দুই সপ্তাহ পরে, প্রথম সকালের কুয়াশায় অবগুণ্ঠিত অবস্থায় তার সৈন্যরা নিজেদের জন্য দ্রুত কিছু একটা খাবার প্রস্তুতের লক্ষ্যে রান্নার করার জন্য আগুন জ্বালাচ্ছে, হুমায়ুন তখন তাঁর সেনাছাউনির একেবারে মধ্যেখানে তার জন্য স্থাপিত লাল রঙের নিয়ন্ত্রক তাবুতে চারপাশে নিজের সামরিক পরিষদমণ্ডলী পরিবেষ্টিত হয়ে বসে রয়েছে। আটদিন পূর্বে লাহোর ত্যাগ করার পরে, সে আর তার বাহিনী দক্ষিণপূর্ব দিকে প্রায় নব্বই মাইল পথ অতিক্রম করে, বৈচিত্র্যহীন, লাল মাটির উপর দিয়ে হিন্দুস্তানের আরও গভীবে প্রবেশ করেছে।
আহমেদ খান, তুমি নিশ্চিত যে আদিল শাহের বাহিনী আমাদের অগ্রসর হবার দিকের সাথে আড়াআড়িভাবে পূর্বদিকে এগিয়ে চলেছে?
হ্যাঁ। পাঁচ দিন পূর্বে, তাঁরা তাঁদের প্রতিপক্ষ সিকান্দার শাহের সৈন্যদের সাথে আরেকটা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে বাজেভাবে পরাস্ত হয়েছে এবং এখন তারা নিজেদের শক্তঘাঁটি সুন্দরনগরের দূর্গের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে পুনরায় নিজেদের সংঘটিত করতে।
তারা কতদূরে অবস্থান করছে?
সুলতান, তারা সম্ভবত আমাদের থেকে আট মাইল সামনে রয়েছে।
সেখানে তাদের সাথে কত লোক রয়েছে?
তাদের সংখ্যা প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি হবে, প্রায় সবাই অশ্বারোহী। তাঁরা তাঁদের বেশীরভাগ কামান আর ভারী যুদ্ধ উপকরণ পথে কোথাও ফেলে এসেছে।
তারা কি অশ্বারোহী প্রহরী কিংবা পাহারা দেয়ার জন্য লোক মোতায়েন করেছে?
সুলতান, নিয়োগ করেছে তবে তাঁদের সংখ্যা খুবই অল্প; তাঁদের নিজেদের ভিতরে মাত্রাছাড়া বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। তারা রাতের বেলা কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়ার নিতে কয়েকঘন্টার জন্য কেবল যাত্রা বিরতি করে এবং যাত্রা শুরু করতে ভোর হবার আগেই ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে। তাদের মাথায় কেবল যত দ্রুত সম্ভব সুন্দরনগর পৌঁছাবার ব্যাপারটাই ঘুরপাক খাচ্ছে।
আমরা তাহলে কালবিলম্ব না করে, কুয়াশার আড়াল যতক্ষণ রয়েছে এর সুবিধা নিয়ে আক্রমণ করবো। আমার লোকদের রান্না করার জন্য জ্বালান আগুন নিভিয়ে ফেলতে বলল। আহার করার মতো সময় হাতে নেই। আমরা অশ্বারোহী যোদ্ধা আর তীরন্দাজদের নিয়ে যাব। সেই সাথে, কিছু নির্বাচিত অশ্বারোহী যোদ্ধাদের আদেশ দেন তারা যেন তাদের ঘোড়ায় নিজেদের পেছনে তবকিদের উঠিয়ে নেয়। বৈরাম খান, আপনি, আকবরের সাথে সেনাছাউনির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। আপনি মজবুত প্রতিরক্ষা ব্যুহ মোতায়েনের বিষয়টা নিশ্চিত করবেন আর পাহারার ব্যবস্থা করবেন। আমি আসন্ন যুদ্ধে বিজয়ী হবার প্রত্যাশা করছি কিন্তু তারপরেও কোনো কারণে আদিল শাহ্ আমাদের কৌশলে এড়িয়ে গেলে বা কোনো কারণবশত সাময়িকভাবে সুবিধাজনক অবস্থান লাভ করলে তখনকার পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য এখানে সেনাছাউনির নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখতে হবে।
দুই ঘন্টা পরে, কুয়াশা পুরোপুরি বাতাসে মিলিয়ে যায়। হুমায়ুন আহমেদ খান আর তাঁর গুপ্তদূতের একটা দল নিয়ে নিজে তার অগ্রসর হতে থাকা মূল বাহিনী থেকে মাইল খানেকের মতো সামনে অবস্থান করছে। সামনে অবস্থিত একটা গ্রামের মাটির দেয়ালের উপর দিয়ে তাকিয়ে থাকে গ্রামটায় মানুষ বলতে কয়েক ঘর দরিদ্র কৃষক পরিবার আর তাদের পোষা মুরগী আর ছাগল রয়েছে। সূর্যের অসহনীয় আলোর উত্তাপের হাত থেকে চোখ বাঁচাতে সে মাথার উপর হাত দিয়ে একটা আড়াল তৈরী করেছে, সে পৌনে একমাইল দূরে, ধূলোবালির তৈরী বিশালাকৃতি একটা মেঘকে জোয়ারের ঢেউয়ের মতো আন্দোলিত হতে দেখে, তার সামনে দিয়ে, ধূলিঝড়টা ডানদিক থেকে বামদিকে এগিয়ে যায়। ধূলিঝড়ের ভিতরে, হুমায়ুন কোনমতে একদল অশ্বারোহী আর কয়েকটা ছোট মালবাহী শকটের অবয়ব চিনতে পারে, খচ্চর বা ষাড় দিয়ে শকটগুলো টেনে নেয়া হচ্ছে। কাফেলাটার সামনে দুটো বিশালাকৃতি নিশান বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে। ধূলো ভিতর দিয়ে এবং এতদূর থেকে হুমায়ুন নিশানের রঙ বা নিশানের বুকে কিসের প্রতিকৃতি রয়েছে ঠিকমতো বুঝতে পারে না, কিন্তু এই প্রত্যন্ত প্রান্তরে এহেন ধূলিঝড়ের ভিতরে কেবল আদিল শাহের সৈন্যবাহিনীই এখন পথচলা অব্যাহত রাখবে। দলটা কোনো গুপ্তদূত মোতায়েন করেনি এবং তাঁদের দেখে মনে হয় কোনো ধরনের বিপদের সম্ভাবনা সম্পর্কে তারা একেবারেই উদাসীন।
নাদিম খাজাকে তার অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার নির্দেশ পাঠাও। জাহিদ বেগকে তার লোকজন নিয়ে এখানে উপস্থিত হতে বলো এবং সম্মুখভাগে আক্রমণ পরিচালনার সময় আমি নিজে তাদের নেতৃত্ব দেব। আর অশ্বারোহী যোদ্ধাদের যাদের সাথে তবকিরা রয়েছে তাদের বলো সরাসরি শত্রু সৈন্যসারির অগ্রসর হবার পথের একশ গজের ভিতরে অবস্থান নিতে এবং সেখান থেকে তবকিরা শত্রু সেনার বিপর্যয়ের মাত্রা বৃদ্ধি করবে।
হুমায়ুনের তবকিদের অচিরেই ঘোড়া থেকে নেমে এসে তেপায়ার উপরে তাঁদের লম্বা নলযুক্ত বন্দুকগুলোকে স্থাপন করতে দেখা যায় এবং হুমায়ুন আর তার নেতৃত্বাধীন সৈন্যরা ততক্ষনে প্রায় আদিল শাহের সৈন্যসারির সম্মুখভাগের যোদ্ধাদের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। তাঁদের প্রতিপক্ষ একেবারে শেষমুহূর্তে সহসা শত্রুর উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয় এবং ময়ান থেকে তরবারি বের করতে করতে ঘুরে দাঁড়ায় তাদের মুখোমুখি হতে। প্রতিপক্ষের আধিকারিকেরা সৈন্যদের কাছাকাছি অবস্থান করে আক্রমণের মুখোমুখি হবার জন্য প্রস্তুত হতে আদেশ দেয়। হুমায়ুনের তবকিরা প্রায় সেই সময়েই আদিল শাহের সৈন্যদের অবস্থান লক্ষ্য করে একযোগে প্রথমবার গুলি বর্ষণ করলে, বেশ কয়েকজন সৈন্য পর্যাণ থেকে মাটিতে ছিটকে যায় এবং তাঁদের অনেকের ঘোড়া আহত হয় আর আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
