পারস্পরিক কুশল বিনিময় শেষ হতে, হুমায়ুন কাশিম, বাইসানগার আর জাহিদ বেগের সাথে তাঁর সৎ-ভাইদেরও নিজের চারপাশে অর্ধ-বৃত্তাকারে উপবেশনের ইঙ্গিত করে এবং কোনো প্রকার ভণিতা না করে কাজের কথায় আসে। আমি তোমাদের এখানে দেখে খুব খুশী হয়েছি। বহুদিন পরে আমরা সবাই আবার একসাথে হলাম। তোমরা ভালো করেই জান- কেন আমি তোমাদের এখানে ডেকে পাঠিয়েছি। আমরা যুদ্ধের পরামর্শসভায় মিলিত হয়েছি এবং আমাদের প্রত্যেকের ভাগ্য- আমাদের পুরো রাজবংশের- আজকের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। অতীতে আমাদের নিজেদের ভিতরে অনেক মতানৈক্য ছিল কিন্তু আমরা চারজনই বাবরের সন্তান। আমাদের প্রত্যেকের ধমনীতে তৈমূরের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে এবং চারপাশে ঘনিয়ে আসা বিপদের সম্মুখীন হয়ে আমাদের অবশ্যই একত্রিত হতে হবে। তোমরা অবহিত আহো যে শেরশাহ তিন লক্ষ সৈন্যের একটা বিশাল বাহিনী নিয়ে আমাদের সাম্রাজ্যের রাজধানী, আগ্রা দখল করে নিয়েছে…
এটা দুঃখজনক যে শেরশাহের বিরুদ্ধে আপনার অভিযান সফল হয়নি, কামরান মৃদু কণ্ঠে বলে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় অন্তত একবারের জন্য হলেও নক্ষত্ররাজির গণনা আপনাকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করেছে।
হুমায়ুনের চোখমুখ লাল হয়ে উঠে, কামরান কথা বলার সাথে সাথে মৈত্রীর জন্য তার আকাঙ্খ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। শেরশাহের সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করে আমার দেহ থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং অনেক ভালো মানুষ- বাবা ইয়াসভালের মতো মানুষ- শহীদ হয়েছে। আমার অনুরোধে সাড়া দিয়ে তুমি যদি সাহায্য পাঠাতে, শেরশাহকে আমি পরাস্ত করতে পারতাম, এবং আমার চারপাশে যেসব বীর যোদ্ধারা শহীদ হয়েছে তারা হয়ত আজও বেঁচে থাকতো…
আমি আমার নিজের বাহিনীর প্রধান হিসাবে আসবার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, আপনি সেটা মানতে অস্বীকার করেছেন…
কারণ আমি চাইনি তোমার নিজের প্রদেশ অরক্ষিত অবস্থায় থাকুক।
কিন্তু আমি আপনাকে এতো পূর্বদিকে গিয়ে শেরশাহকে মোকাবেলা করার ব্যাপারে হুশিয়ার করেছিলাম- আমি আপনাকে দিল্লী অথবা আগ্রায় দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের জন্য প্রস্তুতি নেবার পরামর্শ দিয়েছিলাম। শহরের দেয়ালের ভিতরে সুরক্ষিত অবস্থায় এবং পর্যাপ্ত রসদের বন্দোবস্ত করে আপনি শেরশাহের বাহিনীকে উদ্যমহীন করতে পারতেন এবং আপনার অন্যান্য বাহিনী তাঁকে পেছন থেকে আক্রমণ করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতো। কিন্তু বরাবরের মতোই আপনি আমার পরামর্শের প্রতি কোনো গুরুত্বই দেননি… হুমায়ুনের মনে হয় কামরান নিজের চোখে মুখে হাল্কা বিদ্রুপের একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে নিজের যুক্তির পক্ষে নাছোড়বান্দার মতো সাফাই দিচ্ছে।
এবং আমার প্রতি তোমার আনুগত্য বরাবরের মতোই সন্দেহজনক… বালিঘড়ির বালুর মতোই ইতিমধ্যে এর অবত শুরু হয়েছে…তোমার প্রতারক চোখের মণিতে আমি সেটা দেখতে পাচ্ছি… হুমায়ুন কথাটা বলে উঠে দাঁড়ায়। তাঁদের ছেলেবেলায় সে ছিল সবসময়ে সেরা যোদ্ধা আর কুস্তিগীর। সে কামরানকে বহুবার আড়ং ধোলাই করেছে এবং প্রয়োজন হলে আবার করবে… কামরানও মার্জারের দ্রুততায় উঠে দাঁড়ায়, তাঁর হাত কোমরের গাঢ় বেগুনী পরিকরে গোঁজা রত্নখচিত খঞ্জরের বাটের দিকে এগিয়ে যায়।
সুলতান আপনারা… বাইসানগারের শান্ত সমাহিত কণ্ঠস্বর তাঁদের দুজনের মাঝে সম্বিত ফিরিয়ে আনে। হুমায়ুন নিজেই লজ্জিত বোধ করে যে তাকে প্ররোচিত করতে সে কামরানকে সুযোগ দিয়েছে। তারা এখন আর কাবুলের সেই লড়াকু বালক নয় বরং মোগল যুবরাজ সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মারাত্মক এক বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কামরানকে দেখেও মনে হয় সে নিজের আচরণের জন্য অনুতপ্ত। সে পরিকরের কাছ থেকে হাত সরিয়ে নেয় এবং চোখ নীচের দিকে নামিয়ে নিয়ে বিনা বাক্য ব্যয়ে পুনরায় আলোচনার উদ্দেশ্যে মাটিতে বসে। আসকারি আর হিন্দালও অধোমুখে তাকিয়ে রয়েছে, যেন তারা একটা বিষয় পরিষ্কার বুঝিয়ে দিতে চায় যে বাবরের বড় দুই ছেলের ঝগড়ার মাঝে তারা কোনো পক্ষ অবলম্বন করতে পারবে না।
বরাবরের মতোই বাইসানগার, তুমি হলে বিবেকের কণ্ঠস্বর। হুমায়ুন নিজেও এবার মাটিতে আসনসিঁড়ি হয়ে বসে। অতীতের ঘটনা অতীতের গর্ভে বিলীন হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হল ভবিষ্যতের খেয়াল রাখা। আমাদের মরহুম আব্বাজান তাঁর জীবনের প্রায় অর্ধেক সময়কাল যুদ্ধ করেই অতিবাহিত করেছেন- তাঁর যখন মাত্র বারো বছর বয়স তখন থেকেই একটা সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করতে। আল্লাহতালা তাকে আমাদের পৈতৃক জন্মভূমি থেকে অনেক দূরে নতুন দেশে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছেন, এবং এটা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব, যে জন্য তিনি লড়াই করেছিলেন সেটা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি। আমি এজন্যই তোমাদের এখানে ডেকে এনেছি- যাতে আমরা চারজন মিলে সিদ্ধান্ত নিতে পারি কিভাবে সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখা যায়… এবং আমাদের চূড়ান্ত শক্তি, আর পরম নিরাপত্তা আমাদের ঐক্যের ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে।
তার সৎ-ভাইয়েরা একসাথে মাথা নাড়ে এবং সেটা দেখে হুমায়ুনেরও শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে। জাহিদ বেগ আমাদের সামরিক পরিকল্পনার একটা রূপরেখা আমার ভাইদের সামনে উপস্থাপন করেন। আমি তাদের যেকোনো মতামতকে স্বাগত জানাব।
