পরিস্থিতিগুলো ভিন্ন। কিন্তু মোদ্দা কথা একটাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তোমার প্রয়োজন নেই। তুমি সেটা চাও না। তুমি কেবল তোমার নিজেরটা আমাদের বলতে চাও, কামরান নিজের চোখে মুখে একটা মনখারাপ করা অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে বলে। আমি আর বেশী কিছু বলতে চাই না।
হুমায়ুন তাঁর নানাজানের চোখে হুশিয়ারী দৃষ্টি খেয়াল করে, এই দফা সে কামরানের দ্বারা তাকে প্ররোচিত করার প্রলোভন বহুকষ্টে দমন করে। সে বরং হিন্দাল আর আসকারির দিকে ঘুরে তাকায়। কামরান ভুল করছে। আমি সত্যিই তোমাদের ভাবনা জানতে আগ্রহী। তাঁরা চুপ করে থাকে, তাদের বড়ভাইদের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা সম্ভবত তাঁদের সংযত করে তুলেছে। হুমায়ুনের ভিতরে হতাশার সাথে অনুশোচনার ক্ষরণ শুরু হয়। এই ধরনের কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। অতীতের সবকিছু ভুলে যাবার জন্য সে প্রস্তুত কিন্তু তার নিকট স্বজন, তার সৎ-ভাইয়েরা মনে হয় না সেরকম কিছু করতে ইচ্ছুক।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে অবশ্য হিন্দা কথা বলে। কাবুল থেকে বাড়তি লোকবল একবার এসে পৌঁছাবার পরে জাহিদ বেগ কি সব পছন্দের কথা বলছিলো। সেগুলো কি?
হুমায়ুন তার প্রশ্নের উত্তর দেয়। কম করে হলেও আমি পঞ্চাশ হাজার লোকের একটা বাহিনী প্রত্যাশা করছি। আমি তাঁদের কাছে আদেশ পাঠিয়েছি যে আমরা যদি ইতিমধ্যে এখানে অবরোধে সম্মুখীন হই তাহলে তারা অবরোধকারী বাহিনীকে পেছন থেকে এসে আক্রমণ করবে। আর তারা যদি শেরশাহ আগ্রা থেকে অগ্রসর হবার আগেই আমাদের সাথে এসে যোগ দেয়- আমি যেমন আশা করছি তখন শেরশাহের আগুয়ান বাহিনীর পার্শ্বদেশে আক্রমণের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক লোক আমাদের সঙ্গে থাকবে। অধিক লোকবলের সুবিধা তাঁর থাকবে কিন্তু আমাদের পক্ষে থাকবে গতি আর ঘোড়সওয়ারীর কুশলতা যা আমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে সবসময়ে আমাদের দারুণ সহায়তা করেছে। কামরান তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো, শেরশাহের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করার ঝুঁকি নিতে আমি প্রস্তুত- কেবল এই মুহূর্তে সেটা আমরা করতে পারছি না…।
কামরান কথা না বলে কেবল কাঁধ ঝাঁকায় এবং পুনরায় নিরবতা এসে বিরাজমান হয়। হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায়। শেরশাহের অভিপ্রায় সম্বন্ধে আর কাবুল থেকে আমাদের অতিরিক্ত বাহিনীর অগ্রসর হবার সংবাদ যখন আমাদের কাছে আরও বিশদভাবে থাকবে তখন আবার আমরা আলোচনার জন্য মিলিত হতে পারি। কিন্তু তার আগে আজ রাতে একটা ভোজসভার আয়োজন করলে কেমন হয় বহুদিন পরে আমরা আবার সবাই একত্রিত হয়েছি। বর্তমান বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও বাবরের ছেলেরা একতাবদ্ধ রয়েছে এসো দুনিয়াকে সেটা আমরা দেখিয়ে দেই।
হুমায়ুন করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে নিজের আবাসন কক্ষের দিকে হেঁটে যাবার সময় মহিলাদের কক্ষে যাবার দরজা সে পার হয়ে আসে। সেখানে ভেতরে কোথাও গুলরুখের থাকার কথা তাঁকে বলা হয়েছে কামরানের সাথে সে লাহোরে এসেছে। হুমায়ুন তাঁকে তাঁর দরবারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার পরে সঙ্গত কারণেই তিনি তাঁর বড় ছেলে, উচ্চাকাঙ্খি কামরানের সাথে থাকাটাই বেছে নিয়েছেন। মহিলা কি কোনোভাবে তাঁর ছেলেদের প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছে এবং সেটা যদি হয়ে থাকে, কিভাবে? এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। হুমায়ুন মুহূর্তের জন্য চিন্তা করে তার সৎ-ভাইদের পুনরায় একত্রিত করাটা তার ঠিক হয়েছে কিনা। তাঁদের চারজনের ভিতরে সত্যিকারের বিশ্বাস, সত্যিকারের একতাবোধ কখনও জন্ম নেবে এমন চিন্তা করাটা হয়ত বোকামী হবে- আকাঙ্খ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবসময়ে মাথা চাড়া দেবে। আর এজন্য কি সে তাঁদের দোষ দিতে পারে? তাঁদের অবস্থানে থাকলে যে ভাই উত্তরাধিকার সূত্রে সবকিছু পেয়েছে তাঁর প্রতি কি সে ক্ষোভ অনুভব করতো না? তাঁকে তাঁদের সবাইকে বিশেষ করে কামরানকে-চোখে চোখে রাখতে হবে এবং অবাধ্যতার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র তাকে ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘরের বাইরে যখন শত্রু কড়া নাড়ছে তখন ঘরের ভেতরের শত্রুকে সে কোনমতেই বরদাশত করবে না।
হুমায়ুনের হঠাৎ সালিমার সাথে দেখা করতে ইচ্ছা হয়। তাঁর উষ্ণ, ঐকান্তিক আলিঙ্গনে দৈহিক সুখে উদ্বেলিত হয়ে সে অস্বস্তিকর ভাবনাগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখতে পাবে। তার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠে এবং তাঁর হাটার গতি সহসা বেড়ে যায়।
*
সুলতান, শেরশাহের অগ্রবর্তী বাহিনী আগ্রা থেকে লাহোরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে। হুমায়ুনের বিশৃঙ্খল স্বপ্নের রেশ জওহরের কণ্ঠস্বরে ভেঙে যায়। সে কষ্ট করে ঘুমের রেশ কাটিয়ে সজাগ হবার মাঝে জওহরের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখটা তার ডানহাতে ধরা মোমের দপদপ করতে থাকা আলোক রশ্মির মাঝে উদ্ভাসিত দেখতে পায়। আহমেদ খান, এখনই আপনার সাথে দেখা করতে চায়। সে এমনকি ভোরের আলো ফোঁটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি হয়নি। তাঁর গুপ্তদূতদের একজন তার সাথেই রয়েছে। গত ছয় দিন লোকটা পথেই ছিল এবং এখনই ফিরে এসেছে।
হুমায়ুন উঠে বসে, তার বিছানার পাশে একটা কাঠের পাদানির উপরে রাখা পিতলের পাত্রে রক্ষিত পানি দিয়ে মুখে ঝাপটা দেয় এবং একটা সবুজ আলখাল্লা গায়ে জড়িয়ে নেয়। কয়েক মিনিট পরে, আহমেদ খান আর পথের ধকলের ফলে ক্লান্তিতে টলতে থাকা গুপ্তদূতকে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
