সে তার পরবর্তী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্বে তাঁর প্রধান বাহিনীকে শদ্র নদীর একটা শাখানদীর দক্ষিণ তীরে শিরহিন্দ বলে একটা শহরের কাছাকাছি জড়ো করছে। তিনদিন পূর্বে সিকান্দার শাহের বার্তাবাহকদের একটা দলের কাছে আমাদের লোকেরা কিছু চিঠিপত্র জব্দ করেছিল সেগুলো থেকে জানা যায়, দিল্লী থেকে তিনি আরও অতিরিক্ত সৈন্য আসতে বলেছেন এবং আগামী দশদিনের ভিতরে তাদের একটা বিশাল বাহিনী তার অন্য সৈন্যদের বেতনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ আর সেই সাথে আরো যুদ্ধ উপকরণ নিয়ে পৌঁছাবে বলে তিনি আশা করছেন।
আপনি নিশ্চিত সংবাদটার ভিতরে কোনো ঝামেলা নেই, একেবারে খাঁটি?
বার্তাটার উপরে সিকান্দার শাহের সিলমোহর করা ছিল, এই দেখেন…
বৈরাম খান তার বুকের সাথে ফিতা দিয়ে বেঁধে রাখা বহু ব্যবহারে জীর্ণ চামড়ার একটা বটুয়া খুলে ভেতর থেকে ভাঁজ করা কাগজের বিশাল একটা গোছা বের করে যার উপরে লাল মোম গলিয়ে সিল করা রয়েছে এবং সেটা হুমায়ুনের দিকে এগিয়ে দেয়।
চিঠিটা দেখে আসলই মনে হচ্ছে কিন্তু পুরো ব্যাপারটা কি কোনো কূটচালের অংশ হিসাবে সাজানও হতে পারে না?
সুলতান, আমার সেটা মনে হয় না। বার্তাবাহকদের আমাদের লোকদের যে দলটা বন্দি করেছিল তারা আমাদের মূল বাহিনী থেকে অনেক দূরে প্রায় চল্লিশ মাইল পূর্বদিকে রেকি করছিল। তারা বলেছে যে বার্তাবাহকদের তারা যখন পেছন থেকে ধাওয়া করেছিল তখন ইতস্তত বিচরণ করার বদলে, যেমনটা তাঁদের কাছে প্রত্যাশিত যদি তাঁরা ধরা দিতে আগ্রহী হতো, লোকগুলো প্রাণপনে ঘোড়া হাকিয়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমি যখন বার্তাবাহকদের সাথে কথা বলি, সিকান্দার শাহের লোকেদের চোখে মুখে বিস্ময়ের অভিব্যক্তি আর ধরা পড়ার জন্য তারা লজ্জিত সেটা স্পষ্ট ফুটে ছিল। তারা যদি অভিনয় করে থাকে তাহলে বলতেই হবে ব্যাটারা জাত অভিনেতা।
ঘটনা যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে শক্তিবৃদ্ধির জন্য প্রেরিত অতিরিক্ত বাহিনীর অভিগ্রহণের জন্য আমরা তাহলে দেহের প্রতিটা পেশী ব্যবহার করবো এবং অর্থ আর যুদ্ধ উপকরণ বাজেয়াপ্ত করবো। সম্ভাব্য সব যাত্রাপথের উপর নজর রাখতে অবিলম্বে গুপ্তদূতদের পথে নামার আদেশ দেন।
*
সুলতান, আমাদের উপস্থিতি সম্বন্ধে তাঁদের নিয়োজিত প্রহরীরা সতর্ক করে দিয়েছে, আহমেদ খান সামান্য হাঁপাতে হাঁপাতে হুমায়ুনকে বলে। তারা সামনে অগ্রসর হওয়া বন্ধ করে এখান থেকে দুই মাইল দূরে ঐ উচ্চভূমিরেখার শীর্ষদেশের ওপাশে অবস্থিত একটা ছোট গ্রামের চারপাশে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে এসে একটা রক্ষণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছে আর এদিকে গ্রামটার বাসিন্দারা তাদের আসতে দেখে আগেই ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। তারা গ্রামটার মাটির দেয়ালের পেছনে নিজেদের লোকদের মোতায়েন করছে এবং বাড়তি অবরোধক সৃষ্টির জন্য নিজেদের মালবাহী শকটগুলো উল্টো করে এলোপাথাড়ি ফেলে রাখছে।
তারা সেখানে কতজন লোক রয়েছে?
প্রায় পাঁচ হাজার হবে, বেশীরভাগই অশ্বারোহী যোদ্ধা যাদের ভিতরে, একটা অতিকায় মালবাহী শকটকে পাহারা দেবার জন্য, কিছু তবকিও রয়েছে। তাঁদের সাথে বেশ কিছু সংখ্যক ছোট কামানও রয়েছে।
তাদের চমকে দেয়ার আর কোনো সুযোগ এখন আমরা পাব না, তাঁরা নিজেদের যুদ্ধ প্রস্তুতি শেষ করার আগে এখন আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি হলো আক্রমণ করা। বৈরাম খান আপনার লোকদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন।
হুমায়ুনকে ঘন্টা দেড়েক পরে গ্রামটার উপরে উচ্চভূমিরেখার শীর্ষদেশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এবং তাকিয়ে দেখে তার লোকদের আক্রমণের প্রথম ঝাপটা বৈরাম খানের নেতৃত্বে অস্থায়ী অবরোধকের পেছনে অবস্থান গ্রহণকারী সেকান্দার শাহের সৈন্যদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সেকান্দার শাহের কামান গোলাবর্ষণ শুরু করতে বিকট একটা শব্দ ভেসে আসে। বৈরাম খানের বেশ কয়েকজন লোক ভূমিশয্যা গ্রহণ করে। তবকির চাপা শব্দ এর ঠিক পরেই ভেসে এসে আরো কয়েকটা পর্যাণ আরোহী শূন্য করে। অবরোধকের কাছে পৌঁছাবার পূর্বে দ্বিতীয়বারের মতো কামান গোলাবর্ষণ করলে আরো বেশী সৈন্য হত হয় কিন্তু তারপরেও নাছোড়বান্দার মতো বৈরাম খানের লোকেরা সামনে এগিয়ে যেতে থাকে।
আব্বাজান ওদিকে দেখেন ওখানে কি মুস্তাফা আর্গুন সৈন্যসারির সামনে অবস্থান করছে? আকবর উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠে।
হুমায়ুন তাঁর সন্তানের নির্দেশক আঙ্গুলের গতিপথ অনুসরণ করে এবং গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া কামানের সাদা ধোয়ার ভিতরে তাঁর নতুন নিযুক্ত সেনাপতিকে নিজের মাদি ঘোড়া নিয়ে একটা মাটির দেয়ালে লাফিয়ে অতিক্রম করতে দেখে, তার বেশ কয়েকজন লোককে ঠিক পেছনেই অবস্থান করতে দেখা যায়। হুমায়ুন অন্যত্র দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখে যে তাঁর অশ্বারোহী যোদ্ধাদের একটা বিশাল অংশ এমন জোরাল কামানের গোলার সম্মুখীন হয়েছে যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে তারা পিছু হটে আসছে, সিকান্দার শাহের লোকদের তৈরী করা অস্থায়ী প্রতিরক্ষা কাঠামোর ঠিক সামনের এলাকায় মানুষ আর ঘোড়ার হত-আহত দেহ বিছিয়ে রয়েছে।
হুমায়ুন তারপরেই বৈরাম খানকে তাঁর একদল লোকের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করতে দেখে, ইতিপূর্বে যাদের জরুরী প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে কামানের আওতা থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। মুস্তাফা আর্গুন আর তার লোকেরা অবরোধকের যে অঞ্চল অতিক্রম করেছে তারা আস্কন্দিত বেগে সেদিকে এগিয়ে যায় এবং তাঁদের অনুসরণ করে দ্রুত শত্রু শিবিরের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করেই পেছন থেকে প্রতিপক্ষের অবস্থানের উপরে হামলা শুরু করে। অশ্বারোহী যযাদ্ধারা বেশ কিছুক্ষণ মরীয়া হয়ে লড়াই করতে থাকে, কখনও আক্রমণ করতে করতে সামনে এগিয়ে যায়, কখনও আবার আক্রমণ প্রতিরোধ করতে করতে পিছিয়ে যায় কিন্তু সিকান্দার শাহের তবকিদের দৃঢ়তার কারণে ক্রমাগত ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হওয়া সত্ত্বেও অবরোধক অতিক্রম করে আরো বেশী সংখ্যক সৈন্য ভিতরে প্রবেশ করলে ধীরে ধীরে হুমায়ুনের সৈন্যরা প্রতিপক্ষের উপরে প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করে। এক পা, এক পা করে আক্রমণ প্রতিহতকারীদের তাদের মূল অবস্থান থেকে। অপেক্ষাকৃত ছোট একটা জায়গায় পশুর পালের মতো তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সিকান্দার শাহের একদল অশ্বারোহী সহসা নিজেদের সহযোদ্ধাদের জটলার ভিতর থেকে ছিটকে বের হয়ে এসে অবরোধকের একটা শূন্যস্থানের ভিতর দিয়ে লড়াই করে নিজেদের জায়গা করে নিয়ে তারপরে সেকান্দার শাহের মূল বাহিনীর অবস্থানের অভিমুখে দৃঢ়সংকল্প নিয়ে ঘোড়ার খুরে তুফানের বোল তুলে ছুটতে শুরু করে।
