনের কাছ থেকে বেশ ভালো রকমের মূল্যই উসুল করে নিয়েছে। নিজের অনাকাঙ্খিত অতিথির হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য ব্যগ্র সুলতান দুই হাতে অর্থ ব্যয় করেছেন। নিজের বাহিনীর আহারের জন্য হুমায়ুনকে রসদ ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করা ছাড়াও তার বাহিনীকে বহন করার জন্য তিনি তাজা ঘোড়াও দিয়েছেন। সবকিছু যদি ঠিক থাকে তাহলে দুই মাসের ভিতরে সে মারওয়ারের মরুরাজ্যে উপস্থিত হবে সেখানের রাজপুত অধিপতি মালদেও তাঁকে সহায়তা করার জন্য মনে হয় যেন তার ভাইয়ের চেয়ে অনেক বেশী উদগ্রীব হয়ে আছে। রাজার প্রেরিত দূত, উজ্জ্বল রঙের আলখাল্লা পরিহিত দীর্ঘকায়, রোগা দেখতে এক লোক, তাঁর মাথার লম্বা চুল রাজপুত রীতিতে বেণী করে বাঁধা, সপ্তাহ দুয়েক পূর্বে সরকার এসেছিল। শেরশাহ সম্বন্ধে রাজা মালদেওয়ের ক্ষোভের কথা এবং তাঁর প্রতি রাজার শত্রতার কথা হুমায়ুনের কাছে সে বিস্তারিত বর্ণনা করেছে।
মোগলদের বিরুদ্ধে নিজের যুদ্ধে পরাধিকারপ্রবেশক শেরশাহ রাজার সহযোগিতা দাবী করেছেন। আমার প্রভু যদি তার সাথে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করেন তাহলে মারওয়ার রাজ্যকে হুমকি দেবার ধৃষ্টতা দেখিয়ে সে আমার প্রভুকে অপমান করেছে। কিন্তু বাংলার জলাভূমি থেকে আগত একটা বর্ণসংকর কুকুরের সাথে আমার প্রভু কখনও মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হবে না। সুলতান, তিনি এর পরিবর্তে তার হাত বরং আপনার দিকে বাড়িয়ে ধরেছেন। মারওয়ারে তার সম্মানিত অতিথি হিসাবে তিনি আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যাতে করে আপনি আর আমার প্রভু আলোচনা করতে পারেন ভূঁইফোড়টার বিরুদ্ধে কিভাবে একত্রিত হওয়া যায়। আপনার সম্মতি নিয়ে তিনি অন্যান্য রাজপুত রাজাদের ডেকে পাঠাতে চান, শেরশাহের ধৃষ্টতায় যারা তার মতোই অপমানিতবোধ করেছে।
মাথার উপর দিয়ে নীচু হয়ে উড়ে যাওয়া এক ঝাঁক সবুজ টিয়াপাখির তীক্ষ্ণ কলরব হুমায়ুনকে বর্তমানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। সে তারপাশে, সিন্ধে এক আরব ঘোড়া-ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কেনা বাদামী রঙের দীর্ঘ গ্রীবার শক্তসমর্থ গড়নের স্ট্যালিয়নে উপবিষ্ট হিন্দালের দিকে আড়চোখে তাকায়।
আর দশ মাইল পরে আজ রাতের মতো আমরা ছাউনি ফেলবো, হুমায়ুন বলে।
আমাদের সেটাই করা উচিত। মেয়েরা ক্লান্ত হয়ে পড়বে…
কয়েকটা ভেড়া জবাই করে আমি বলবো রোস্ট করতে। আজ রাতে তুমি, আমি আর আমাদের পরিবারের মেয়েরা আমার তাবুতে আমাদের প্রধান সেনাপতি আর অমাত্যদের সাথে একসাথে আহার করবো। আমাদের সৈন্যদের জন্য আমি তাবুর বাইরে টেবিলের বন্দোবস্ত করতে বলবো। এটা আমাদের সবার মনোবল চাঙ্গা করবে…
আপনি কি সত্যিই মনে করেন যে মারওয়ারের রাজা আমাদের সাহায্য করবে?
কেন করবে না? আমি আমাদের মরহুম আব্বাজানকে প্রায়ই রাজপুত গর্বের কথা বলতে শুনেছি। মালদেও যদি সত্যিই বিশ্বাস করে যে শেরশাহ তাকে অপমান করেছে, সে সেই অপমানের প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নেবে না এবং শেরশাহকে পরাভূত করতে নিজের রাজপুত যোদ্ধাদের সাথে করে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করার চেয়ে আর উত্তম পন্থা কি হতে পারে? অবশ্য রাজা এর প্রতিদান প্রত্যাশা করেন কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না রাজপুতদের সাহসিকতা কিংবদন্তীতুল্য। মালদেও একজন উপযুক্ত মিত্র বলে প্রতিপন্ন হতে পারে এবং আমি আগ্রায় নিজের সিংহাসনে যখন পুনরায় আরোহন করবো আমি তাকে এজন্য উপযুক্তভাবে পুরস্কৃত করব।
আপনি এখনও আমাদের রাজবংশ আর এর নিয়তিতে বিশ্বাস করেন, এতসব কিছু ঘটে যাবার পরেও…?
হ্যাঁ। কামরান আর আসকারির বিশ্বাসঘাতকতা আর এতো রক্তপাতের পরেও যখন আমি আমার সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক মুহূর্তে এসব চিন্তা করি তখনও আমি এটা নিয়ে কোনো রকমের সন্দেহের দোলাচালে ভুগি না। আমি বিশ্বাস করি নিয়তি মোগলদের হিন্দুস্তানে নিয়ে এসেছে। তুমিও কি সেটা বিশ্বাস করো না?
হিন্দাল অবশ্য কোনো মন্তব্য করে না।
আমাদের মরহুম আব্বাজান তাঁর জীবনে বহু বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন এবং কখনও হতাশ হননি, হুমায়ুন জোর দিয়ে বলে। তোমার যদি আমার কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তবে তাঁর লেখা রোজনামচাগুলো পড়ে দেখতে কিংবা ফুপুজানের সাথে কথা বলতে পার। খানজাদার বয়স হয়েছে কিন্তু আমাদের আব্বাজানের, আবেগ আমাদের পূর্বপুরুষদের আবেগ, তার মাঝে এখন সমুজ্জ্বল রয়েছে। তিনিই আমার আফিমের নেশা থেকে আমাকে মুক্ত করেছেন এবং আমাকে অনুধাবন করতে সাহায্য করেছেন যে মহত্বের বোধই কেবল যথেষ্ট না- যা ন্যায্যত আমাদের তাঁর জন্য ঘাম রক্ত ঝরাতে, এবং যুদ্ধ আর সংগ্রাম করতে আমাদের অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে।
