লাহোর ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত ঠিক যেমন সে আগ্রা ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল চূড়ান্ত অপমানজনক। কিন্তু শেরশাহের অধীনে বিশাল একটা বাহিনী রয়েছে যা- হুমায়ুনের কাছে যেসব খবর এসেছে তা যদি সত্যি হয় এবং সেগুলোকে সন্দেহ করার কোন কারণ নেই- তাঁর নিজের বাহিনীর চেয়ে প্রায় বিশগুন বড় সম্ভবত এরচেয়েও বেশী। দূর্গকরণের আর পরিখা খননের আদেশ দেয়া সত্ত্বেও, শহরে কোনো প্রতিরক্ষা দেয়াল থাকায় এতো বিশাল একটা বাহিনীর বিরুদ্ধে লাহোরকে রক্ষা করার কোনো প্রচেষ্টা অনিবার্য ধ্বংস ডেকে আনবে, এমনকি যদি সে কাবুল থেকে যে বাহিনী আসতে বলেছে তারা সময়মতো এসে পৌঁছালেও।
হুমায়ুন বিষয়টা কয়েক ঘন্টা বিবেচনা করেই, তাঁর সেনাপতিদের লাহোর পরিত্যাগের জন্য প্রস্তুতি নিতে আদেশ দেয়। শহর পরিত্যাগের খবরটা জানাজানি হতেই, শহরের বাসিন্দারা বিশ্বাস করতে চায় না যে হুমায়ুন চলে যাবার পরে শেরশাহ তাঁদের রেহাই দেবার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেটা রক্ষা করবেন। পুরো শহরে দ্রুত একটা অনিয়ন্ত্রিত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নগরদূর্গের একটা পাথরের গম্বুজ থেকে, হুমায়ুন শহরের বাড়িঘর থেকে, বুকের কাছে কাপড়ের পুটলির ভেতরে নিজেদের মূল্যবান সামগ্রী বেধে নিয়ে, উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকা ছোট ছোট বাচ্চাদের হাত ধরে, মানুষজনকে পিলপিল করে বের হয়ে আসতে দেখে। কয়েকজনকে বৃদ্ধ বাবা-মাকে পিঠে বহন করতে দেখা যায়। শহরের সংকীর্ণ সড়কে অচিরেই হাতে টানা ঠেলাগাড়ি আর টলতে থাকা ভারবাহী পশুত্র শকটের একটা ভীড় জমে উঠে। শহরের সাধারণ মানুষ ভয় পেয়ে নিজেদের বিচারবুদ্ধি জলাঞ্জলি দিয়ে উন্মত্ত আর অপদার্থ জনস্রোতে পরিণত হয়েছে, পালিয়ে গিয়ে নিজেদের রক্ষা করার জন্য যারা বেপরোয়া। দোকানে লুটপাট শুরু হয় এবং দুর্বলদের ধাক্কা দিয়ে সামনে থেকে সরিয়ে দেয়া হয় এবং অনেকেই হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে মানুষের পায়ের নীচে পিষে যায়। ব্যাপারটা অনেকটা প্রলয়কাণ্ডে পৃথিবীর ধ্বংস হওয়া প্রত্যক্ষ করার মতো মনে হয়।
রাজপ্রাসাদের কাছে বিশাল কুচকাওয়াজের ময়দান থেকে যেখানে, বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এসে শহরের লোকদের কানে অনুরণিত হতে থাকলে আতঙ্ক আর বিশৃঙ্খলা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে, হুমায়ুনের আদেশে তাঁর বাহিনীর সবচেয়ে বড় ব্রোঞ্জের কামানগুলো, যেগুলো সাথে করে নিয়ে যাওয়া পরিশ্রমসাধ্য আর যা অগ্রসর হবার গতি মন্থর করে দেবে, ধ্বংস করা হচ্ছে। কামানগুলো ষাড়ের দল প্রাণপন শক্তিতে কোনোমতে টেনে খোলা ময়দানে নিয়ে আসে যেখানে হুমায়ুনের গোলন্দাজ বাহিনীর লোকেরা, তাদের দেহের নগ্ন উপরিভাগ থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরছে, দ্রুত কামানের নল বারুদ দিয়ে পূর্ণ। করছে এবং তুলার লম্বা পলিতা যুক্ত করার পরে- সেটায় অগ্নি সংযোগ করতে, বিকট বিস্ফোরনে উত্তপ্ত, দোমড়ানো, ধাতব খণ্ড বাতাসে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে।
নিজের ভাবনাকে বর্তমানে ফিরিয়ে এনে, হুমায়ুন আড়চোখে তার বামপাশে একটা বিশাল সাদা স্ট্যালিয়নে উপবিষ্ট হিন্দালের শক্তিশালী অবয়বের দিকে তাকায়, সে নিজের ক্ষুদ্র বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছে। শেরশাহের বার্তার বিষয়বস্তু শোনার সাথে সাথে হিন্দাল হুমায়ুনকে খুঁজে বের করে এবং তাদের পিতার নামে শপথ করে বলে যে কামরান আর আসকারির আনুগত্য পরিহারের বিষয়ে সে বিন্দুবিসর্গও জানতো না। হিন্দাল ছোট থেকে নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখতে পারে
এবং নিজের এই খুদে সৎ-ভাইটির মুখাবয়বে ফুটে উঠা সংক্ষোভ আর কামরান এবং আসকারির এহেন অপকর্মের প্রতি অবিশ্বাস দেখতে পেয়ে হুমায়ুন তাঁর কথা বিশ্বাস করে। পরে, ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা করে সে বুঝেছে তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি ভুল করেনি। অন্যথায়, হিন্দাল কেন লাহোরে থেকে গিয়ে শাস্তির ঝুঁকি নেবে? আর তাছাড়া, কামরান আর আসকারি আপন ভাই। হিন্দাল- হুমায়ুনের মতো তাঁদের কেবল সৎ-ভাই, আর সেজন্য রক্ত ও সম্মানের বন্ধনটাও অনেক দুর্বল। হুমায়ুন তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে যেন হিন্দাল মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায় আর আলতো করে হাসে। হুমায়ুন ভাবে, হিন্দাল তার সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়ায় ভালোই হয়েছে। সম্ভবত তাঁদের রাজবংশের বর্তমান বিপদের সময়ে বাবরের সন্তানদের অন্তত দুজন নিজেদের ভিতরে স্থায়ী একটা বন্ধন সৃষ্টি করতে পেরেছে এবং সেটা থেকে শক্তি লাভ করেছে।
হুমায়ুন তার দ্রুত এগিয়ে আসা শত্রুর সামনে লাহোর পরিত্যাগের আগে সেখানে তাঁদের অবস্থানের একেবারে শেষ মুহূর্তে, সে বাইসানগারকে আলিঙ্গন করে এবং তাকে বিদায় জানায়, সম্ভবত এই শেষবার। তার নানাজানের কাছ থেকে পৃথক হওয়াটা একটা কঠিন কাজ আর তারচেয়েও কঠিন বুড়ো মানুষটাকে রাজি করান যে তাঁর উচিত একদল সৈন্য নিয়ে উত্তর দিকে গিয়ে হুমায়ুনের জন্য কাবুলকে আগলে রাখা। হুমায়ুন তাকে বারবার যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করে যে কামরান আর আসকারি তার ভাগ্য বিপর্যয়ের সুযোগ গ্রহণ করে সেখানের রাজত্ব দখল করার চেষ্টা করতে পারে, সেজন্য সেখানে তার মনোনীত শাসকের উপরে সে আর আস্থা রাখতে পারছে না যে বাড়তি সৈন্য পাঠাতে আগেই অনেক কালক্ষেপন করেছে এবং বাইসানগার মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন লোকের অন্যতম তার জন্য কাবুল আগলে রাখবে বলে তাঁর অবিচল আস্থা রয়েছে।
