দুই ঘন্টা পরে, পিঙ্গল বর্ণের লম্বা পায়ের অধিকারী পেষল স্ট্যালিয়নটায়, যা তাঁকে কনৌজের বিপর্যয়ের পরে খুব দ্রুত আগ্ৰায় ফিরিয়ে এনেছিল, উপবিষ্ট অবস্থায় আগ্রা দূর্গের মূল তোরণদ্বারের নীচে ঢালু পথের উপরে দিয়ে হুমায়ুনকে মন্থর গতিতে ঘোড়া চড়ে বের হয়ে আসতে দেখা যায়। মাথার রত্নখচিত শিরোস্ত্রাণের নীচে, তাঁর চোখের দৃষ্টি সোজা সামনের দিকে নিবদ্ধ। এটা পেছন দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে দেখা বা কোনো ধরনের স্মৃতি রোমন্থনের সময় না। এটা একটা সাময়িক বিপর্যয় আর শীঘ্রই খুব শীঘ্রই, যদি আল্লাহতালা সহায় থাকেন- নিজের ন্যায়সঙ্গত অধিকার বুঝে নেবার জন্য সে ফিরে আসবে। আপাতত বিদায় নেয়ার আগে সে শেষ একটা কাজ করতে চায়। ঘোড়ায় করে নদীর তীরে পৌঁছে সে সেখানে ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে তাঁকে যমুনার অপর তীরে মাহামের কবরের কাছে নিয়ে যাবে বলে যে ছোট নৌকাটা অপেক্ষা করছিল সেটায় আরোহন করে। সাদা মার্বেলের আয়তাকার চ্যাপ্টা খণ্ডটার কাছে পৌঁছে সে হাটু ভেঙে বসে এবং পাথরটায় চুমু খায়। শেরশাহ আমাদের ধর্মের অনুসারী লোক, সে ফিসফিস করে বলে। সে আপনার কবরের কোনো ক্ষতি করবে না এবং একদিন আমি আপনার কাছে ফিরে আসবো। আম্মিজান আমাকে মার্জনা করবেন যে আমি চল্লিশ দিনের শোক পালন করতে পারছি না, কারণ আমাদের রাজবংশের ভাগ্য অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে এবং আমাকে দেহের প্রতিটা স্নায়ু আর পেশীকে সহ্যের শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়ে একে রক্ষা করার জন্য আমাকে চেষ্টা…
*
তারা আগ্রা ছেড়ে আসবার পরে প্রতিদিনই নিয়মিত বৃষ্টিপাতের প্রকোপ মনে হয় যেন অনেকটা কমে এসেছে এবং হুমায়ুন ঠিক যেমনটা আশা করেছিল- শেরশাহ যদিও আগ্রা দখল করেছে কিন্তু সে তাকে আর অনুসরণ করেনি। হুমায়ুনের গুপ্তচরদের ভাষ্য অনুসারে শেরশাহকে হিন্দুস্তানের পাদিশাহ ঘোষণা করে আরো একবার তাঁর নামে আগ্রা দূর্গের মসজিদে খুতবা পাঠ করা হয়েছে এবং সে এখন নিয়মিত খিলানযুক্ত দর্শনার্থী হলে দরবার করছে। বেশ, ভুইফোড়টা তার গৌরবোজ্জ্বল মূহূর্ত উপভোগ করুক- যদিও সময়টা খুবই সংক্ষিপ্ত হবে।
হুমায়ুন মনে মনে ভাবে তাঁর সেনাসারি বেশ দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। প্রতিদিন সম্ভবত বারো কি তের মাইল, সম্ভবত আরো বেশী, যেহেতু তারা উত্তরপশ্চিম দিক অভিমুখে বৈচিত্রহীন ভূখণ্ডের উপর দিয়ে ভ্রমণ করছে। তারা যদি তাদের সামরিক বহরের এই গতি বজায় রাখতে পারে তাহলে আশা করা যায় একমাসের ভিতরে তারা লাহোরে পৌঁছে যাবে। এখনও পর্যন্ত কোনো ভয়াবহ আক্রমণের সম্মুখীন তাদের হতে হয়নি। মোগলদের সৈন্যসারি যখন কোনো গ্রামের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তখন সেখানে বসবাসকারী লোকেরা মনে হয় যেন কাছে আসতে ভয় পায় তাঁরা বৃষ্টির পানি জমে থাকা ফসলের মাঠের নিরাপদ আশ্রয়ে কিংবা তাঁদের মাটির দেয়াল আর খড় দিয়ে ছাওয়া বাড়ি থেকে অগ্রসরমান সৈন্যদের কাতার আর মালবাহী শকটের দিকে তাকিয়ে থাকে। হাড়ের মাংসে চামড়া ঢুকে যাওয়া কুকুরের পাল আর হাড্ডিসার হলুদ পালকযুক্ত মুরগীর ঝাকই কেবল চারপাশে হেঁটে বেড়াতে দেখা যায়।
তাঁর সেনাসারির উপর এখন পর্যন্ত একবার মাত্র হামলা হয়েছে। ঝিরঝির বৃষ্টির পর্দায় চারপাশ জড়িয়ে নিয়ে একদিন সন্ধ্যাবেলা যখন দ্রুত আঁধার নামছিলো, কাদায় আটকে গিয়ে অতিরিক্ত তাবু আর রান্নার সরঞ্জামাদি বহনকারী একটা শকট মূলবহর থেকে আলাদা হয়ে গেলে, ডাকাতের দল সেটাকে আক্রমণ করে। বেশ কয়েক ঘন্টা পরে মালবাহী শকটটার অনুপস্থিতি সবার নজরে পড়ে এবং আহমেদ খান দ্রুত গুপ্তদূত পাঠায় ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে। তারা পিঠে তীরবিদ্ধ অবস্থায় মালবাহী শকটের চালকদের বৃষ্টিতে ভেজা মৃতদেহ খুঁজে পায় এবং আশেপাশে কোথায় মালবাহী শকট নেই। কিন্তু অন্ধকার হয়ে গেলেও চোর আর চুরি করা শকটটি খুঁজে বের করতে খুব একটা দেরী হয়না। রাতের প্রথম আগুন জ্বালাবার প্রায় সাথে সাথে, আহমেদ খানের প্রেরিত লোকেরা, বাজারে যেভাবে মুরগী বিক্রি করতে নিয়ে যাওয়া হয় ঠিক সেভাবে সেরাতের অস্থায়ী শিবিরে ডাকাতদের বেঁধে আনে। হুমায়ুন কালবিলম্ব না করে তাদের শিরোচ্ছেদের আদেশ দেয় এবং পাথরের একটা পিরামিডে ছিন্ন মুণ্ডুগুলো দেখা যায়, এমনভাবে গেঁথে দিতে বলে একটা হুশিয়ারি হিসাবে যে প্রজাদের ভিতরে আইন অমান্য করার কোনো ধরনের প্রবণতা সে বরদাশত করবে না।
সে এমনকি নিজের সৈন্যদের ভিতরেও এসব বরদাশত করতে রাজি না। রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও হিন্দুস্তানের এইসব লোকগুলো তাঁর আপন তাঁর প্রজা- এবং সে কখনও তার লোকদের বলেনি যে হিন্দুস্তানীদের উপরে তাঁরা ইচ্ছামতো লুটপাট চালাতে পারবে। সে কঠোরভাবে আদেশ দিয়ে রেখেছে যে কোনো ধরনের লুটপাট করা চলবে না এবং ইতিমধ্যে ছয়জন সৈন্যকে কাঠের কাঠামোতে হাতপা ছড়ান পক্ষবিস্তারকারী ঈগলের মতো আটকে তাদের সহযোদ্ধাদের সামনে তাদের ভালোকরে চাবকানো হয়েছে, একটা ভেড়া চুরি করার অপরাধে এবং সপ্তম আরেকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে গ্রামের এক কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করার দায়ে।
সে যাই হোক, গাদাফুল দিয়ে তারা যখন তাদের মন্দিরের সামনে খোদাই করা মোষের মূর্তির পাশ দিয়ে যায়, এবং তাদের উদ্ভটসব দেবতার মূর্তিসমূহ অনেকেরই একাধিক হাত রয়েছে, কেউ দেখতে অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক হাতির মতো- সে না ভেবে থাকতে পারে না যে রাজত্ব লাভের আকাঙ্খ আর নিয়তি মোগলদের যে স্থানে নিয়ে এসেছে সেখানের গতিপ্রকৃতি কি সে কখনও পুরোপুরি বুঝতে পারবে। তার আপন ঈশ্বর হলেন একটি নিঃসঙ্গ সত্ত্বা, অদৃশ্য এবং নিজে নিজে শেভ করার জন্য এবং সর্বময়ক্ষমতায় স্পর্ধিত হয়ে উঠে, তার আদলে কিছু একটা তৈরী করাটা ধর্মদ্রোহীতার সামিল। হিন্দুদের দেবতাদের দেখলে মনে হবে তারা কোনো বাহিনীর অংশ এবং তাঁদের ইন্দ্রিয়পরায়ন দেহ আর পেষল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখলে চিরন্তত পরিত্রাণের চেয়ে পার্থিব ভোগবিলাসের কথাই মনে পড়ে।
