লোকটাকে আমার সামনে হাজির করো।
কয়েক মিনিটের ভিতরে আহমেদ খানের দুইজন সৈন্য নিখুঁতভাবে কামান কালো দাড়ির অধিকারী প্রায় ত্রিশ বছর বয়সের দীর্ঘদেহী একজন লোককে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে। তাঁর পক্ষে হুমায়ুনকে আক্রমণের ন্যূনতম সম্ভাবনাও নাকচ করতে তারা লোকটার দুপায়ে এমনভাবে শিকল পরিয়ে রেখেছে যে সে কোনোমতে পা টেনে টেনে হাঁটতে পারে। সে যখন হুমায়ুনের কাছ থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে রয়েছে সে অভিবাদন জানাবার ভঙ্গিতে মাটিতে শুয়ে পড়ে।
হুমায়ুন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে কিছু একটা ভাবে তারপরে কথা বলে। তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে দাও। তারপরে সে জিজ্ঞেস করে, কে তুমি?
মুস্তাফা আর্গুন, তার্তার খানের বাহিনীতে কর্মরত একজন তূর্কী সেনাপতি।
আমাকে বলা হয়েছে যে তুমি আমার প্রতি নিজের আনুগত্য পরিবর্তনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে।
আমার অধীনস্ত একশ লোকেরও একই অভিপ্রায়।
কেন?
আমরা তার্তার খানের বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম ধনসম্পদের এবং সে যদি হিন্দুস্তানের পাদিশাহ্ হয় তাহলে পদবী পাবার আশায়। কিন্তু আমরা দেখেছি এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সে মোটেই উৎসাহী নয়। গুজরাতে সীমান্ত এলাকায় নিজের উপপত্নীর কণ্ঠলগ্ন হয়ে সে যখন অলস সময় অতিবাহিত করছে, তখন তাঁর মতোই সিংহাসনের দাবীদারদের ভিতরে সবচেয়ে দূর্বল, আদিল শাহের বিরুদ্ধে এই আপাত অর্থহীন অভিযানে সে আমাদের প্রেরণ করেছে। আমাদের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সে আমাদের সাথে পর্যাপ্ত সংখ্যক লোকবল, যুদ্ধের উপকরণ কিংবা অস্ত্র প্রেরণ করেনি এবং গত তিনমাস আমরা কোনো বেতনও পাইনি। আমাদের ধারণা রাজসিংহাসন পুনরুদ্ধারের বিষয়ে একনিষ্ঠ এবং আপনি যখন সেই লক্ষ্য অর্জনে সফল হবেন তখন আমাদের পুরস্কৃত করতে কোনো রকম কার্পণ্য দেখাবেন না।
আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার আব্বাজান তার অধীনস্ত তূর্কী তোপচিদের সম্বন্ধে কতখানি উচ্চধারণা পোষণ করতেন। আমিও অন্য সম্প্রদায় থেকে আগত যোদ্ধাদের দ্বারা দারুণভাবে উপকৃত হয়েছি। পারস্যের শাহের সৈন্যবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে বৈরাম খান আমার সাথে যোগ দিয়েছে। কিন্তু তোমার অভিপ্রায়ের আন্তরিকতার বিষয়ে আমি কিভাবে নিশ্চিত হবো?
আমরা পবিত্র কোরান শরীফ ছুঁয়ে আপনার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের শপথ নিতে প্রস্তুত বা আপনার পরবর্তী আক্রমণের সময় নিজেদের যোগ্যতা প্রদর্শনের জন্য আপনি আমাদের আক্রমণ শুরু করার দায়িত্ব দিতে পারেন।
আমি দুটো প্রস্তাবই বিবেচনা করে দেখবো কিন্তু তার আগে তোমার জন্য প্রাথমিক একটা পরীক্ষা রয়েছে। তোমাদের বাহিনীর অন্য অংশের যেসব সৈন্যরা ঐ টিলার মাথায় আমাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় রয়েছে তাদের নিকটে গিয়ে, আত্মসমর্পণের জন্য তাঁদের প্ররোচিত করো। তাদের আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত ত্বরান্বিত করতে আমার শর্তগুলো হল- ভারী যুদ্ধাস্ত্র রেখে তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত অস্ত্র সাথে নিয়ে কোনোভাবে নিগৃহীত না হয়ে এখান থেকে বিদায় নিতে পারে বা তোমার মতো স্বেচ্ছায় আমার বাহিনীতে যোগ দিতে পারে। তারা যদি আত্মসমর্পন না করে, পরবর্তী আক্রমণের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তোমার প্রস্তাব আমি হয়তো বিবেচনা করবো, যা তাদের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হবে। তুমি কি আমার প্রস্তাব গ্রহণ করতে রাজি আছো?
জ্বী, সুলতান।
তার পায়ের শেকল খুলে দাও।
মুস্তাফা আর্গুনকে, সোয়া ঘন্টা পরে নিজের দশজন লোককে নিয়ে হুমায়ুনের শিবির থেকে ঘোড়ায় চেপে বের হয়ে আসতে দেখা যায়। তাঁর সহযোদ্ধারা যেখানে সমবেত হয়েছে সেই টিলার কাছে সে পৌঁছালে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যুহে একটা ফাটলের জন্ম দিয়ে তাঁকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়। হুমায়ুন দূর থেকে মুস্তাফা আর তার লোকদের গাছপালা শূন্য টিলার উপরে উঠতে দেখে সেখানে সমবেত হওয়া আধিকারিকদের সাথে আলোচনা করতে। অচিরেই সমবেত মানুষের জটলায় ভাঙ্গণের সৃষ্টি হয় এবং প্রত্যেক আধিকারিককে নিজেদের লোকদের সাথে আলোচনা করতে দেখা যায়। প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যুহের সম্মুখ সারির মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পুনরায় উন্মোচিত হয়ে সেখান দিয়ে মুস্তাফা আর্গুন তার দশজন লোককে পেছনে নিয়ে বের হয়ে এসে হুমায়ুনের অবস্থানের দিকে এগিয়ে আগে টিলার উপর থেকে মাঝেমাঝেই উৎফুল্ল চিৎকারের শব্দ ভেসে আসে।
বৈরাম খান আর আকবরকে পাশে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হুমায়ুনের দিকে সে হাসি মুখে এগিয়ে যেতে শুরু করলে হুমায়ুনের দুজন দেহরক্ষী তার দুপাশে নিজেদের স্থান করে নেয়। কেমন সাফল্য তুমি লাভ করেছে বলে মনে হয়?
সুলতান, আজ এখানে আর কোনো রক্তপাত হবে না। টিলার উপরে অবস্থানরত বাহিনীটার নেতৃত্বে রয়েছে সেলিম নামে এক গুজরাতি যুবরাজ এবং তার বাহিনীর দুই তৃতীয়াংশ গুজরাতি সৈন্য তার্তার খান রাজসিংহাসন অধিকার করার জন্য প্রথম যখন সিদ্ধান্ত নেন তখন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। তাঁরা এই অভিযানের ব্যাপারে ক্লান্ত হয়ে উঠেছে এবং বাড়ি ফিরে যেতে আগ্রহী আর সেজন্য আপনার শর্ত গ্রহণ করতে রাজি আছে।
ভালো কথা। আর বাকি এক তৃতীয়াংশের কি মতামত?
বিভিন্ন স্থান থেকে সমবেত হওয়া যোদ্ধাদের একটা দল। অনেকে একেবারেই কিশোর আমরা যাত্রাপথে তাঁদের গ্রামের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় অভিযানের নেশায় তারা আমাদের দলে যোগ দিয়েছিল কিন্তু এই মুহূর্তে তারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে বেশী আগ্রহী। বাকিরা আমাদের মতোই পোড়খাওয়া ভাগ্যান্বেষী যোদ্ধা, যাদের ভিতরে কেমিল আত্তাক নামে একজন সেনাপতির অধীনে আমার দেশ থেকে আগত একশ বকি, এবং প্রায় সমান সংখ্যক পার্সী তোপচি, আমাদের সাথে সামান্য সংখ্যক যে কামান রয়েছে সেগুলোর দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে। দুটো দলই আমাদের মতো তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আপনার বাহিনীর সাথে যোগ দিতে আগ্রহী।
