তাঁরা যখন হাতির পিঠে চেপে ভ্রমণ করে, হুমায়ুন তখন নিজের ভাবনাগুলো নিয়ে, তার সেরা হাতিগুলোর একটার পিঠে সোনার শেকল দিয়ে বাঁধা খানজাদা আর গুলবদনের দুলতে থাকা হাওদায়, তাদের সাথে ধুসর গোলাপী রেশমের কাপড়ের মাঝে দিয়ে যা তাদের পুরো হাওদা আবৃত করে রেখেছে, আলোচনা করে। প্রখর ব্যবহারিক জ্ঞানের অধিকারী খানজাদা তাঁর হিন্দু প্রজাদের ধর্মীয় আচরণের বিষয়ে তাঁর মতো আগ্রহ পোষন করেন না- পাথরের তৈরী যোনি আর লিঙ্গম- পুরুষ আর নারীর যৌনাঙ্গের প্রতীক- কেন তাদের কাছে এতো পবিত্র তাদের পুরোহিতেরা কেন কপালে ছাই লেপন করেন এবং কেন তাঁরা তাঁদের ডান কাঁধের উপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে দেহের সাথে একটা সুতির লম্বা সুতা ঝোলে।
গুলবদন অবশ্য অবিশ্বাসীদের এসব ধর্মাচরণ দ্বারা মনে হয় কেবল অভিভূতই না সে এসব বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে। হুমায়ুন অবশ্য নিজেকে এটাও স্মরণ করিয়ে দেয় যে কাবুল থেকে বাবরের রাজধানী আগ্রায় তাঁকে যখন নিয়ে আসা হয়েছিল তখন তার বয়স একেবারেই অল্প ছিল। সে হিন্দুস্তানেই বড় হয়েছে এবং খাইবার পাসের ওপাশে মোগলদের পাহাড়ী স্বদেশ সম্বন্ধে তাঁর স্মৃতি খুবই সামান্য প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁকে লালনপালনের দায়িত্বে হিন্দুস্তানী মহিলারা ছিল তারা তাদের আয়া বলে- যারা নিশ্চয়ই তাদের ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠানের আঙ্গিক তাঁকে ব্যাখ্যা করেছে। সময় যখন আবারও শান্ত হবে, সে তখন অবশ্যই গুলবদনের সাথে আরো বেশী সময় অতিবাহিত করবে, তার নতুন প্রজাদের আরো ভালো করে বুঝতে।
*
হুমায়ুনের সৈন্যসারি আপাতভাবে শান্ত ভূপ্রকৃতির উপর দিয়ে নিরূপদ্রবভাবে এগিয়ে যায়, যতক্ষণ না তাদের সামনে লাহোর ভেসে উঠে। শহরটার চারপাশে যদিও কোনো প্রতিরক্ষা বেষ্টনী নেই, শহরের কেন্দ্রস্থলে কয়েক শতাব্দি পূর্বে হিন্দু শাসকদের দ্বারা নির্মিত প্রাচীন রাজপ্রাসাদের সামনে হুমায়ুন যখন ঘোড়ার পিঠ থেকে নামে তখন লক্ষ্য করে যে প্রাসাদটার কাঠামো বেশ শক্তিশালী এবং মজবুত। এসবের চেয়েও ভালো খবর হল তার সৎ-ভাইয়েরা ইতিমধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছে এবং প্রাসাদের অভ্যন্তরে তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে কখনও কোনো অলুক্ষণে মুহূর্ত অনেকবারই ভেবেছে তাঁরা তাঁর আদেশ পালন করবে কি না কিন্তু তারা আদেশ পালন করেছে… এমনকি কামরানও।
তাঁদের সাথে মিলিত হবার জন্য নিজের ভেতরের ব্যাকুলতা দেখে সে বিস্মিত হয়। তারা এখন দেখতে কেমন হয়েছে? বাবরের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই যখন তারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের পরে সে আর তাঁদের দেখেনি। সে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশী কৃতজ্ঞ, তাদের অপরাধ সে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বিবেচনা করেছিল- কারণ কেবল যে বাবর তাঁর মৃত্যুশয্যায় তাঁর কাছ থেকে কথা আদায় করেছিল তাদের সে সহানুভূতিপূর্ণ আচরন করবে আর তারচেয়েও বড় কথা এবং তাদেরও নিশ্চিতভাবেই তাকে প্রয়োজন রয়েছে। মোগল যুবরাজ হবার কারণে শেরশাহ তাঁদের সব ভাইদের জন্যই হুমকি স্বরূপ। বাবরের সন্তানেরা যদিও একত্রিত হতে পারে, তাহলে তারা বাংলার জলাজঙ্গল ভর্তি যে এলাকা থেকে শেরশাহ এসেছে, তাকে পুনরায় সেখানে পাঠিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা এই যে এই বিপর্যয়টা হয়তো তাদের সবকিছু নতুন করে শুরু করার একটা সুযোগ দেবে, কেবল রক্তের সম্পর্কই না ভ্রাতৃত্বের স্নেহশীল মনোভাব যা কখনও ছিন্ন হয়নি, সবকিছু পুনরায় মুসাকিদা করতে পারবে। তারাও অতীতের ক্ষত নিরাময় করতে আগ্রহী এমন আশা করাটা কি বোকামী হবে?
পরের দিন সকালের আলো ফোঁটার সাথে সাথে, হুমায়ুন তার সৎ-ভাইদের নিজেন আবাসন কক্ষে ডেকে পাঠায়। কাশিম, জাহিদ বেগ আর ক্লান্ত দেখতে বাইসানগারের উপস্থিতিতে কামরান, হিন্দাল আর আসকারি কক্ষে প্রবেশ করতে হুমায়ুন একে একে তাঁদের আলিঙ্গন করে, স্বতস্ফূর্ত আন্তরিকতায় প্রত্যেকের সম্বন্ধে মন্তব্য করে যা তাদের নিজেদের কৌতূহলের সাথে মিলে যায় যখন তারা অবাক দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রায় ছয় বছর আগে শেষবারের মতো সে যখন তাঁদের দেখেছিল, আসকারি আর হিন্দাল তখন সদ্য যৌবন প্রাপ্ত হয়েছে আর কামরান তার চেয়ে মাত্র পাঁচ মাসের ছোট, একটু পরিণত। এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ।
কামরানের চোখ- যা ঠিক তাঁদের আব্বাজানের মতো উজ্জ্বল সবুজ- নাকের উপরে পিট পিট করে তাকিয়ে থাকে যা এখনও দেখতে বাজপাখির মতো, বস্তুত পক্ষে এখন সাদৃশ্য আরও বেশী মাত্রায় লক্ষণীয়। নাকটা ভাঙা পরিষ্কার বোঝা যায়- খুব সম্ভবত ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে বা সংক্ষিপ্ত কোনো লড়াইয়ের ফল- এবং হেকিমেরা ভাঙা জায়গাটা ঠিকমতো বসাতে পারেনি। সেটাই একমাত্র পরিবর্তন– কামরান বেশ লম্বা চওড়া হয়েছে। তার পরণের হলুদ জোব্বার নীচে কাঁধের পেশল মাংসপেশী আর বাহুর উধ্বভাগ ফুলে রয়েছে। আসকারির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তাঁর যে চেহারা হুমায়ুনের মনে ছিল তার চেয়ে আসকারির মুখ অনেকবেশী সরু আর লম্বা দেখায় এবং তার মুখে এখন সুন্দর করে ছাটা দাড়ি শোভা পাচ্ছে, সে আগের মতোই হাল্কা পাতলা রয়ে গেছে। হুমায়ুন বা কামরানের চেয়ে সে লম্বায় কম করে একমাথা খাট। হুমায়ুন হিন্দালকে একেবারেই চিনতে পারেনা। দিলদারের ছেলে- গুলবদনের ভাই- চোখে পড়ার মতো লম্বা চওড়া হয়ে উঠেছে। তার যেকোনো ভাইয়ের চেয়ে কম করে হলেও চার ইঞ্চি লম্বা আর চওড়া পেশল দেহ, মাথাভর্তি ঝাকড়া লালচে চুলের নীচে ডান ভ্রুর উপরে একটা আড়াআড়ি কাটা দাগ এবং হুমায়ুনকে স্বাগত জানাবার সময় তাঁর মন্দ্র, গমগমে কণ্ঠস্বরের কারণে তাঁকে আঠার বছরের চেয়ে অনেক বড় মনে হয়।
