আপনি নিজের অতীত বিস্মৃত হয়েছেন। আমার মরহুম আব্বাজান হিন্দুস্তান জয় করেছিলেন এবং একটা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা তিনি আমায় দান করে গেছেন। আমি এই স্থানের সাথেই নিজেকে একাত্মবোধ করি। নিজের কন্যা আর কিছু ধনসম্পদ দিয়ে আমায় কেনার কথা চিন্তাও করতে যাবেন না… আমাদের উচিত এসব না করে দুজনে মিলে পরিকল্পনা করা কিভাবে আমার ভূখণ্ড পুনরায় দখল করা যায়। আমরা আমাদের প্রথম বিজয় অর্জন করার সাথে সাথে, অন্যরা আরো একবার আমার নিশানের নীচে এসে সমবেত হবে। কিন্তু আপনি এটা স্বীকার করতে চাইছেন না। বাণিজ্য আপনাকে এতোটাই পৃথুল করে তুলেছে যে আপনি বোধহয় আমাদের যোদ্ধার রীতি ভুলে গিয়েছেন এবং সেই সঙ্গে এর সাথে সম্পৃক্ত দায়বদ্ধতা আর আকাঙ্খিত লক্ষ্য…
হুমায়ুন ক্রোধে এতোটাই উন্মত্ত হয়ে পড়ে যে ভুলে যায় তার ভাই ছাড়াও আরো অন্যান্যরা আশেপাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। মঞ্চের নীচে মির্জা হুসেনের কয়েকজন অমাত্য নীচু টেবিলের চারপাশে বৃত্তাকারে উপবিষ্ট রয়েছে এবং সে সহসা তখন চারপাশের নিস্তব্ধতা আর তাঁদের চোখে ফুটে উঠা বিস্ময় সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে। এটা কাউকে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করা কিংবা কারো সাথে প্রকাশ্য বিরোধিতায় জড়াবার সময় না। হুমায়ুন বহু কষ্টে নিজের মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে যদিও তার খুব ইচ্ছে করছিল তার নাদুসনুদুস এই নিমন্ত্রাতার মাংসল গলাটা টিপে ধরতে। কিন্তু আমি আসলে ভুলে গিয়েছিলাম। আমি আপনার অতিথি। আমি আসলে আমার মনের কথা খোলাখুলি বলে ফেলেছি। মির্জা হুসেন, এসব আলোচনার উপযুক্ত সময় বা স্থান এটা না। আমাকে মার্জনা করবেন। আগামীকাল সকালে আমরা যখন একা থাকবো এবং আমরা যখন উভয়েই বিষয়টা নিয়ে বিবেচনা করার সুযোগ পাব তখন এবিষয়ে আবার আলোচনা হবে।
কিন্তু মির্জা হুসেনের মুখের অভিব্যক্তি দেখে হুমায়ুন স্পষ্ট বুঝতে পারে যে সিন্ধের সুলতানের কাছ থেকে কোনো ধরনের সাহায্যের প্রত্যাশা না করাই উত্তম।
২.৫ সশ্রম আর সংক্ষোভ
২৫. সশ্রম আর সংক্ষোভ
হুমায়ুন পাদিশাহ! সম্রাট হুমায়ুন দীর্ঘজীবি হোন! লাহোরের অধিবাসীদের সম্মিলিত চিৎকারে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে উঠে যখন ১৫৫৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহের কোনো এক উষ্ণ দিনে, হুমায়ুন আর আকবর একটা লম্বা হাতির পিঠে সোনার গিল্টি করা হাওদায় অধিষ্ঠিত হয়ে বিজয়ীর বেশে শহরে প্রবেশ করে, অতিকায় প্রাণীটার পর্যাণের জন্য ব্যবহৃত সোনার জরি দিয়ে কারুকাজ করা আর মাঝে মাঝে মুক্তাখচিত দীর্ঘ কাপড়টা এই মুহূর্তে শহরের প্রশস্ত সড়কের ধূলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে। শোভাযাত্রাটার একেবারে সামনে রয়েছে হুমায়ুনের অশ্বারোহী বাহিনীর একটা চৌকষ দল, যাদের সবাই কালো ঘোড়ার পিঠে আসীন এবং প্রত্যেকের মাথায় রয়েছে সোনালী রঙের পাগড়ি। দলটা দুলকি চালে এগিয়ে যাবার সময় মধ্যাহ্নের সূর্যালোক তাদের হাতে সোজা অবস্থায় ধরে রাখা লম্বা বর্শার ইস্পাতের ফলায় প্রতিফলিত হয়ে চোখ ধাধিয়ে দেয়। তাদের পিছনে, হুমায়ুনের ঠিক সামনে, ছয়জন অশ্বারোহী তূর্যবাদক আর ছয়জন ঢুলী তাঁদের খিলানাকৃতি পর্যাণের উভয়পার্শ্বে স্থাপিত ছোট ছোট দুটো নাকাড়া দক্ষতা আর বলিষ্ঠতার সাথে বাজিয়ে চলেছে। সমবেত জনতার উন্মত্ত চিৎকারের সাথে তাদের সুর মিলেমিশে একাকার হয়ে এমন একটা পরিস্থিতির জন্ম দেয় যে আকবরের কথা শোনার জন্য হুমায়ুনকে বেশ বেগ পেতে হয়।
আব্বাজান আমরা কাবুল থেকে রওয়ানা দেবার পরে এখানে ওখানে কেবল খণ্ডযুদ্ধেরই সম্মুখীন হয়েছি। রোহতাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব দূর্গই আমরা উপস্থিত হওয়া মাত্র আত্মসমর্পণ করেছে আর এখন লাহোরের মতো বিশাল শহরও একই ভাগ্যবরণ করেছে। সত্যিকারের কোনো যুদ্ধের মুখোমুখি না হয়ে হিন্দুস্তানের ভেতরে এভাবে নির্বিঘ্নে আমরা আর কতদূর যাব?
আমার মনে হয়, খুব বেশী দূর না। আমরা খুব শীঘ্রই শেরশাহ আর ইসলাম শাহের রাজত্বের কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করতে চলেছি। সিংহাসনের জন্য তাঁদের যে তিনজন দাবীদার রয়েছে তারা সম্ভবত আমাদের অগ্রসর হবার সংবাদ পেয়ে থাকবে এবং নিশ্চয়ই জানে যে আমরা হিন্দুস্তানের সিংহাসনের ন্যায়সঙ্গত দাবীদাব তাঁদের অন্যান্য যেকোনো সাথী রাজ্যাভিযোগীদের চেয়ে অনেক বড় হুমকির কারণ। তাঁদের সবাই বা যেকোনো একজন নিজেদের ভিতরে বিদ্যমান ঝগড়া থেকে সরে দাঁড়িয়ে আমাদের আক্রমণ করবে।
আপনার কি মনে হয় আমাদের বিরুদ্ধে তারা সঙ্বদ্ধ হতে পারবে?
সম্ভবত, কিন্তু তারা একে অপরের যে পরিমাণ মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞ সাধন করেছে যে সেটা হয়ত আর সম্ভব হবে না। অবশ্য, তাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ শক্তির নিরিখে দুর্দান্ত প্রতিপক্ষ হিসাবে আবির্ভূত হবে।
লাহোরে আমরা কতদিন অবস্থান করবো?
শহরের প্রধান ইমামসাহেব শুক্রবার জুম্মার নামাজের পরে মসজিদে আমার নামে খুৎবা- অনুশাসন- পাঠ করে আমাকে আরো একবার সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করার পরেই আমরা আবার যাত্রা শুরু করবো। তালগাছের ভিতর দিয়ে তাকালে তুমি মসজিদের লম্বা মিনার দুটো দেখতে পাবে। আমাদের অগ্রযাত্রার প্রণোদনা যেভাবেই হোক বজায় রাখতে হবে। আমি প্রায়ই দেরী করে ফেলি আর আমার প্রতিপক্ষকে প্রত্যুপক্রমের সুযোগ করে দেই।
