তাদের আমাদের থামাতেই হবে, হুমায়ুন চিৎকার করে বলে। আমাকে অনুসরণ কর!
আকবরকে পাশে নিয়ে, হুমায়ুন তার ঘোড়ার গলার কাছে মাথা নীচু করে রেখে প্রতিপক্ষের অশ্বারোহীদের পেছনে ধাওয়া করতে শুরু করে। ইস্পাতের বক্ষস্থল আবৃতকারী বর্ম পরিহিত, গাট্টাগোট্টা দেহের একজন সেনাপতির নেতৃত্বে, দলটা পরস্পরের সাথে দৃঢ়ভাবে একত্রিত থেকে আর প্রতিরক্ষা বিন্যাস বজায় রেখে এগিয়ে যেতে থাকে, তারা স্পষ্টতই নিজের জীবনের পরোয়া না করে তাদের সহযোদ্ধাদের ভাগ্য বিপর্যয় সম্বন্ধে যত দ্রুত সম্ভব সিকান্দার শাহকে সতর্ক করাই আপাতভাবে তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
হুমায়ুন আর তার লোকেরা ধীরে ধীরে সামনের দলটার সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনে। তারা যখন তীর নিক্ষেপের দূরত্বে অবস্থান করছে তখন হুমায়ুন পিঠ থেকে তাঁর ধনুক আলগা করে নিয়ে তীরের তূণীরের উদ্দেশ্যে হাত বাড়ায়। দাঁত দিয়ে লাগাম কামড়ে ধরে সে রেকাবের উপরে দাঁড়িয়ে গিয়ে প্রতিপক্ষের সেনাপতিকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করে। তাঁর তীর ইঞ্চিখানেকের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তার নিক্ষিপ্ত তীর লোকটার পর্যাণে বিদ্ধ হয়। সে ধনুকে দ্বিতীয় তীর জোড়ার আগেই শত্রু সেনাপতি গলায় তীরবিদ্ধ অবস্থায় ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ে। তার পা রেকাবে আটকে গিয়ে সেভাবেই সে তাঁর আতঙ্কিত ঘোড়ার পেছন পেছন বেশ কিছুদূর ছেচড়ে যায়- পাথুরে মাটিতে তার মাথা লাফাতে থাকে- যতক্ষণ না রেকাব ভেঙে যায়। সে তারপরে মাটিতে দুবার গড়িয়ে গিয়ে নিথর হয়ে পড়ে থাকে। হুমায়ুন বুঝতে পারে প্রাণঘাতি তীরটা আর কেউ না, আকবর নিক্ষেপ করেছিল। সেকান্দার শাহের অন্যান্য লোকেরাও নিজেদের ঘোড়া থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।
শাবাস, দারুণ নিশানা ভেদ! হুমায়ুন নিজের ছেলেকে চিৎকার করে বাহবা দেয়, কিন্তু এখন আমার পেছনে থাকো।
হুমায়ুন তার ঘোড়ার পাঁজরে গুঁতো দিয়ে আবারও জন্তুটাকে প্রতিপক্ষের ডজনখানেক অবশিষ্ট যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে পুতবেগে ছোটায়। সে অচিরেই দলটার একেবারে পেছনের আরোহীর পাশে চলে আসে, বেচারা তাঁর ঘামে ভেজা, হাঁপাতে থাকা টাটু ঘোড়াটাকে বেপরোয়া ভাবে সামনের দিকে দাবড়াতে চেষ্টা করছে। হুমায়ুনকে দেখতে পেয়ে সে তার গোলাকৃতি ঢালটা কোনমতে অর্ধেক তুলে কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। হুমায়ুনের তরবারির মৃত্যুদায়ী ফলা লোকটার শিরোস্ত্রাণের নীচে তাঁর গলার পেছনের দিকে আড়াআড়ি ছোবল বসায়। তার গোলাপী রক্ত ছিটকে আসে এবং শক্ত মাটির উপরে সে আছড়ে পড়ে।
হুমায়ুন পিছনে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না বরং পলাতক অশ্বারোহীদের একজনকে যাকে এখনও কেউ ধরতে পারেনি এবং তার একজন লোক তাঁকে ধাওয়া করছে কিন্তু সে এখনও প্রাণপনে ঘোড়া দাবড়ে চলেছে তার দিকে নিজের ঘোড়া ছোটায়। একটা দ্রুতগামী কালো ঘোড়ায় উপবিষ্ট লোকটা দুর্দান্ত, সাবলীল অশ্বারোহী তার ঘোড়ার খুর মাটিতে আঘাত করতে সেখান থেকে পাথরের টুকরো ছিটকে উঠে। হুমায়ুনের ঘোড়াটা অনেক তাজা হলেও সে প্রাণপনে দাবড়েও তাঁকে খুব একটা কাবু করতে পারে না। হুমায়ুন অবশেষে তাঁর আরও তিনজন দেহরক্ষীসহ লোকটার পাশে পৌঁছালে লোকটা তার একজন দেহরক্ষীকে হাতের বাকান তরবারি দিয়ে আঘাত করতে চেষ্টা করে। লোকটা হাত তুলে নিজের মাথা কোনমতে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া থেকে বাঁচায় কিন্তু কলাচীতে একটা গভীর ক্ষত প্রাপ্ত হয়ে লড়াই থেকে পিছিয়ে আসে। দেহরক্ষীকে আঘাত করতে গিয়ে অবশ্য প্রতিপক্ষের অশ্বারোহী নিজেকে হুমায়ুনের তরবারির ধাক্কার সামনে নিজেকে অরক্ষিত করে ফেলে যা তাঁর উরুর গভীরে কেটে বসে যায় এবং সেও ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে গেলে তার ঘোড়াটা একাকী ছুটে দূরে চলে যায়।
হুমায়ুন নিজের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে এবং পর্যাণের উপর ঘুরে গিয়ে, সে পেছনে তাকিয়ে দেখে অবরোধের ভিতর থেকে পালিয়ে আসা সবাইকেই পরাভূত করা হয়েছে আর তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আকবর নিরাপদ রয়েছে। তাঁরা সবাই যখন একত্রে আবার গ্রামের চারপাশের মূল যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে ফিরে যায় হুমায়ুন দেখে বেশীর ভাগ স্থানেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছে। কয়েকটা মাটির ঘরের চারপাশে কেবল যা একটু যুদ্ধ চলছে। সেখানে একটা ঘরের খড়ের চালায় আগুন জ্বলছে, সম্ভবত মাস্কেট বা কামানের গোলাবর্ষণের সময় কোনো ফুলিঙ্গ এসে পড়েছিল বা তাঁর নিজের লোকেরাই ইচ্ছাকৃতভাবে ভেতরে আশ্রয় নেয়া লোকদের বাইরে বের করে আনবার জন্য আগুন ধরিয়েছে। হুমায়ুন কাছাকাছি এগিয়ে আসবার পরে দেখে যে সেখানের লড়াইও শেষ হয়েছে এবং প্রতিপক্ষ তাদের অস্ত্র সমর্পণ করছে।
চার ঘন্টা পরে, কালো প্রায় গাঢ় বেগুনী বর্ণের মেঘে আকাশ ছেয়ে যায় এবং একটা উষ্ণ বাতাস বইতে থাকে- হুমায়ুন ভাবে, যেকোনো দিন বর্ষাকাল শুরু হয়ে যাবে, সম্ভবত আজ দুপুরবেলায়ও ব্যাপারটা ঘটতে পারে। তাঁর টকটকে লাল রঙের নিয়ন্ত্রক তাবুর চাঁদোয়ার নীচে হুমায়ুনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আকবরের দিকে ঘুরে তাকিয়ে, সে তার সন্তানের কাধ একটা হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে। আমি সবসময়ে নিজের তীরন্দাজির দক্ষতার জন্য গর্ববোধ করতাম কিন্তু আজ প্রতিপক্ষের সেনাপতিকে লক্ষ্য করে তোমার ছোঁড়া তীরটা অসাধারণ ছিল।
