হুমায়ুন শেরশাহের চিঠিটা প্রথমে পড়ে। আমি হিন্দুস্তান জয় করেছি। যা ইতিমধ্যে আমার নিজের তাঁর জন্য আমি কেন আপনার সাথে লড়াই করবো? আমি কাবুল আপনাকে ছেড়ে দিলাম। সেখানে চলে যান। কিন্তু চিঠিতে আরো কিছু লেখা আছে: একটা সাম্রাজ্য রক্ষার প্রত্যাশা আপনি কিভাবে করেন যখন আপনি আপনার নিজের পরিবারের আনুগত্য অর্জন করতে ব্যর্থ? আপনার সৎ-ভাই কামরান আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে ইচ্ছুক। কিন্তু আপনাদের মতো মোগলদের কাছ থেকে আমি কিছু চাই না কেবল তাঁদের ছিন্ন মস্তক যেখানে তাঁদের থাকার কথা সেই ধূলোতে গড়াগড়ি খাচ্ছে দেখা ছাড়া। আমি আপনার ভাইয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে তাঁকে লিখে পাঠিয়েছি। ঠিক যেমন আমি আপনার প্রস্তাবও প্রত্যাখান করছি- এবং তাঁকে এটাও অভিহিত করেছি তাঁর প্রতারণার কথা আমি আপনাকে জানাব।
হুমায়ুন বাঁশের চোঙ্গাট নিয়ে ভেতর থেকে হলুদ পার্চমেন্টের টুকরো বের করে আনে। সেটাকে টেবিলের উপরে বিছানোর সাথে সাথে কামরানের সুচালো হাতের লেখা হুমায়ুন চিনতে পারে। এটা শেরশাহের কাছে তার লেখা চিঠি। আমার ভাই আমার জন্মগত অধিকার থেকে আমায় বঞ্চিত করেছে, ক্রোধে কাঁপতে থাকা কণ্ঠে সে উচ্চস্বরে চিঠিটা পড়ে। শেরশাহ, আপনি যদি পাঞ্জাব আর কাবুলসহ উত্তরের মোগল ভূখণ্ড শাসনের জন্য আমাকে ছেড়ে দেন, আমি হুমায়ুনকে আপনার হাতে তুলে দেব বা যদি আপনি চান- আমি শপথ করে বলছি, আমি নিজের হাতে তাকে হত্যা করবো।
কাশিম মাটি থেকে কামরানের চিঠিটা তুলে নেয় যেখানে হুমায়ুন সেটা ছুঁড়ে ফেলেছে এবং পুনরায় সেটা পড়ে, কামরানের উদ্ধত, রক্তলোলুপ শব্দগুলো পাঠ করার সময় সংক্ষোভে তার চোখ মুখ কুচকে যায়। হুমায়ুন নিজে দরজার কাছে হেঁটে যায় এবং এক ধাক্কায় পাল্লা খুলে চিৎকার করে, প্রহরী, আমার ভাই কামরানকে এখনই আমার কাছে নিয়ে এসো। সে যদি বাধা দেয়, শক্তির দ্বারা পরাভূত করবে এবং বেঁধে নিয়ে আসবে। সে সন্দেহ করেছিল তার ভাইয়েরা তার বিরুদ্ধে হয়ত চক্রান্ত করতে পারে কিন্তু তাঁদের একজন এতটাই বিবেচনাহীন হতে পারে যে রাজবংশের কাছে সে ঋণী তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে গিয়ে সেটাকেই একজন বহিরাগতের কাছে বলি দিতে চাইছে। হুমায়ুন উদ্বিগ্ন আর নিরব কাশিমের সামনে নিজের কক্ষে পায়চারি করতে থাকে, যতক্ষণ না প্রহরীদের একজন ফিরে আসে।
সুলতান, তাকে আমরা কোথাও খুঁজে পাইনি। আমরা প্রথমে তার আবাসন কক্ষে যাই কিন্তু তিনি সেখানে ছিলেন না। তারপরে আমরা পুরো দূর্গটা খুঁজে দেখি আমরা এমনকি জেনানা মহলে লোক পাঠিয়েছিলাম খুঁজে দেখতে, তাঁর আম্মিজান মহামান্য রাজমাতা গুলরুখের সাথে হয়তো তিনি আছেন, কিন্তু তার আম্মিজানও সেখানে ছিলেন না…
হুমায়ুন আর কাশিম পরস্পরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে। প্রধান তোরণদ্বারের পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত আধিকারিককে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও- দ্রুত, পা চালাও!
কয়েক মিনিটের ভিতরে হুমায়ুনের সামনে সন্ত্রস্ত দর্শন এক আধিকারিককে নিয়ে আসা হয়।
আজ সারাদিনে আমার কোনো ভাইকে তুমি দেখেছো?
জ্বী, সুলতান। আজ সকালে শাহজাদা কামরান আর শাহজাদা আসকারি ঘোড়ায় চড়ে বের হয়েছেন। তারা এখনও ফিরে আসেননি…
আর তাঁদের আম্মিজান গুলরুখ আর তাঁর পরিচারিক?
একটা পালকিতে করে তারাও প্রাসাদ ত্যাগ করেছে। বেগম সাহিবা বলেছেন তাঁর বোন, লাহোরের প্রধান কোষাধ্যক্ষের স্ত্রীর সাথে তিনি, শহরের উত্তরে তার হাভেলীতে দেখা করতে চান।
হুমায়ুন ক্রুদ্ধ কণ্ঠে গালিগালাজ করে উঠে। কোনো সন্দেহ নেই মহিলা এতোক্ষণে তার ছেলেরা এবং তাদের বাহিনীর সাথে মিলিত হয়েছে এবং এই মুহূর্তে তারা সবাই ঝড়ের বেগে এগিয়ে চলেছে তার নাগালের বাইরে যেতে। সে আরেকটু হলেই তাদের পিছু ধাওয়া করার আদেশ দিত কিন্তু মুশকিল হল শেরশাহও চায় সে ঠিক সেটাই করুক। তাঁর শত্রু দারুণ এক চাল দিয়েছে, একদিকে সে হুমায়ুনের হাতে তার ভাইয়ের শঠতার প্রমাণ তুলে দিয়েছে আর অন্যদিকে কামরানকেও পালাবার কারণ আর সময় দিয়েছে। কিন্তু সে শেরশাহের হুমকি অবহেলা করে তাঁর জন্য এত চতুরতার সাথে পাতা ফাঁদে পা দেবে না এবং এখনই কামরান আর আসকারির পিছু নিয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইদের যুদ্ধের সূত্রপাত করবে না।
প্রতিশোধের সময় পরেও পাওয়া যাবে।
২.৫ পলায়নের সূত্রপাত
১০. পলায়নের সূত্রপাত
হুমায়ুন তাঁর ঘোড়ার পর্যানে উপবিষ্ট অবস্থায় কোমড় মোচড়ায়। সে ছত্রিশ ঘন্টা আগে শেরশাহের হাতে লাহোর তুলে দিয়ে এসেছে। তার পেছনে তার বাহিনীর অবশিষ্ট লোকেরা, মাত্র হাজার পনের হবে তারা সংখ্যায়, ভাসতে ভাসতে চলেছে বেশীর ভাগই পালিয়েছে। তাঁদের পেছনে গরম ধূলোর ভিতরে প্রায় দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে বেপরোয়া মানুষের কয়েক মাইল দীর্ঘ একটা স্রোত বিশৃঙ্খল অবস্থায়, গাধা, খচ্চর আর মালবাহী শকটে তাঁদের সমুদয় সহায়সম্পদ হাল-বাণ্ডুল করে বোঝাই করে এগিয়ে আসছে।
ভ্রমণ-ক্লান্ত বণিকদের একটা দল মাত্র চারদিন আগে ঘোড়ার মুখে ফেনা তুলে ছুটতে ছুটতে লাহোরে প্রবেশ করে তাঁরা এতোটাই আতঙ্কিত যে নিজেদের মালবোঝাই খচ্চরের বহর পথের ধারেই পরিত্যাগ করে এসেছে- সবার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতে থাকে যে শেরশাহ শহরের অধিবাসীদের হত্যা করার হুমকি দিয়েছেন। কয়েক ঘন্টা পরে, শেরশাহের কাছ থেকে এক বার্তাবাহক এসে উপস্থিত হয়। তাঁর বহন করে আনা চিঠিটার ভাষা এবং বক্তব্য একেবারে সরল আর স্পষ্ট। শেরশাহ সত্যি সত্যি শহরটা ধ্বংস করে এখানকার অধিবাসীদের হত্যার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু সেটা কেবল হুমায়ুন যদি শহর ত্যাগ করতে অস্বীকার করে।
