না, সুলতান, কাশিম উত্তর দেয়। পর্যটক আর অন্যান্যদের কাছ থেকে যতটুকু আমরা জানতে পেরেছি, সে এখনও লাহোর ছেড়ে এগিয়ে আসেনি।
আর কামরান এবং আসকারির কি খবর?
সুলতান, বর্তমানে তারা কোথায় রয়েছে সেটা কেউ বলতে পারছে না। কিছু গুজব শোনা যাচ্ছে যে কাবুল নদীর উত্তরে বাদশানে তাঁরা চলে গিয়েছে। কিন্তু সুলতান আমি আগেই বলেছি এগুলো কেবলই গুজব…
হুমায়ুন ভ্রূ কুচকে তাকিয়ে থাকে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কামরান আর তারসাথে শেরশাহ কি আমার ধারণার চেয়েও গভীর কোনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। কামরানের বিশ্বাসঘাতকতা করার প্রস্তাব আর শেরশাহের সেটা প্রত্যাখ্যান করা পুরোটাই যদি মানিকজোড়ের একটা চক্রান্ত হয়ে থাকে, লাহোর থেকে আমাকে বের করে আনার জন্য যাতে তারা তাদের বাহিনী নিয়ে আমার বাহিনীকে আক্রমণ করতে আর ধ্বংস করতে পারে, ব্যাপারটা যদি এমন হয়?
সেটাও সম্ভব, সুলতান, কাশিম মৃদু কণ্ঠে বলে। আমরা সেটা উপেক্ষা করতে পারি না।
কামরানের পরিকল্পনা সম্বন্ধে আসকারি কতটা জানে সে বিষয়টাও আমাকে ভাবিত করে। শেরশাহের পক্ষে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার ষড়যন্ত্র কি তাঁরা দুজনে একসাথে করেছিল নাকি আসকারি কামরানের সাথে পালিয়েছে কারণ সে ভেবেছে যে আমি কখনও বিশ্বাস করবে না সে ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত নয়?
হিন্দাল এতক্ষণে কথা বলে। আমি নিশ্চিত আসকারি আগে থেকেই জানতো। কামরান যেখানেই যায় সে সবসময়ে তাঁকে অনুসরণ করে। আমি কোনো ধরনের বিদ্বেষপ্রসুত হয়ে কথাগুলো বলছি না কিন্তু আমার জানার কারণ আছে- আমিও একটা সময়ে তাই ছিলাম।
আমার মনে হয় তুমি ঠিকই বলছে। কামরানের মতো না, আসকারি দুর্বল এবং বড় ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে সে সবসময়ে আতঙ্কিত থাকে, হুমায়ুন মন্তব্য করে। সে কারণেই তার বিশ্বাসঘাতকতায় আমি কম আঘাত পেয়েছি। আমার ছেলেবেলায় কামরানের সাথে বয়সে সে প্রায় আমার সমান- আমি খেলেছি, শিকার করেছি আর তর্কাতর্কি করেছি। আমরা যদিও প্রায়ই ঝগড়া করতাম। মাঝেমাঝে মারামারি পর্যন্ত গড়িয়েছে ব্যাপারটা স্বল্পসময়ের জন্য হলেও আমাদের মাঝে একটা ঘনিষ্ঠতা ছিল…অনেকটা আপন ভাইয়ের মতো। সে যে আমার মৃত্যু কামনা করতে পারে এই ধারণাটাই আমাকে একই সাথে ক্রুদ্ধ আর শশাকার্ত করে তুলছে…
দরজায় একটা টোকার শব্দ তার কথার মাঝে বিঘ্ন ঘটায় এবং জওহর কে এসেছে দেখার জন্য ভালোমতো তেল দেয়া বিশাল গোলাপকাঠের দরজার পাল্লাটা খুলতে সে কথা থামিয়ে মৌন হয়ে যায়। হুমায়ুন বাইরে থেকে নীচু গলায় কথোপকথনের শব্দ ভেসে আসতে শুনে, তারপরে জওহর আবার হাজির হয়।
সুলতান, মার্জনা করবেন, কিন্তু মির্জা হুসেন তার উজিরকে একটা বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছেন।
তাকে আসতে দাও।
হাল্কা-পাতলা কিন্তু নিখুঁত গড়নের অধিকারী চোখে মুখে বুদ্ধিদীপ্ত আর দ্ব্যর্থহীন চাহনির অধিকারী উজির সাড়ম্বরে অভিবাদন জানায়। আপনাকে বিরক্ত করার জন্য আমাকে মার্জনা করবেন সুলতান, কিন্তু মির্জা হুসেন অনুরোধ করেছেন, আজ রাতের ভোজসভায় আপনি আর আপনার ভাই উপস্থিত থাকলে তিনি সম্মানিতবোধ করবেন।
অবশ্যই, হুমায়ুন উদারভঙ্গিতে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। আমরা যোগ দিতে পারলে খুশীই হব এবং মির্জাকে তাঁর এই আতিথিয়তার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানাবেন।
উজির আরো একবার মাথা নত করে এবং কক্ষ থেকে প্রস্থান করে।
দরজার পাল্লা বন্ধ হওয়া মাত্র, হিন্দালের মুখে হাল্কা হাসির আভাস ফুটে উঠে। একটা ভালো লক্ষণ, আপনার কি তা মনে হয় না? মির্জা হুসেন আমাদের জন্য এর চেয়ে বেশী আর কি করতে…
তুমি হয়তো ঠিকই বলছে কিন্তু সে হয়তো আমাদের ছোটখাট জিনিষ দিয়ে তুষ্ট করতে চাইছে, একই সাথে আমরা আসলেই যেটা চাই সেটা দিতে অস্বীকার করার সুযোগ খোঁজার অবসরে… আমরা অচিরেই সেটা বুঝতে পারবো…।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা চারপাশে ঘোলাটে গোলাপী রঙের একটা ভাব নেমে আসতে মৃদুভাবে ঢাকের বোল শোনা যেতে থাকে। মির্জা হুসেনের প্রেরিত পরিচারকদের সাথে হুমায়ুন আর হিন্দাল প্রাসাদের কেন্দ্রীয় অংশে উপস্থিত হয় এবং জেসমিন ফুলের পাপড়ি দিয়ে সাজান আর সুগন্ধি তেলের দিয়ার সলতে দ্বারা আলোকিত দীর্ঘ আর চেটালো একটা সিঁড়ি অতিক্রম করে উপরে উঠতে থাকে। সিঁড়ির শেষ প্রান্তে হুমায়ুন আর হিন্দাল মার্বেলের কারুকাজ করা একটা চৌকাঠের নীচে দিয়ে অতিক্রম করে একটা অষ্টভূজাকৃতি কক্ষে প্রবেশ করে, কক্ষটা দেয়ালের গিল্টি করা মশালদানিতে রক্ষিত জ্বলন্ত মশাল আর রূপার অতিকায় ঝাড়বাতিদানের আলোয় ঝলমল করছে। সোনার জ্বলজ্বল করতে থাকা জরির কারুকাজ করা গালিচা মেঝেতে পাতা আর দেয়ালে মুক্তা আর কাঁচের পুতির ঝালর দেয়া রেশমের উজ্জ্বল রঙের ব্রোকেডের পর্দা ঝুলছে। তাদের ঠিক বিপরীতে রূপার জরির ঠাস বুনোটের কারুকাজ করা কাপড় দিয়ে মোড়া একটা মঞ্চে স্তূপাকারে তাকিয়া রাখা রয়েছে।
হুমায়ুন আর হিন্দাল প্রবেশ করা মাত্র বাদ্যযন্ত্রীর দল সরব হয়ে উঠে। হাস্যোজ্জ্বল মির্জা হুসেন এগিয়ে আসেন তার ভাইদের স্বাগত জানাতে। হিন্দুস্তানী রীতিতে গলায় মালা দিয়ে তাঁদের বরণ করে নিয়ে মঞ্চের নির্ধারিত সম্মানিত স্থানের দিকে তাদের নিয়ে যায়। তারা আরাম করে বসবার পরে, সে হাততালি দিতে মঞ্চের পাশের একটা প্রবেশ পথ দিয়ে পিলপিল করে বেয়ারার দল প্রবেশ করতে শুরু করে সবার কাঁধে সোনালী গামলায় স্তূপ করা খাবার- কলা পাতা দিয়ে মোড়া সিদ্ধ ভেটকি মাছ কিংবা নারকেলের ঘন ঝোলে ভাসা রান্না করা মাছ, রোস্ট করা হরিণের মাংসের ফালি, মসলা দিয়ে রান্না করা ভেড়ার পাজরের মাংস, সিদ্ধ বেগুনের ঘাট, মটরশুটি দিয়ে রান্না করা পোলাও আর আখরোট এবং কিশমিশ দিয়ে প্রস্তুত নানরুটি।
