স্বাগতম, সুলতান। আমার রাজ্যে আপনার আগমন আমাকে সম্মানিত করেছে।
আমার ভাই, আপনার আতিথিয়তা আমাদের একান্ত কাম্য। আমি আর আমার ভাই আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সৌজন্যতা প্রকাশের কৃত্যানুষ্ঠান বজায় থাকার মাঝেই হুমায়ুন ভাবে মির্জা হুসেন লোকটা সুদর্শন যদিও খানিকটা নাদুসনুদুস দেখেতে। নিজের দেহে মেদ জমতে দেবার আগে লোক্টা নিশ্চয়ই একজন ভালো যোদ্ধা ছিল। মির্জা হুসেন কিভাবে নিজের রাজ্যের সীমানা বাড়িয়েছেন এবং সেটাকে স্থায়ী করেছেন সেই বিষয়ে সে বাবরের গল্পগুলো মনে করতে চেষ্টা করে, এমনকি দক্ষিণে তার প্রতিবেশী বাহাদুর শাহের কাছ থেকেই তিনি ভূখণ্ড দখল করেছেন। গুজরাতে হুমায়ুন যখন লড়াই করছিল তখন মির্জা হুসেন সাহায্যের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে বার্তা প্রেরণ করলেও কোনো সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেননি। হুমায়ুনও অবশ্য তাঁর এই আত্মীয় সম্পর্কিত ভাইয়ের কাছে সাহায্য চেয়ে কোনো অনুরোধ করেনি। বিজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকার কারণে সে গুজরাতের প্রাচুর্যময় ধনসম্পদ প্রয়োজনের চেয়ে বেশী অন্য কারো সাথে ভাগ করতে আগ্রহী ছিল না।
সুলতান, আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবার সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। আপনার বাসস্থানের কাছেই মেয়েদের থাকবার বন্দোবস্ত করা হয়েছে এবং আপনার সৈন্যদের জন্য সারিবদ্ধভাবে তাবু তৈরী করা হয়েছে। আজ রাতটা আপনি অবশ্যই বিশ্রাম নিবেন। আপনার জন্য আমি খাবার তৈরী করতে বলে দিয়েছি। আজ থেকে তিনদিন পরে, সারকারে আমার প্রাসাদে আপনারা পৌঁছাবার পরে পুরনো দিনের কথা আমরা আলোচনা করবো।
হুমায়ুন নিজের মনে ভাবে, সেই সাথে ভবিষ্যতের কথাও। মির্জা হুসেনের সাহায্য তার দরকার অবশ্য যদি সে সাহায্য করতে রাজি হয়। কিন্তু তার পূর্বে অবশ্যই সৌজন্যতা প্রকাশ করতে হবে…
সেদিন সন্ধ্যাবেলা, নিজের তাবুতে রেশমের কারুকাজ করা গদিতে শুয়ে লাহোর ত্যাগ করার পরে প্রথমবারের মতো হুমায়ুন নিজের ভিতরে প্রশান্তির একটা পরশ অনুভব করে। সে তার পরিবার আর অবশিষ্ট সেনাবাহিনীকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে এসেছে। আল্লাহ্ সহায় থাকলে, সে শীঘ্রই পুনরায় যুদ্ধযাত্রা করবে।
*
ষাট ঘন্টা পরে গনগনে সূর্যের নীচে একপাশে হিন্দাল আর অন্যপাশে মির্জা হুসেনকে নিয়ে হুমায়ুন সরকারের দূর্গপ্রাসাদে প্রবেশ করে, যেটা সাগর দেখা যায় এমন একটা উঁচু শৈলান্তরীপের উপরে চওড়া দেয়ালের অভ্যন্তরে অবস্থিত। মূল তোরণদ্বারের উপরে পরিষ্কার আকাশে দুটো নিশান পতপত করে উড়ছে- সিন্ধের টকটকে লাল আর তারপাশে মোগলদের উজ্জ্বল সবুজ। তোরণদ্বার থেকে একটা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু খাড়া একটা ঢাল অতিক্রম করে তবে, তিনপাশে আঙ্গিনাযুক্ত সোনালী পাথরের তৈরী প্রাসাদে পৌঁছান যায়।
প্রাসাদের পশ্চিম ভাগে মধ্যম তলার প্রায় পুরোটা জুড়ে বিলাসবহুল আবাসন কক্ষে নিজেকে থিতু করে, হুমায়ুন হিন্দাল আর কাশিমকে তার সাথে দেখা করতে বলে। নিজের পরিচারকদের, কেবল জওহর বাদে যাকে সে নিজের জীবন দিয়ে বিশ্বাস করে এবং এই মুহূর্তে যে দরজায় পাহারা দিচ্ছে, উৎসুক কানের উপস্থিতি ব্যতীত সে তাঁদের সাথে কিছু আলোচনা করতে ইচ্ছুক।
হুমায়ুন ইশারায় কাশিম আর হিন্দালকে আসন গ্রহণ করতে বলে। বৃদ্ধ উজির অনেক কষ্টে মেঝেতে উপবিষ্ট হন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর দুর্ভোগ তাদের মাশুল আদায় করে নিয়েছে। কাশিমকে আগের চেয়ে কৃশকায় দেখায় এবং আগের তুলনায় ঝুঁকে পড়েছেন। কথা শুরু করার আগে তাঁর বৃদ্ধ পরামর্শদাতা নিজেকে গুছিয়ে নেয়া পর্যন্ত হুমায়ুন অপেক্ষা করে। সৌজন্যতার খাতিরে আমি এখন পর্যন্ত একটা কথাও বলিনি যদিও মির্জা হুসেন ভালো করেই জানেন আমি কেন এখানে এসেছি- যে শেরশাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমি তাঁর সাহায্য চাই। অবশ্য শীঘ্রই আমি বিষয়টা উত্থাপন করবো এবং সেজন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে চাই। কাশিম, তার আশেপাশে যারা রয়েছে তাদের কাছ থেকে আপনি কি তার অভিপ্রায় বা ভাবনা সম্বন্ধে কিছু কি জানতে পেরেছেন?
তার মনে কি খেলা করছে আমি হয়তো সে সম্বন্ধে কিছু অবগত হতে পেরেছি… কাশিম সৌজন্য দেখিয়ে বলে। আপনি যদি একজন ভালো শ্রোতা হন তাহলে দেখবেন মানুষ নিজের অজান্তে অনেকবেশী কথা প্রকাশ করে থাকে…আমি শুনেছি যে আপনাকে স্বাগত জানাবার অনুরোধ জানিয়ে আপনি তাঁকে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন মির্জা হুসেন যখন সেটা প্রথম পড়ে, প্রচণ্ড ক্ষোভে সে চিঠিটা প্রথমে ছুঁড়ে ফেলেছিল। তার রাজ্যের সমৃদ্ধ ব্যবসায়ী আর আরব থেকে আগত মাল বোঝাই ঢাউয়ে গিজগিজ করতে থাকা বন্দরকে কোনো ধরনের বিরোধের ভিতরে সে জড়াতে চায় না। তার মনে এমন ভয়ও রয়েছে যে আপনি হয়ত তার রাজ্যই কেড়ে নেবেন…
তাহলে সে আমাকে স্বাগত জানিয়ে এখানে কেন নিয়ে এলো? সে কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যেতে পারতো, হিন্দাল প্রশ্ন করে।
হুমায়ুন একটা দুর্বোধ্য আওয়াজ করে। তার কিছু করারও ছিল না। সে আমাদের রক্ত সম্পর্কের ভাই এবং আমার মনে হয় তার কাছে এ বিষয়টার একটা পৃথক আবেদন রয়েছে। তাছাড়া, আমার সাম্প্রতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও আমি নিজের ভূখণ্ড উদ্ধারে আগ্রহী একজন সম্রাট এবং আমি যখন সেটা করবো, তাকে পুরস্কৃত করতে আর তার উচ্চাকাঙ্খাকে আরও বাড়িয়ে তোলার মতো অবস্থানে আমি থাকবো। মির্জা হুসেন এটা ভালো করেই জানে। আর তাছাড়া প্রকাশ্যে বিরোধিতার অভিপ্রায়ব্যতীত সে আমার মুখের উপরে না বলতে পারে না। কিন্তু তাঁর মনে আর হৃদয়ে যাই থাকুক, আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ অবশ্যই আমাকে চিন্তা করতে হবে। গত তিনদিনে শেরশাহের বাহিনীর অগ্রগতির কোনো সংবাদ কি আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে?
