কিন্তু হুমায়ুনকে ধাওয়া করার কোনো অভিপ্রায়ই শেরশাহ প্রকাশ করেনি, সে এক নাগাড়ে প্রায় দেড়দিন ঘোড়া দাবড়ে এখন লাহোর থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল দূরে অবস্থান করছে। অতিক্রান্ত প্রতিটা মাইল আর ঘন্টার সাথে সাথে সে আরও বেশী মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে যে পুনরায় সংঘটিত হবার সময় সে পাবে। আরেকটা সুসংবাদ হল যে কামানগুলো সে সাথে করে নিয়ে আসতে পেরেছে- ষাড় দিয়ে টেনে রাভির তীরে নিয়ে এসে নিরাপদে সেগুলো ভেলায় তুলে দিয়ে হুমায়ুনের গোলন্দাজ বাহিনীর সেনাপতি আর তার সৈন্যদের অধীনে ভাটির উদ্দেশ্যে সেগুলো ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। লাহোর থেকে আড়াইশ মাইল দক্ষিণপশ্চিমে মূলতানে, অবশিষ্ট বাহিনীর সাথে যোগ দেবার জন্য তাঁদের আদেশ দেয়া হয়েছে। সিন্ধের উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রার সময় সৈন্যদের রসদ আর তাদের বেতন দেবার জন্য মোহর আর রত্নপাথরে বেশ ভালো রকমের সম্পদের সাথে সাথে গাদাবন্দুক, বারুদ আর সীসার গুলিও পর্যাপ্ত পরিমাণে তার সাথে রয়েছে। পরিস্থিতি সম্ভবত যতটা খারাপ বলে প্রতিয়মান হচ্ছে ততটা খারাপ না।
কিন্তু মেঘাচ্ছন্ন ধুসর আকাশের দিকে তাকাতে হুমায়ুন কিছু মৃত অথবা মৃতপ্রায় জন্তুর উপরে নিঃশঙ্কচিত্তে বৃত্তাকারে দুটো শকুনকে উড়তে দেখে। পানিপথে মোগলদের মহান বিজয়ের ঠিক পূর্বমুহূর্তে সে ঈগলদের রণক্ষেত্রের উপরে চক্রাকারে উড়তে দেখেছিল। সম্ভ্রান্ত ঈগল থেকে নোংরা, অশুভ-বিবেচিত, গলিত শবদেহ গোগ্রাসে ভক্ষণকারী…তার সৌভাগ্য কিভাবে হ্রাস পেয়েছে এটা কি তারই একটা প্রতীক? হুমায়ুন তার পিঠে আড়াআড়ি ঝোলান চামড়ার গিল্টি করা তৃণ থেকে একটা তীর তুলে নিয়ে পর্যান থেকে তাঁর দুই বাঁকঅলা ধনুক খুলে নেয় এবং গরম বাতাসে মৃত্যু লেখা তীর ছুঁড়ে দেয়। নিক্ষিপ্ত তীর তার লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পায়। সে দ্রুত আরেকটা তীর তুলে এনে ব্যগ্র দৃষ্টিতে আকাশে তাঁর দ্বিতীয় লক্ষ্যটা খুঁজতে গিয়ে দেখে তাঁর মাথার উপরের আকাশ শূন্য খাঁ খাঁ করছে।
*
সুলতান, আমার গুপ্তদূতেরা এখান থেকে তিন কি চার মাইল দূরে একটা ক্ষুদ্র অশ্বারোহী বাহিনীকে দ্রুত আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখেছে, আহমেদ খান তার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরতে ধরতে কথাগুলো জানায়।
আল্লাহ মেহেরবান, আমি যে বার্তাবাহককে মির্জা হুসেনের কাছে পাঠিয়েছিলাম এটা সে না হয়ে যায় না, একদল নিরাপত্তা রক্ষী নিয়ে এখন ফিরে আসছে। কিন্তু তারপরেও সাবধানের মার নেই, সেনাসারির অগ্রগতি মূলতবি রাখ এবং আমার লোকদের বলে দাও নিজেদের অবস্থানের চারপাশে একটা রক্ষণাত্মক ব্যুহ নির্মাণ করতে। কোষাগার আর জেনানাদের প্রহরায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন যেন করা হয়।
জ্বি, সুলতান।
ভাগ্য ভালো হলে, মূলতান থেকে দীর্ঘ ছয় সপ্তাহের দুর্গম যাত্রা, যেখানে সে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তার গোলন্দাজবাহিনী আর কামানের সাথে মিলিত হয়েছে এবং তারপরে সিন্ধু নদের তীর বরাবর এগিয়ে এসেছে শীঘই শেষ হতে চলেছে এবং শেরশাহের বিরুদ্ধে কিভাবে প্রত্যুপক্রম সূচনা করা যায় এবার সেটা সে পরিকল্পনা করতে পারবে। হুমায়ুন চোখ কুচকে পশ্চিমের দিগন্তের দিকে তাকায়, সেখানে অতিকায়, রক্তলাল সূর্যটা দ্রুত দিগন্তের ওপাশে বিলীন হচ্ছে। সে অচিরেই সামনের এলোমেলো পাথর আর খর্বকায় বৃক্ষরাজির মাঝে ধূলার একটা মেঘ সনাক্ত করতে পারে এবং তারপরে অশ্বারোহীদের সে দেখতে পায় তারা সংখ্যায় প্রায় ত্রিশজন হবে- একজন অশ্বারোহী যোদ্ধা তাঁদের নেতৃত্ব দিচ্ছে, দিনের শেষ সূর্যের আলোয় তার মাথার ইস্পাতের শিরোস্ত্রাণ ঝিকিয়ে উঠছে। অশ্বারোহী যোদ্ধার দলটা তাদের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরতে, দলটার ভিতরে প্রায় দুই সপ্তাহ পূর্বে মির্জা হুসেনের কাছে চিঠি নিয়ে যে পত্রবাহকে হুমায়ুন পাঠিয়েছিল আসলেই তাকে দেখতে পায়। নেতৃত্বদানকারী অশ্বারোহী তাঁর মাথার শিরোস্ত্রাণ খুলে, ঘোড়া থেকে নেমে এসে তাঁকে অভিবাদন জানায়।
মহামান্য সুলতান, আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন। সিন্ধের সুলতান, মির্জা হুসেন তার ভূখণ্ডে আপনাকে স্বাগত জানিয়েছে। তিনি আপনার জন্য এখান থেকে দশ মাইল দূরে একটা অস্থায়ী সেনাছাউনিতে অপেক্ষা করছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে স্বাগত জানাবার সম্মান থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেছেন কারণ তিনি চেয়েছেন আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবার সব প্রস্তুতি তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করবেন। আমি তার দেহরক্ষীদলের সেনাপতি এবং আমার লোকেরা আপনার প্রতিরক্ষা সহচর হিসাবে এখান থেকে আপনাকে নিয়ে যাবে।
হুমায়ুন গাছের গাঢ় ছায়ার মাঝে অস্থায়ী ছাউনির মশালের কমলা রঙের আলো যখন দেখে ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মির্জা হুসেনকে সে বহু বছর আগে একবার দেখেছিল যখন তিনি কাবুল এসেছিলেন বাবরকে সম্মান প্রদর্শন করতে এবং তিনি দেখতে কেমন সে বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা নেই। অস্থায়ী ছাউনির ঠিক মধ্যখানে, দীর্ঘকায়, পিঠ টানটান করে দুহাত দুপাশে ছড়িয়ে দিয়ে এবং চমৎকার লাল আলখাল্লার সাথে মাথায় শক্ত করে বাঁধা সোনালী পাগড়ি পরিহিত লোকটা তার এক অর্থে তার কাছে একজন আগন্তুক।
