আমাদের শত্রুসেনাদের পিছু ধাওয়া কর। তোমাদের পক্ষে যতগুলো প্রাণী আর যুদ্ধের উপকরণ দখল করা সম্ভব দখল কর। উপকরণগুলো সামনে আরও কঠিন যুদ্ধের সময় কাজে লাগবে নিশ্চিতভাবেই যা ভবিষ্যতের গর্ভে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তোমাদের হাতে যদি আদিল শাহ বন্দি হয় তবে তাকে বিন্দুমাত্র করুণা প্রদর্শন করবে না কারণ নিজের শিশু ভাস্তেকে সে কোনো প্রকার করুণা করেনি।
খণ্ডযুদ্ধের তিনঘন্টা পরে, পরাজিত শত্রুকে ধাওয়া করার জন্য হুমায়ুন প্রেরিত সৈন্যদের একটা দল ফিরে আসে। হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে যে তাদের একজন একটা ঘোড়ার লাগাম ধরে টেনে আনছে, যার পিঠে একটা দেহ আড়াআড়িভাবে শুইয়ে রেখে দেহটার হাত-পাগুলো ঘোড়াটার পেটের নীচে একত্রে বেঁধে রাখা হয়েছে। দলটার নেতৃত্বদানকারী যোদ্ধা ঘোড়া থেকে নেমে এসে হুমায়ুনকে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানায়। সুলতান, আদিল শাহের মৃতদেহ আমরা নিয়ে এসেছি। তাঁর দেহরক্ষী দলের যেসব সদস্যদের এখান থেকে মাত্র দুই কি তিন মাইল দূরে আমরা পেছন থেকে ধাওয়া করে গিয়ে বন্দি করেছিলাম তারাই দেহটা আমাদের কাছে সমর্পন করেছে। তারা বলেছে যে আমাদের অতর্কিত আক্রমণের শুরুতে গাদাবন্দুকের একটা গুলিতে বুকে সৃষ্ট ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাতের ফলে সে মারা গিয়েছে।
হুমায়ুন ধীরে ধীরে মৃতদেহটার কাছে এগিয়ে যায় এবং মাথাটা পেছনে টেনে এনে তাঁর প্রতিপক্ষের মুখের দিকে তাকায়। ধূলো আর রক্তের পুরু আস্তরণের নীচে আদিল শাহকে সাধারণ দেখায়। হুমায়ুন তাঁর চোখে মুখে লোকটা উচ্চাশার ধূর্ত গভীরতার কোনো বাহ্যিক লক্ষণ দেখতে পায় না, যার কারণে সে আপন বোনের সন্তানকেও হত্যা করতে কুণ্ঠিত হয়নি। আদিল শাহের মাথাটা ছেড়ে দিয়ে, নিজের শত্রুর প্রতি তাঁর ক্রোধের বহিপ্রকাশের প্রমাণস্বরূপ মৃতদেহটা সমাধিস্থ না করে কুকুর শেয়ালের খাবার হিসাবে ফেলে রাখার জন্য ক্রমশ তার ভিতরে জোরাল হতে থাকা একটা প্রবণতা সে বহু কষ্টে দমন করে। সে বরং ঘুরে দাঁড়াবার কাঠখোট্টা ভঙ্গিতে আদেশ দেয়, তাকে নামহীন একটা কবরে দাফন করবে।
সেইদিন রাতের বেলা, হুমায়ুন তার তাবুর নিরবতার মাঝে, আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে শোকরানা নামাজ আদায় করে। হিন্দুস্তানের সিংহাসনের প্রবল তিন দাবীদারের একজনকে সে তাঁর পথ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানে এখনও নিরুদ্বিগ্ন হবার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। নিজের বিজয়ের প্রণোদনা আর উদ্যম তাকে অবশ্যই বজায় রাখতে হবে এবং চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য নিজেকে আর তার বাহিনীকে উৎসাহিত করতে হবে। অন্যথায়, তার সিংহাসন পুনরুদ্ধার এবং ব্যর্থতা থেকে নিজেকে সাফল্যে অভিষিক্ত করার সুযোগ সে হারাবে এবং কখনও হয়তো আর সুযোগ পাবে না।
আহমেদ খানের গুপ্তদূতেরা পরের দিন সকালে আরেকটা সম্ভাবনার সন্ধান নিয়ে আসে। দক্ষিণ দিক থেকে আগত ভ্রমণকারীদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারে যে পাঁচদিন আগে আসবার পথে তারা তার্তার খানের দুইজন সেনাপতির অধীনে একটা মাঝারি মাপের সৈন্যবাহিনীকে অতিক্রম করেছিল, দলটা উত্তরে তাদের অবস্থানের অভিমুখে এগিয়ে আসছে। আদিল শাহের মুখোমুখি হওয়াই তাদের আপাত অভিপ্রায় যার পরাজিত হবার সংবাদ সম্বন্ধে তারা এখনও অন্ধকারে রয়েছে। তার সামনে হিন্দুস্তানের সিংহাসনের দ্বিতীয় দাবীদারকে মারাত্মকভাবে আঘাত করার একটা সুবর্ণ সুযোগ উন্মোচিত হয়েছে এবং তাঁকে চিরতরে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে অনুধাবন করে হুমায়ুন তখনই তার্তার খানের বাহিনীকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে দক্ষিণে যাত্রা করার জন্য তার বাহিনীকে আদেশ দেয়।
এক সপ্তাহ পরে, হুমায়ুন আরেকটা যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখে। সেদিনই সকালের দিকে তাঁর বাহিনী নিজেদের ঘোড়াগুলোকে সহ্যের প্রায় শেষ সীমায় দিয়ে, পেছন থেকে ধাওয়া করে এসে তাদের শত্রুদের আক্রমণ করতে গিয়ে আবিষ্কার করে যে তাঁদের প্রতিপক্ষ দুটো পৃথক বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে নিজেদের ভিতরে এক মাইল দূরত্ব বজায় রেখে অগ্রসর হচ্ছে। দুটো দলের কোনটাতেই চার হাজারের বেশী সৈন্য হবে না। হুমায়ুন কালক্ষেপন না করে সামনের বাহিনীকে আক্রমণ করার আদেশ দেয়, প্রথম দলটা আক্রমণের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে দ্রুত সমভূমির উপরে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অতর্কিত হামলায় বিপর্যস্ত সাথী যোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে না এসে দ্বিতীয় দলটা পিছু হটে গিয়ে একটা ছোট টিলার মাথায় অবস্থান গ্রহণ করে রক্ষণাত্মক ব্যুহ রচনা করে, হুমায়ুনের অনুগত যোদ্ধারা সময় নষ্ট না করে পুরো টিলাটা ঘিরে ফেলে।
হুমায়ুন ঠিক তখনই টিলার মাথায় একদল আধিকারিককে সমবেত হতে দেখে। তাঁর পাশে অবস্থানরত আহমেদ খানের দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, আমরা কি ঐ দলটার নেতৃত্বদানকারী সেনাপতির নাম জানি?
সুলতান, সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় প্রতিপক্ষের অশ্বারোহী বাহিনীর একজন দলপতি যুদ্ধ করার কোনো চেষ্টা না করেই আত্মসমর্পন করে আমাদের জানায় যে সে আর তার লোকেরা আপনার অধীনে যুদ্ধ করতে আগ্রহী। আমরা তাঁর লোকদের পাহারা দিয়ে রেখেছি এবং তাঁকে আমাদের একটা তাবুতে অন্তরীণ রেখেছি যেখানে সে স্বেচ্ছায় আমাদের শত্রুপক্ষের সেনাবাহিনীর গঠনতন্ত্র আর তাদের মনোবল সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানিয়েছে। সে নিশ্চয়ই তাকে চিনবে।
