হুমায়ুন তার অশ্বারোহী বাহিনীর সম্মুখে অবস্থান করে, মুহূর্ত পরেই, শত্রুপক্ষের সৈন্যসারির অগ্রদলের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে প্রথমেই দুই নিশানাধারীর একজনের মাথার লক্ষ্য করে তরবারি চালিয়ে তাকে কবন্ধ করে ফেলে। লোকটা কাটা কলাগাছের মতো পেছনের দিকে উল্টে পড়ার সময়, তার হাত থেকে বিশাল নিশানাটা ছিটকে যায়, হুমায়ুন এবার স্পষ্ট দেখতে পায় নিশানায় কমলা রঙের প্রেক্ষাপটে সোনালী সূর্য খচিত রয়েছে। বিশাল কাপড়টা হুমায়ুনের কালো ঘোড়ার পেছনের পায়ে জড়িয়ে গেলে প্রাণীটা হোঁচট খায়। হুমায়ুন, দ্বিতীয় নিশানবাহককে তরবারি দিয়ে আঘাতের উদ্দেশ্যে পর্যাণের উপরে সামনে ঝুঁকে পড়ে নিশানা স্থির করার কারণে সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, মাটিতে পড়ে যায়। পাথুরে মাটিতে বেকায়দায় আছড়ে পড়ায়, তাঁর হাত থেকে তরবারি ছিটকে যায়।
আদিল শাহের অন্য একজন লোক, কমলা রঙের পালক শোভিত চূড়াকৃতি শিরোস্ত্ৰাণ পরিহিত গাট্টাগোট্টা দেহের অধিকারী এক আধিকারিক, হুমায়ুনের দেহরক্ষীদের চেয়ে দ্রুত সুযোগটা চিনতে পারে। সে হুমায়ুনের দিকে নিজের খয়েরী রঙের ঘোড়াটা নিয়ে এগিয়ে আসে এবং তার হাতের লম্বা বর্শাটা দিয়ে হুমায়ুনকে মাটিতেই গেঁথে ফেলতে চায়। হুমায়ুন দ্রুত একপাশে গড়িয়ে সরে যাবার ফাঁকে হাত থেকে দাস্তানা খুলে ফেলে কোমরের সাথে ঝোলান রত্নখচিত ময়ান থেকে তার খঞ্জরটা টেনে বের করতে চেষ্টা করে। তাঁর মনে হয় কয়েক যুগ পরে, সে খঞ্জরটা ময়ান থেকে মুক্ত করতে পেরেছে এবং ফুটখানেক লম্বা ফলাযুক্ত অস্ত্রটা সামুনের প্রতিপক্ষের ঘোড়ার গলা লক্ষ্য করে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছুঁড়ে মারে, যে তখন আরেকবার নিজের ঘোড়র পায়ের নীচে তাঁকে পিষে ফেলতে চেষ্টা করছে। খঞ্জরের ফলাটা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে এবং গলা দিয়ে ফিনকে দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকা অবস্থায় জটা টলমল করে উঠে, তারপরে মাটিতে পড়ে যাবার সময় পিঠ থেকে তার আরোহীকে ছিটকে দেয়, লোকটা বিকট শব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ে।
হুমায়ুন ইতিমধ্যে নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে এবং ত্বরিতগতিতে সে বাতাসের অভাবে হাঁসফাস করতে থাকা শত্রুপক্ষের লোকটার দিকে এগিয়ে যায়, মাটিতে আছড়ে পড়ার সময় মাথার লোকটার মাথা থেকে শিরোস্ত্রাণটা ছিটকে গিয়েছে। লোকটা উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করার সময় হুমায়ুন পেছন থেকে গিয়ে তাঁর বৃষস্কন্ধের ন্যায় গলাটা পেঁচিয়ে ধরে। হতভম্ব লোকটা আঁতকে উঠে নিজের মাথা ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পরবর্তী কয়েক সেকেণ্ড তাঁরা দুজনে উন্মত্তের ন্যায় ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে থাকে। সে তারপরে হুমায়ুনের কব্জি আর হাতের আবরণহীন মাংসপেশীতে প্রাণপনে কামড় দিয়ে রক্ত বের করে ফেলে। হুমায়ুনের তার হাতের বাঁধন খানিকটা শীথিল করলে আধিকারিক লোকটা এক মোচড়ে নিজের মাথা হুমায়ুনের হাতের প্যাঁচ থেকে ছাড়িয়ে নেয়। লোকটা হুমায়ুনের রক্তে রঞ্জিত দাঁত বের করে আধো হাসির একটা বীভৎস ভঙ্গি করে এবং কালক্ষেপন না করে সোজা হুমায়ুনের কুঁচকি লক্ষ্য করে লাথি বসিয়ে দিয়ে চেষ্টা করে। কিন্তু হুমায়ুন লাফিয়ে উঠে পেছনে সরে যেতে তাঁর প্রতিপক্ষের লাথি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে সে ভারসাম্য হারিয়ে টলমল করতে থাকে। হুমায়ুন এক লাথিতে লোকটার দেহের নীচে থেকে বাকি পাটাকেও শূন্যে তুলে দেয় এবং নোকটা মাটিতে পড়ে গেলে সে তাকে লক্ষ্য করে লাফ দেয় এবং দুই হাঁটু একসাথে লোকটার বুকের উপর নামিয়ে আনে। আধিকারিক লোকটা আবারও বাতাসের অভাবে খাবি খেতে থাকলেও সে কোনোমতে হাটু দিয়ে হুমায়ুনের পিঠে আঘাত করে এবং বুকের উপর থেকে ফেলে দেয়। তারা এবার জড়াজড়ি করে ধূলোতে গড়াতে থাকে যতক্ষণ না হুমায়ুন নিজের পেশী শক্তি আর ক্ষিপ্রতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রয়োগ করে তার প্রতিপক্ষের গলা দুহাতে শক্ত করে আকড়ে ধরে। সে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে লোকটার শ্বাসনালীতে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে চাপ দিয়ে তাঁর গলাটা হেচকা টানে মুচড়ে দেয়। একটা বীভৎস শব্দ শোনা যায় এবং আধিকারিক লোকটার পুরো মুখ ধীরে ধীরে বেগুনী হয়ে যায় এবং তার ঠিকরে বের হয়ে থাকা চোখের মণিতে দৃষ্টির স্বচ্ছতা মুছে গিয়ে সে ধীরে ধীরে নিথর হয়ে যায়। নিথর দেহটা একপাশে সরিয়ে দিয়ে হুমায়ুন কোনমতে নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং নিজের তরবারিটা খুঁজে বের করে হাতে তুলে নেয়। সে চোখমুখ কুঁচকে ভাবে বায়েজিদ খানের সাথে মল্লযুদ্ধের কসরতের প্রশিক্ষণ না নিলে আজ এখানেই তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের ইতি ঘটতো। যুদ্ধের ময়দানে সে একবার ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে গেলে তাঁর দেহরক্ষীদের পক্ষে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা তখন প্রায় অসম্ভব।
হুমায়ুনের সেই দেহরক্ষীরাই এবার তার চারপাশে জড়ো হতে শুরু করে এবং সে এবার সুস্থির ভঙ্গিতে চারপাশে তাকিয়ে দেখে আদিল শাহের অনেকেই ইতিমধ্যে দৌড়ে পালাতে শুরু করেছে। বাকিরা আত্মসমর্পন করে অস্ত্র নামিয়ে রাখছে। কৃষিজীবি গ্রামটার আশ্রয়স্থল থেকে ধূলিঝড়ের মাঝে অশরীরি কোনো কাফেলার মতো আদিল শাহের বাহিনীকে প্রথমবার দেখার পরে এক ঘন্টা সময়ও এখনও অতিক্রান্ত হয়নি। পুরো বাহিনীটা এখন পুরোপুরি বিভ্রান্ত আর ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে, সেই সাথে হিন্দুস্তানের সিংহাসনের উপরে আদিল শাহের নিজের দাবী জোরদার করার সুযোগও একেবারে শেষ হয়ে গিয়েছে।
