কথাটা সত্যি কিন্তু এরসাথে আরো একটা কারণও রয়েছে যেজন্য হুমায়ুন চেয়েছে যে তার নানাজান উত্তর দিকে এগিয়ে যাক, যদিও বাইসানগারের কাছে সেটা সে স্বীকার করবে না। যোদ্ধার সত্ত্বা এখনও যদিও তাঁর মাঝে বিদ্যমান এবং তার মস্তিষ্ক এখনও পরিষ্কার, তারপরেও লোকটার বয়স হয়েছে- আশি বছর এমনকি কাশিমের চেয়েও তার বয়স বেশী আর দ্রুত তার শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। হুমায়ুনের সঙ্গী হিসাবে, সে যে দীর্ঘ আর বিপজ্জনক যাত্রায় রওয়ানা হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে: রাভি আর সিন্ধু নদের ভাটিতে ছয়শ মাইল দক্ষিণপশ্চিমে সিন্ধ অভিমুখে, তিনি তাঁর স্বল্প শারীরিক শক্তির নিঃশেষ না করে কাবুলে অনেকবেশী কার্যকর আর নিরাপদে থাকবেন। সিন্ধের সুলতান, মির্জা হুসেন, হুমায়ুনের রক্তসম্পকের আত্মীয়- তাঁর আম্মিজান ছিলেন বাবরের আত্মীয়সম্পর্কিত বোন হুমায়ুনকে আশ্রয় দেয়ার জন্য সে তাই নৈতিকভাবে দায়ী। কিন্তু তার সৎ-ভাইদের চেয়ে, যাদের সাথে তার রক্তের সম্পর্ক অনেকবেশী গাঢ়, মির্জা হুসেনের কাছে এই নৈতিকতা ঠিক কতখানি মূল্য বহন করে?
বাইসানগার, একটা পর্যায়ে, হুমায়ুনের যুক্তির কাছে পরাস্ত হয়ে, তাঁর কথায় রাজি হন। অবশ্য খানজাদা আর গুলবদনকে এতো সহজে রাজি করান সম্ভব হয় না এবং এই যাত্রায় হুমায়ুনকে তাঁদের কাছে পরাভব মানতে হয়। তাঁর ফুপিজান আর সৎ-বোন সরাসরি বাইসানগারের সাথে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। আমার নিজের নিয়তি নির্ধারণের অধিকার আমি অর্জন করেছি, মৃদু কিন্তু দৃঢ়ভাবে খানজাদা বলেন। সাইবানি খানের হারেমে আমি যতবছর নিগৃহিত হয়েছি, ততবছর আমি। নিজেকে কেবল একটা কথাই বলেছি, আমি যদি এই দুরাবস্থা সামলে নিতে পারি তাহলে আমি আর কখনও নিজের ভাগ্য, নিজের জীবনের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাব না যদি কেবল মৃত্যুই একমাত্র বিকল্প হয়। প্রিয় ভাস্তে, আমি তোমার সাথে যাবার নিয়তিই বেছে নিয়েছি। এই কথোপকথনের পুরোটা সময় গুলবদন চুপ করে থাকে কিন্তু হুমায়ুন ঠিকই খেয়াল করে পুরোটা সময় সে কি দৃঢ়ভাবে খানজাদার হাত আকড়ে রয়েছে এবং তাঁর অভিব্যক্তিতে কেমন দৃঢ় একটা সংকল্প ফুটে রয়েছে। খানজাদা যখন নিজের বক্তব্য শেষ করেন গুলবদনও হিন্দাল আর হুমায়ুনের সঙ্গী হবার জন্য নিজের অভিপ্রায়ের কথা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়।
হুমায়ুন মনে মনে কৃতজ্ঞবোধ করে তাঁরা তাঁর সাথে রয়েছে বলে। তাঁরা শক্তসমর্থ টাটুঘোড়ায় সওয়াড় হয়ে তার পাশে পাশে অবস্থান করে, তাদের নিজস্ব পরিচারিকারদল এবং তার আর হিন্দালের সেনাপতিদের কয়েকজনের জায়া আর কন্যারাও তাদের অনুসরণ করে, যাদের ভিতরে জাহিদ বেগের স্ত্রীও রয়েছে, তিনিও টাটুঘোড়ায় সওয়ার। গতি খুব গুরুত্বপূর্ণ, এবং যাতায়াতের জাঁকজমকপূর্ণ মাধ্যমের, সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে পালকি কিংবা হাওদার পর্দার পেছনে অবস্থানের, সময় এটা না। এসব সত্ত্বেও, মহিলাদের এই ক্ষুদ্র দলটাকে হুমায়ুনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দেহরক্ষীর দল পাহারা দেয় এবং ভারী পোষাকের আড়ালে, চুল বেধে মাথায় আঁটসাঁট টুপি পরিহিত অবস্থায় উৎসুক দৃষ্টির কবল থেকে তাঁদের ভালোমতোই লুকিয়ে রাখা হয়। বাতাস আর ধূলো কবল থেকে রক্ষা করার জন্য মুখের অবগুণ্ঠনের উপরে কেবল তাদের চোখজোড়াই দৃশ্যমান থাকে।
আরও একজোড়া চোখ তাঁদের সাথে থাকবার কথা ছিল- ধুসর একজোড়া চোখ- হুমায়ুন ভাবে তাঁর আত্মাকে তুষ্ট করতে। লাহোর প্রাসাদ শেষবারের মতো ছেড়ে যাবার পূর্বে হুমায়ুন নতুন খোঁড়া কবরটা দ্রুত জিয়ারত করতে যায় যেখানে দুদিন আগে সালিমাকে দাফন করা হয়েছে। মেয়েটা নিশ্চিতভাবেই তার সাথেই আসতো- এ বিষয়ে তার মনে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শহর ত্যাগ করতে শেরশাহের বেধে দেয়া চূড়ান্ত সময়ের খবরের সাথে সাথে চারপাশের দ্রুত বাড়তে থাকা গোলমালের ভিতরে মেয়েটা হঠাৎ একটা জ্বরের কবলে পড়ে যা সংক্রমনের মাত্র চব্বিশ ঘন্টার ভিতরে তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেয়। হুমায়ুন যখন নিজের বিশাল হাতের থাবায় তাঁর ছোট্ট হাতের মুঠি আকড়ে ধরে তার ক্ষুদ্র দেহ থেকে প্রাণের শেষ স্পন্দনটুকু মিলিয়ে যেতে দেখে তখন কালঘামে জবজবে অবস্থায় সে চিত্তবৈকল্যের শেষ সময়গুলোতে সে কেবল তাকিয়ে ছিল, ঘোলাটে চোখের দৃষ্টিতে কোনো স্মৃতি ছিল না বা সে তাঁর চোখের অশ্রুও চিনতে পারেনি। মেয়েটার কথা তার বড্ড মনে পড়বে। গুলরুখের আফিম মিশ্রিত সুরা পানের অভ্যাস সে ত্যাগ করার পড়ে এবং শেরশাহের হাতে তাঁর পরাজয়ের পর থেকে আরও বেশী করে সালিমা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, মানসিক দ্বন্দ্ব, প্রাত্যহিক কর্তব্য আর দায়িত্ব থেকে তার শারীরিক প্রশান্তির একটা গুরুত্বপূর্ণ নিমিত্ত হয়ে উঠেছিল।
মানুষের অস্তিত্বের নশ্বরতা নিয়ে ভাবনার কিংবা শোক প্রকাশের সময় এখন তার নেই। ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে যাবার সময় একটা প্রশ্নই বারবার হুমায়ুনকে জর্জরিত করেছে। লাহোর ত্যাগ করে কি সে ঠিক কাজটাই করেছে? উত্তরটা অবশ্য বারবার একই পেয়েছে। আসন্ন রক্তগঙ্গার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নির্বিচারে এতো হাজার হাজার নিরীহ নাগরিকদের হত্যা- শহরের উত্তরে রাভি মদীর উপরে স্থাপিত কাঠের সেতুর উপর দিয়ে তার বাহিনীকে পশ্চাদপসারণের আদেশ দেয়া তাঁর সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তাঁর শেষ লোকটা নিরাপদে সেতু অতিক্রমের সাথে সাথে তাকে অনুসরনরত শেরশাহের বাহিনীর গতি খানিকটা হলেও বিঘ্ন করার লক্ষ্যে সে সেতুটা ধ্বংস করে দেয়। সেনাবাহিনীকে অনুসরনকারীরা যে যেভাবে পেরেছে, মাছ ধরার কিংবা নদী পারাপারের নৌকার সাহায্যে, নদী অতিক্রম করেছে।
