হুমায়ুন একটা রূপার কারুকাজ করা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসলে, তার অশ্বশালার প্রধান সিপাহসালার সামরিক কৌশলের সারাংশ ব্যাখ্যা করে, যা হুমায়ুন তার এবং বাইসানগারের সাহায্যে তৈরী করেছে।
মহামান্য যুবরাজবৃন্দ, জাহিদ বেগ বক্তব্য শুরু করে, তার প্রশস্ত মুখাবয়ব গম্ভীর, আমরা শেরশাহের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুই জানি না কিন্তু বর্তমানে তার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে সে নিজের অবস্থান সংহত করতে বেশী আগ্রহী- সে তার সেনাবাহিনীকে বাংলা থেকে পশ্চিমে অনেক দূরে নিয়ে এসেছে তাই তাঁর আরো রসদের আশ্বাস প্রয়োজন। সে সেইসাথে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের জলাভূমি অঞ্চলে বসবাসকারী বর্বর উপজাতিগুলি তার পেছনে বিদ্রোহ করে বসতে পারে সেই ঝুঁকির ভেতরেও রয়েছে। তাঁর তাই নিজেকে যথেষ্ট পরিমাণে নিরাপদ মনে না হওয়া পর্যন্ত সে আগ্রা থেকে আমাদের ধাওয়া করে এখানে আসবে না, তার মানে এই দাঁড়ায় যে আমাদের হাতে সামান্য হলেও খানিকটা সময় রয়েছে…যদি সত্যি সত্যি এটাই তার ইচ্ছা হয়ে থাকে এবং এটা নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল। এই সময়টায় আমাদের অবশ্যই নিজেদের বাহিনীর জন্য নতুন সৈন্য সংগ্রহ করতে হবে। আমরা ইতিমধ্যে কাবুলের প্রশাসকের কাছে বাড়তি লোকবল প্রেরণের জন্য দূত পাঠিয়েছি। তারা একবার পৌঁছে গেলে, আমাদের অবস্থান তখন অনেকবেশী শক্তিশালী হবে আর আমাদের তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনেক বেশী স্বাধীনতা থাকবে।
আমরা কি এইসব নতুন সৈন্যদের বেতন দিতে পারবো? আসকারি জিজ্ঞেস করে তার ছোট ছোট কালো চোখের মনিতে একাগ্রতা স্পষ্ট। নাকি আমরা আশা করি যে তাঁরা আমাদের পক্ষে লড়াই করবে কেবল লুটের মালের প্রতিশ্রুতির কারণে?
আমাদের কাছে যথেষ্ট তহবিল আছে- আগ্রা এবং সেই সাথে দিল্লীর রাজকোষ থেকে প্রাপ্ত, কাশিম উত্তর দেয়।
এবং তাঁরা এসে পৌঁছাবার আগে…? কামরান জানতে চায়।
আমরা সেই সময়ে লাহোরকে শক্তিশালী আর রসদের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করবো, হুমায়ুন বলে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে শহরটায় কোনো প্রতিরক্ষা দেয়াল নেই কিন্তু উত্তরে রাভি নদী আমাদের নিরাপত্তা দেবে এবং আমরা পশ্চিম, দক্ষিণ আর পূর্বদিকে প্রতিরক্ষা পরিখা খনন করে সেখানে আমাদের কামান এবং তবকিদের মোতায়েন করতে পারি। রাজপ্রাসাদটা বেশ মজবুত করে নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন সৈন্যের আগমনের জন্য অপেক্ষা করার সময়ে আমরা কিছু সময়ের জন্য শহরটাকে রক্ষা করতে পারবো।
কামরানের সবুজ চোখ পিট পিট করে কিন্তু সে কিছু বলা থেকে বিরত থাকে।
মহামান্য যুবরাজবৃন্দ, আপনারা প্রত্যেকে নিজেদের সাথে কতজন সৈন্যের বাহিনী নিয়ে এসেছেন? কাশিম তাঁর উঁত কাঠের প্রচ্ছদযুক্ত খেরো খাতাটা খুলে যেখানে হুমায়ুনের যতদূর মনে পড়ে তার উজির গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যাপার লিখে রাখে। কাশিম নিজের গলায় একটা মালা থেকে ঝুলতে থাকা ছোট জেড পাথরের দোয়াতদানির মুখটা খুলে এবং সেটায় নিজের ব্যবহৃত লেখনী ডুবিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।
আমার সাথে পাঁচ হাজার অশ্বারোহীর একটা বাহিনী আছে, যাদের ভিতরে এক হাজার হল অশ্বারোহী তীরন্দাজ, আসকারি বলে, এবং সেই সাথে অতিরিক্ত পাঁচশ ঘোড়ার পাল।
আমার বাহিনীতে তিন হাজার অশ্বারোহী আর পাঁচশ পদাতিক সৈন্য রয়েছে, হিন্দাল বলে। সবাই দক্ষ যোদ্ধা।
তারা সবাই কামরানের দিকে একসাথে তাকায়। আমার সাথে কেবল দুই হাজার অশ্বারোহীর একটা বাহিনী রয়েছে। আর তাছাড়া, তুমিইতো আমাকে কয়েক সপ্তাহ পূর্বে কখনও আক্রমণের সম্মুখীন হলে আমার প্রদেশকে প্রতিরক্ষাহীন অবস্থায় ফেরে রাখার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিলে… তার কণ্ঠস্বর সহ্য করাটাই হুমায়ুনের জন্য জুলুম হয়ে দাঁড়ায়-কামরানের প্রদেশ সবচেয়ে বড় আর সবার চেয়ে সমৃদ্ধ এবং শেরশাহের সেনাবাহিনীর কাছ থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত আর নিজের প্রদেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে না ফেলে সে অনায়াসে দুই হাজারের অনেক বেশী সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে পারতো, কিন্তু অনেক কষ্টে নিজের ক্রোধ দমন করেন। কিছুক্ষণের জন্য কেবল কাশিমের লেখনীর খসখস আওয়াজ শোনা যায়, তারপরে উজির লেখা শেষ করে মুখ তুলে তাকান। বেশ, মহামান্য যুবরাজবৃন্দ, এইসব অতিরিক্ত লোক এসে যোগ দেয়ায় আমাদের সেনাবাহিনীর সংখ্যা নব্বই হাজারে উন্নীত হয়েছে।
তাদের এখানে আটকে রাখার জন্য আমাদের সব রকমের চেষ্টা করতে হবে আমি চাই না তারা বাসায় যাবার জন্য গায়েব হতে শুরু করুক…হুমায়ুন বলে।
সেটা এড়াবার একমাত্র পথ হল তাঁদের শীঘ্রই যুদ্ধ আর লুটের মাল লাভের প্রশ্রুিতি দেয়া। লাহোরে রাজকোষ আর রাজঅন্তঃপুরের মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরে আমাদের এখন উচিত পুনরায় শেরশাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করা তাঁকে চমকে দিয়ে…কামরান উত্তর দেয়।
হ্যাঁ, আসকারিও ব্যথভাবে সায় দেয়। কামরান ঠিকই বলেছে। সেটাই কি শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত হবে না?
সেটা হবে একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত, হুমায়ুন উত্তর দেয়। তোমরা ভুলে গেছো আমাদের বাহিনীর চেয়ে কত বিশাল তার সৈন্যসংখ্যা। চূড়ান্ত বিজয়ের সামান্যতম সম্ভাবনার জন্য আমাদের গোলন্দাজ বাহিনীর সাথে একটা যুগলবন্দি দরকার হবে। সেটা করতে গেলে আমাদের অগ্রসর হবার গতি হ্রাস পাবে আর সেই সাথে আমাদের অগ্রসর হবার খবর তার কাছে পৌঁছাবার জন্য সময়ের একটা ব্যাপার আছে। কামরান, আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। দিল্লী কিংবা আগ্রায় শেরশাহের হাতে নিজেকে অবরুদ্ধ হতে না দিয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করায় তুমি আমার সমালোচনা করেছে কিন্তু এখন আমি যখন তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য লাহোরকে সুরক্ষিত করতে চাইছি, তুমি আমাকে অনুরোধ করছে তার বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধযাত্রা করতে…
