তুমি তোমার উপর অর্পিত দায়িত্ব ভালোমতো পালন করেছে। তোমার আর তোমার লোকদের আমার অধীনে চাকরি করার প্রস্তাব আমি গ্রহণ করছি এবং আমার বাহিনীতে স্বেচ্ছায় যোগ দিতে আগ্রহী অন্যদের আমি গ্রহণ করবো যদি তাঁদের আধিকারিকেরা তাদের আন্তরিকতার ব্যাপারে তোমার মতো করে আমাকে বোঝাতে পারে। তারপরে হুমায়ুন, বৈরাম খানের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলে, প্রতিটা বিজয় আমাদের লক্ষ্যের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের হোঁচট খাওয়া চলবে না নতুবা আমরা এখন পর্যন্ত যা কিছু অর্জন করেছি সব হারিয়ে ফেলবো। আজ রাতে আমরা আমাদের বিজয় উদযাপন এবং আমাদের সাথে যোগ দেয়া নতুন সহযোদ্ধাদের স্বাগত জানাতে ভোজসভার আয়োজন করবো কিন্তু আগামীকাল সকালেই আমার সিংহাসনের শেষ দাবীদার, সিকান্দার শাহকে পরাস্ত করতে যাত্রা শুরু করবো। সে একজন চৌকষ সেনাপতি এবং তিন দাবীদারের ভিতরে তার সেনাবাহিনীই সবচেয়ে বড়। দিল্লী তার নিয়োজিত শাসনকর্তার অধিকারে রয়েছে এবং সে তার সেনাবাহিনী নিয়ে রাজধানী অভিমুখী সড়কের পাশে অবস্থান করছে। আমাদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়ে রয়েছি।
সেদিন গভীর রাতে, কর্কশ কণ্ঠের গান আর আমোদ-ফুর্তির শব্দ অস্থায়ী ছাউনির চারপাশে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলে, হুমায়ুন উৎসবের অনুষ্ঠান ত্যাগ করে। সে ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে রাতের মখমল কালো আকাশের বুকে মিটমিট করতে থাকা তারকারাজির দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু তারপরে মন্থর পায়ে হেঁটে নিজের তাবুতে ফিরে যায়। তাবুর সামনে অপেক্ষমান একজন প্রহরী পর্দা তুলে ধরতে হুমায়ুন ভেতরে প্রবেশ করে নীচু একটা টেবিলের সামনে আসন গ্রহণ করে। সে লেখার জন্য একটা লেখনী তুলে নিয়ে সেটা জেড পাথরের তৈরী কালির দোয়াতে ডুবিয়ে তুলে নিয়ে তেলের প্রদীপের মিটমিট করতে থাকা আলোয়, পরের দিন সকালে কাবুলের উদ্দেশ্যে ফিরতি পথে ডাকবাহক দীর্ঘ যাত্রা শুরু করার পূর্বে তাঁর হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য, হামিদাকে চিঠি লিখতে আরম্ভ করে। সে লিখে যে সে আর আকবর নিরাপদে রয়েছে, হামিদার প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা আরো একবার কবুল করে এবং সেই সাথে আরো জানায় যে সে নিশ্চিতভাবেই হিন্দুস্তানের সিংহাসনে আরো একবার সে অধিষ্ঠিত হতে চলেছে।
*
বাতাস উষ্ণ আর নিশ্চল, এবং হুমায়ুন নীচু বেলেপাথরের পাহাড়ের উপরে তাঁর সুবিধাজনক অবস্থান থেকে চারপাশে তাকালে সে দেখে যে দূরে দিগন্তের কোণে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে যেমনটা বর্ষাকাল আসন্ন হওয়ায় গ্রীষ্মের শুরুর দিকের দুপুরবেলা প্রায়ই জমে থাকে। তার্তার খানের সেনাপতিদের পরাস্ত করার ঘটনা এখন প্রায় একমাসের পুরাতন একটা ব্যাপার। এই সময়ে সে নিজের যাত্রাপথ পূর্বদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে সেকান্দার শাহের বাহিনীর পিছু ধাওয়া করেছে, লোকটার বাহিনীতে, গুপ্তদূতদের ধারণা অনুসারে প্রায় সোয়া লক্ষ সৈন্য রয়েছে সংখ্যাটা হেসেখেলে হুমায়ুনের বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশী যদিও তাঁর নিজের বাহিনীর সংখ্যা এই মুহূর্তে এক লাখের কাছাকাছি।
হুমায়ুন দ্রুত অনুধাবন করে যে বিজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হলে সংখ্যার কারণে শত্রুর সুবিধাজনক স্থানে অবস্থানের ব্যাপারটাকে ক্ষয়িষ্ণু করতে হবে, উন্মুক্ত ভোলামাঠে তাঁদের মোকাবেলা করার আগে। হুমায়ুন সেজন্য, পক্ষকাল পূর্বে বৈরাম খানের অধীনে একদল হানাদার প্রেরণ করেছে এই আদেশ দিয়ে যে যতটা অল্প সংখ্যক জিনিষপত্র নিয়ে দ্রুত ঘোড়া দাবড়ে গিয়ে হাজির হয়ে তার শত্রুদের পর্যবেক্ষণ-ফাঁড়ি তছনচ করতে এবং দিল্লীর সাথে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাতে। সে এখন রুক্ষ প্রান্তরের উপর দিয়ে বৈরাম খানের বাহিনী ফিরে আসছে। দেখতে পায়। বার্তাবাহক তাঁকে ইতিমধ্যে জানিয়েছে যে তারা সামান্য সাফল্য লাভ করেছে, কিন্তু বৈরাম খানের নিজের মুখ থেকে সে এই সাফল্যের মাত্রা জানতে চায় এবং সে আর তার লোকেরা তাদের শত্রুর শক্তিমাত্রা আর ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্বন্ধে আর কি জানতে পেরেছে।
সংবাদের জন্য বড়বেশী উদগ্রীব থাকায় বৈরাম খান তাঁর সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে হুমায়ুন দেহরক্ষীদের তাঁর কাছে ডেকে পাঠায় এবং তার বিশাল কালো ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দিয়ে আস্কন্দিত বেগে পাহাড়ের উপর থেকে বৈরাম খানের সৈন্যসারি অভিমুখে নামতে আরম্ভ করে। হুমায়ুন আর বৈরাম খানকে একটা নিঃসঙ্গ গাছের সীমিত ছায়ার নীচে এক ঘন্টা পরে, লাল আর নীলের নক্সা করা একটা গালিচার উপরে ছড়িয়ে রাখা তাকিয়ার মাঝে বসে থাকতে দেখা যায়।
সুলতান, অতর্কিত হামলায় আমাদের সাফল্য বহু কষ্টার্জিত বিজয়। সিকান্দার শাহের সৈন্যরা আমাদের অন্যান্য প্রতিপক্ষের মতো না তারা যথেষ্ট শৃঙ্খলাবদ্ধ। অতর্কিত হামলায় তারা যখন চমকে যায় এবং সংখ্যায় প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক কম তখনও তারা আতঙ্কিত হয় না বা পলায়ন করে না বরং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আরও প্রবলভাবে লড়াই করতে থাকে, কখনও কখনও আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগে তারা আমাদের প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে।
আমরা যেমন আশঙ্কা করেছিলাম, তারা আসলেই তবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। সিকান্দার শাহের সৈন্য সমাবেশ সম্বন্ধে কি কিছু জানতে পেরেছেন?
