তুমি নিশ্চিত শেরশাহ পুনরায় সামনের দিকে এগিয়ে আসছে?
জ্বি,সুলতান। আমার গুপ্তদূতের বক্তব্য আপনি নিজের কানেই শোনেন।
গুপ্তদূত কয়েক পা সামনের দিকে এগিয়ে আসে। আমি এর উপরে আমার জীবন বাজি রাখতে পারি। আমি নিজের চোখে যা দেখেছি আর নিজের কানে যা শুনেছি সে বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করেছি এবং কেবল তারপরেই আমি লাহোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি, পথে ঘোড়া পরিবর্তন করার জন্য আমি কেবল দেরী হয়েছে।
কতজন সৈন্যের বাহিনী?
সেটা গণনা করাটা একটু কঠিন কিন্তু চলার পথে তারা যে পরিমাণ ধূলো উড়াচ্ছে, বেশ কয়েক হাজার অশ্বারোহী হবে, সুলতান।
আর শেরশাহর নিজের কি খবর?
আমি যা শুনেছি সে অনুযায়ী তিনি এখনও আগ্রায় অবস্থান করছেন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি নিজেও যাত্রা করবেন, আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত। আমি রওয়ানা হবার ঠিক আগ মুহূর্তে, আগ্রা দূর্গের নীচে নদীর তীরে মালবাহী একটা বিরাট বহরকে সেখানে অবস্থান করতে দেখেছি- ভারবাহী খচ্চর, ষাড় আর উটের কোনো সীমা সংখ্যা নেই আর সেই সাথে রয়েছে কয়েকশ হাতি। মালবাহী শকটে বেগুনী রঙের আচ্ছাদনযুক্ত শেরশাহের নিজস্ব তাবু ভাঁজ করা অবস্থায় তুলতে দেখেছি। গুপ্তদূত নিজের দায়িত্ব সাফল্যের সাথে পালন করায় এখন তাঁর নোংরা, টানটান মুখটা দৃশ্যত স্বাভাবিক হয়ে উঠে।
সে বিদায় নেয়া মাত্র, হুমায়ুন তাঁর নীচু টেবিলের সামনে আসনপিড়ি হয়ে বসে। তার ভাইদের সাথে আরো আলোচনা করে কোনো লাভ হবে না। গত কয়েক দিন ধরে, আসকারি আর হিন্দাল তাদের বড় ভাইদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শুনতেই বেশী পছন্দ করেছে, নিজেরা গঠনমূলক কোনো পরামর্শ না দিয়ে। শেরশাহের সাথে যুদ্ধযাত্রার পক্ষে কামরান এখনও তর্ক চালিয়ে যাচ্ছে এবং হুমায়ুন দৃঢ়তার সাথে সেটা নাকচ করে বলছে যে আরো অনেক বেশী যোদ্ধা সমবেত করা ছাড়া এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং সেই সাথে কামরানকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে সে নিজে ইতিমধ্যে দুবার শেরশাহের সাথে দুটো বিশাল যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে পরাজিত হয়েছে। তার শত্রু শেষবারের যুদ্ধের পর আরও অনেকবেশী শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যখন সে নিজে আরও দুর্বল হয়েছে। আরেকটা সম্মুখ সমরের সুযোগ সন্ধান করার সময় এটা না।
গত কয়েকদিন ধরে এসব আলোচনার সময়ে, তার আব্বাজানের রোজনামচায় একবার পড়েছিল এমন একটা বিষয় হুমায়ুনের বারবার মনে হতে থাকে। অস্ত্রের বলে যদি তুমি তোমার শত্রুকে পরাজিত করতে না পার, হতাশ হয়ো না। অন্য কোনো উপায় খুঁজে বের কর। তেল দেয়া, ধারালো, দো-ধারি রণকুঠার নিঃসন্দেহে একটা দারুন অস্ত্র কিন্তু সেই সাথে বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিষ্ক নিজেও একটা অস্ত্র যা বিজয়ের সুবেদী পথ খুঁজে বের করতে পারে…
কিছুক্ষণ চিন্তা করার পরে, হুমায়ুন লিখতে শুরু করে। শেরশাহ, তুমি হিন্দুস্তান আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চাইছো যদিও তৈমূরের অধস্তন পুরুষের রক্ত নিজের ধমনীতে ধারণ করার কারণে এটা আমার সাম্রাজ্য। আমার সাথে একলা দ্বৈরথে অবতীর্ণ হও এবং এসো আমরা এই বিরোধ চিরতরে মীমাংসা করি। কিন্তু তুমি যদি আমার সাথে দ্বৈরথে রাজি না হও, তাহলে এসো আমরা অন্তত আরো রক্তপাত পরিহার করতে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়ে নিজেদের ভিতরের মতপার্থক্য সমাধানের জন্য ভিন্ন কোনো পথের সন্ধান করি।
গালার একটা কালচে লাল রঙের দণ্ড নিয়ে হুমায়ুন সেটা জ্বলন্ত মোমের শিখার উপরে ধরে এবং তাকিয়ে দেখে গালাটা নরম হয়, তারপরে রক্তের ফোঁটার মতো ফোঁটা ফোঁটা লালচে গালা ঝরতে শুরু করে। দণ্ডটা আগুন থেকে বের করে এনে সে চিঠির নীচে সেটা ধরে থাকে যতক্ষণ না সেখানে গালার একটা ক্ষুদ্র সঞ্চয় জমা হয়। তারপরে ডানহাত উল্টো করে সে তৈমূরের সোনার অঙ্গুরীয় শক্ত করে গালার উপরে চেপে ধরে গর্জনরত ক্রুদ্ধ ব্যাঘ্রের একটা নিখুঁত প্রতিকৃতি সেখানে সৃষ্টি করে।
এক ঘন্টা পরে, হুমায়ুন তাকিয়ে দেখে আহমেদ খানের দুজন লোক শেরশাহকে খুঁজে বের করে তাঁর চিঠিটা তাঁকে পৌঁছে দেবার জন্য লাহোর থেকে পুত বেগে ঘোড়া হাকিয়ে রওয়ানা হয়েছে। শেরশাহ কখনও ব্যক্তিগত দ্বৈরথে রাজি হবে না- কেবল আহাম্মকরাই এই ধরনের আহ্বানে সাড়া দিবে কিন্তু যুদ্ধবিরতির ধারণা তাঁকে হয়তো প্ররোচিত করতে পারে। ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের দ্বারা প্রচারিত কিছু গল্প সর্বজনস্বীকৃতভাবে যা গুজবের চেয়ে বেশী কিছু না- অনুসারে শেরশাহের কয়েকজন সেনাপতির ভিতরে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এইসব গল্পে যদি সত্যের বিন্দুমাত্র ছিটেফোঁটা থেকে থাকে, শেরশাহ তাহলে হয়তো নিজের কর্তৃত্ব পুর্নপ্রতিষ্ঠায় নিজেকে সাহায্য করতে যুদ্ধবিরতির এই প্রস্তাব স্বাগত জানাবে। সেটা যদি হয়, তাহলে হুমায়ুনও কিছুটা সময় পাবে। কাবুল থেকে তাঁর ডেকে পাঠান সৈন্যের পৌঁছাবার এখনও কোনো লক্ষণ নেই এবং সম্ভবত আগামী কয়েক সপ্তাহের আগে তারা এসে পৌঁছাবে না। শেরশাহের যতদিন বিলম্ব হবে প্রতিটা দিন তাকে সাহায্য করবে…
সাতদিন পরে একটা অশুভ লক্ষণের ন্যায় শেরশাহ এখন লাহোরের কত নিকটে- হুমায়ুন তাঁর চিঠির উত্তর পায়। তার আবাসন কক্ষে সেটা কাশিম নিয়ে আসে। অবাক করার মতো ব্যাপার হল চিঠি দুটো একটা শেরশাহের মোটা অমার্জিত হাতে লেখা এবং তার মোহর অঙ্কিত আর অন্যটা চিঠিটা বাঁশের একটা চোঙ্গার ভেতরে মোড়ার অবস্থায় রাখা- কাশিমকে গুপ্তদূতেরা যা বলেছে সে অনুযায়ী চিঠিটা হুমায়ুনের কাছে অবশ্যই পৌঁছে দেবার জন্য শেরশাহ অনুরোধ করেছে।
