আপনার বয়োজ্যেষ্ঠ মন্ত্রণাদাতা হিসাবে আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। হতে পারে বাবুরী বিচক্ষণ, কিন্তু একই সাথে সে বদরাগী আর একটা হামবড়া ভাব তার মধ্যে রয়েছে। আপনি যদি তার সাথে আপনার বন্ধুত্বের ব্যাপারে এখনই সতর্ক না হন, অন্যরা তাহলে নিজেদের অবহেলিত মনে করে ঈর্ষান্বিত আর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে…আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই মাঝে মাঝে আমিও এর উর্ধ্বে উঠতে পারি না…
ওয়াজির খানের চোখমুখের বিব্রতভাব লক্ষ্য করে বাবর আলতো করে তার কাঁধ স্পর্শ করে। আপনি আমার সবচেয়ে বড় সহায় এবং অন্যসব ইচকিসের চেয়ে আমি আপনার পরামর্শ বেশি গুরুত্ব দেই। আমি সতর্ক থাকবো…এখন এসব নিয়ে আর শুধু শুধু বিব্রত হবেন না, মন্ত্রণা সভা আহ্বান করেন। তাদের জানা উচিত আমরা পাহাড়ের উপরে কি দেখেছি…
[মনে হয় এখানে কিছু একটা মিসিং, কিন্তু বইতে এমনই আছে। পেজ ১৯৪-১৯৫]
রয়েছে। কেন না? সে মনে মনে ভাবে। বাবর নিজের অবস্থান সুসংহত করতে একাধিক রাজবংশের সাথে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করেছিলেন। খানম যদিও তাকে খুব একটা আলোড়িত করেনি, তবে তার চাহনীর ভিতরে কেমন একটা মাদকতা রয়েছে। মেয়েটার ধমনীতে তারই বংশের রক্ত বইছে এবং শেরশাহের বিরুদ্ধে সগ্রামে তার বাবা একজন দরকারী বন্ধু হিসাবে প্রতিপন্ন হতে পারে। বিয়ের দিন ফুলশয্যায় পূর্ণাঙ্গতা পাবে এমন একটা মৈত্রীর সম্বন্ধ করতে বাধা কোথায়? কাশিমের তথ্য প্রথমবারের মতো যেন ভুল বলে প্রতিয়মান হতে চলেছে- মির্জা হুসেন তাঁকে আদতেই সাহায্য করতে ইচ্ছুক। কিন্তু একটা বিষয়ে হুমায়ুন নিশ্চিত। স্ত্রী হিসাবে কাউকে গ্রহণ করার পূর্বে তাকে অবশ্যই তার শত্রুদের পরাস্ত করতে এবং নিজের সিংহাসন সুরক্ষিত করতে হবে। খোলাখুলি কথা বলার এবার সময় হয়েছে।
মির্জা হুসেন, খানমকে কোনোদিন স্ত্রী হিসাবে বিবেচনা করতে পারলে আমি খুশীই হব। সে আকর্ষণীয় দেখতে, বিষয়নিপূণা একজন রমণী। আমরা ভাবনার পুরোটা জুড়ে যদিও এখন কেবলই যুদ্ধ এবং আমার হারানো ভূখণ্ড উদ্ধারের কথা বিরাজ করছে, বিয়ে নয় এবং সেজন্য আমি আপনার সাহায্যপ্রার্থী। আপনি আপনার আতিথিয়তা আর উপঢৌকনের ব্যাপারে যথেষ্ট উদারতা দেখিয়েছেন কিন্তু আমি আপনার সেনাবাহিনীর সহায়তা চাইছি। আসুন সবার সামনে আমরা আমাদের মৈত্রীর কথা ঘোষণা করি।
হুমায়ুন কথা শেষ করে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে মির্জা হুসেনকে কৃতজ্ঞ এমনকি উল্লসিত হতে দেখবে বলে প্রতিক্ষা করে। নিজের মেয়ের সাথে মোগল ম্রাটের বিয়ের সম্ভাবনা সুলতানের কাছে কল্পনাতীত একটা বিষয়। কিন্তু সে তাকিয়ে দেখে তাঁর নিমন্ত্রাতার মুখের হাসিতে কেমন যেন আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। তার ঠোঁটের কোণা যেন কঠিন হয়ে, চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের শীতলতা ফুটে উঠেছে। খানম অনেক বাজিয়েছে! এবার আমাদের একটু একলা থাকতে দাও। সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে বলে।
খানম চমকে উঠে এবং সাথে সাথে বাজানো বন্ধ করে। উঠে দাঁড়িয়ে সে তার পরণের গাঢ় নীল রঙের লম্বা আলখাল্লায় একটা খসখস শব্দ তুলে দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করে।
আমার ভাই, পরস্পরকে আমরা আগে একটু বুঝতে চেষ্টা করি। মির্জা হুসেন আবেগহীন কণ্ঠে কথা শুরু করে। আমি তোমাকে এখানে আসবার জন্য নিমন্ত্রণ করিনি। তুমি নিজে এসেছে। নৈতিকতার খাতিরে আমি তোমায় স্বাগত জানিয়েছি। শেরশাহ, এখান থেকে মাত্র ছয়শ মাইল দূরে- সম্ভবত আমরা সবাই যা জানি তারচেয়েও নিকটে- লাহোরে অবস্থান করছে, তোমার আর আমার সম্মিলিত বাহিনীর চেয়েও বিশাল একটা বাহিনী তার সাথে রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমি তার বিরুদ্ধাচারণ করতে চাই না। আমি তোমাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে পারি এবং তুমি যদি প্রতিশ্রুতি দাও যে আমার মেয়ের সম্মান আর সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে তাহলে আমি আন্তরিকতার সাথেই তোমার সাথে তার বিয়ের বন্দোবস্ত করতে পারি কিন্তু এর বেশী কিছু প্রত্যাশা করতে যেও না। আমার আশীর্বাদের সাথে খানমকে গ্রহণ করো, তোমার বর্তমান সমস্যা তোমার প্রতি আমার আর কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা থাকবে না এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আমার উপঢৌকন হিসাবে, কিন্তু আমার প্রজাদের আর আমার উপরে তোমার কারণে কোনো বিপর্যয় নেমে আসবার আগেই আমার ভূখণ্ড ত্যাগ কর।
মির্জা হুসেন ইচ্ছা করেই উচ্চকণ্ঠে কথাগুলো বলেন যাতে সকলে শুনতে পায় এবং হুমায়ুন দেখে হিন্দাল চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে সুলতানের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ক্রোধের একটা স্রোত তাঁকে আপুত করে। কাশিমই দেখা যাচ্ছে ঠিক আন্দাজ করেছিল। মির্জা হুসেন, আমিরজাদা তৈমূরের রক্ত আপনার ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে কিন্তু তারপরেও আপনার কণ্ঠে যোদ্ধার চেয়ে বেনিয়ার সুরই প্রকটিত…
মির্জা হুসেনের চোখমুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। হুমায়ুন সন্তুষ্টির সাথে লক্ষ্য করে যে খোঁচাটা একেবারে জায়গামতো বিদ্ধ হয়েছে। কোনো মানুষই এমন কথা শুনতে পছন্দ করবে না। বিশেষ করে নিজের ঘরের নিরাপত্তার মাঝে বসে।
তোমার পরিকল্পনা বিপজ্জনক, মির্জা হুসেন কোনোমতে বলেন। নিজের ভাগ্য বিপর্যয়ের বিষয়টা মেনে নাও। হিন্দুস্তান ত্যাগ কর। তোমার যেখানে জন্ম হয়েছে সেই কাবুলে ফিরে যাও। সেখানে একটা সমৃদ্ধ রাজত্ব রয়েছে। তুমি যেখানে আগম্ভক সেখানে কোনমতেই তুমি সমৃদ্ধি লাভ করতে পারবে না।
