আমরা পশ্চাদপসারণ করছি, পালিয়ে যাচ্ছি না। যদিও আগামীকাল ভোরের প্রথম প্রহরে আমরা যাত্রা শুরু করবো, সবকিছু যেন শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে করা হয়…কাশিম, রাজকীয় বাজার সরকার আর তার কর্মচারীদের সমবেত হতে বলেন এবং আমার আদেশ দ্রুত আর কোনো প্রশ্ন না করে তাঁরা যেন পালন করে সেটা আপনি নিশ্চিত করবেন। আগ্রায় রক্ষিত রাজকীয় কোষাগারে যা কিছু রয়েছে সবকিছু অবশ্যই সিন্দুকে স্থানান্তরিত করতে হবে। মূল্যবান বাকি অন্য জিনিষ আমাদের সাথে করে নিয়ে যাবার জন্য মোড়ক করতে আদেশ দেন- শেরশাহের কাজে লাগতে পারে এমন কিছুই রেখে যেতে চাই না আমি। জাহিদ বেগ, আমাদের সৈন্যদের যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। তাঁদের বলবেন কাবুল থেকে আমাদের যে সৈন্যবাহিনী আসছে তাদের সাথে যোগ দেবার জন্য আমরা লাহোর যাচ্ছি। আর আমাদের সব গাদাবন্দুক আর বারুদ যেন নিরাপদে গোশকটে ভোলা হয় সেটা নিশ্চিত করবেন আর কামানগুলোকে যাত্রার জন্য প্রস্তুত করেন। এমনকিছু করবেন না বা বলবেন না যার ফলে কারো মনে পরাজয় বা পলায়ন বা আমরা শেরশাহের ভয়ে ভীত এমন ভাবনার জন্ম হয়।
হুমায়ুন কথা বন্ধ করে এবং চারপাশে তাকায়। আর আহমেদ খান আপনি, আমার সৎ-ভাইয়েরা নিজ নিজ প্রদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ঠ পরিমাণ সৈন্য মোতায়েন করে, বাকি সৈন্য নিয়ে লাহোরে আমার সাথে তাদের যোগ দেবার আদেশ সম্বলিত চিঠি বয়ে নিয়ে যাবার জন্য আপনার সবচেয়ে দ্রুতগামী আর সেরা তরুণ অশ্বারোহীদের নির্বাচিত করেন। আমি নিজে চিঠিগুলো লিখব আর তাতে রাজকীয় মোহরের ছাপ দিয়ে দেব যাতে সম্রাট তাঁদের আদেশ দিয়েছেন- সে বিষয়ে আমার ভাইদের মনে কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ না থাকে। এখন দ্রুত যা বললাম করেন, আমাদের হাতে সময় খুব অল্প…
সেই রাতে হুমায়ুন এক মুহূর্তের জন্য চোখের পাতা বন্ধ করে না বা হারেমো যায় না তাকে অনেককিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। রাতের অন্ধকার ছিন্ন করে অবশ্য নিয়মিত বিরতিতে শেরশাহের অগ্রগামী সৈন্যের অগ্রসর হবার তাজা আর প্রতিবার আরো বেশী মাত্রায় উদ্বেগজনক হয়ে উঠা খবর নিয়ে গুপ্তদূতের আগমন অব্যাহত থাকে। হুমায়ুন হিসাব করে দেখে, শেরশাহ যদি তাঁর অগ্রসর হবার বর্তমান গতি বজায় রাখে তাহলে তার অগ্রবর্তী সৈন্যরা তিন কি চারদিনের ভিতরে আগ্রার উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত হবে।
পূর্বাকাশে ভোরের আলো ফোঁটার অনেক আগেই, উষ্ণ বাতাসে পতপত করে উড়তে থাকা নিশান নিয়ে হুমায়ুনের সেনাবাহিনীর প্রথম দলটা সামনের রাস্তা নিরাপদ করার দায়িত্ব নিয়ে যাত্রা শুরু করে। সে আগ্রা ত্যাগ করছে এই খবরটা একবার চাউর হলে, জনগণ উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে আর ডাকাতের দল সেই সুযোগে হয়ত কোনো অপকর্ম ঘটাবে। হুমায়ুনের অগ্রবর্তী সেনাদলের দায়িত্ব হল ইস্পাতের চকচকে বর্ম আর রাজকীয় অশ্বশালা থেকে সরবরাহ করা তাজা ঘোড়ায় চেপে- শক্তির প্রদর্শন করে দুবৃত্তদের কোনো ধরনের অপকর্ম ঘটান থেকে বিরত রাখা। হুমায়ুন নিজের মনে বলে, আর সেই সাথে আমি এখনও শক্তিশালী। তার অধীনে এখনও আশি হাজার সৈন্যের একটা বাহিনী রয়েছে। পানিপথের সময় তাঁর আর তাঁর আব্বাজানের সাথে যা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশী।
হুমায়ুন তাঁর আবাসন কক্ষের জানালা দিয়ে নীচের আঙ্গিনার দিকে তাকিয়ে দেখে, রাজঅন্তঃপুরের মহিলা এবং তাঁদের পরিচারিকার দল তাদের জন্য প্রস্তুত করা পালকি আর গোশকটে অবস্থান গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেনাসারির একেবারে মধ্যে তাঁরা ভ্রমণ করবেন, তাদের চারপাশে অবস্থানরত প্রহরীরা একটা নিরাপত্তা বেষ্টনী বজায় রাখবে, এবং সামনে আর পেছনে থাকবে আরও কয়েকসারি বিশেষভাবে তাদের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত অশ্বারোহী বাহিনী। হুমায়ুন অবশ্য খানজাদা আর তার সৎ-বোন গুলবদনকে তাঁর কাছাকাছি আরেকটা রাজকীয় হাতিতে ভ্রমণের বন্দোবস্ত করতে আদেশ দিয়েছেন। সালিমা, এখনও তার প্রিয়তম উপপত্নী, পেছনে আরেকটা হাতিতে অবস্থান করবে।
মহিলাদের দলটার পেছনে থাকবে রাজকীয় শিবির স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি বহনকারী শকট- তাবু এবং ভ্রাম্যমান হাম্মামখানা, রান্নার উপকরণ এবং উত্তরপশ্চিমে চারশো মাইল যাত্রার জন্য দরকারী অন্যান্য সামগ্রী। এবং সেই সাথে অবশ্যই ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত লোহার অতিকায় সিন্দুক যার জটিল তালা খুলতে চারটা আলাদা আলাদা রূপার চাবি- প্রতিটা চাবি আলাদা আলাদা আধিকারিকের কাছে রক্ষিত এবং একটা সোনার চাবি প্রয়োজন যা এই মুহূর্তে হুমায়ুনের গলায় ঝুলছে। হুমায়ুন নিজের ভিতরে শেরশাহের সাথে প্রথমবার মুখোমুখি হতে যাবার দিল্লীতে রক্ষিত ধনসম্পদ নিরাপত্তার খাতিরে আগ্রায় পাঠাবার আদেশ দেয়ার মতো দূরদৃষ্টি দেখিয়েছিল বলে নিজের কাছেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তাঁর নিজের যা অর্থ আর রত্নপাথর রয়েছে আর সেই সাথে বাহাদুর শাহের কাছ থেকে সে যা দখল করেছে সেটা যোগ করলে, শেরশাহের সাথে টক্কর দেবার মতো একটা নতুন বাহিনী তৈরীর জন্য যথেষ্ট তহবিল তার কাছে রয়েছে।
বহরের একেবারে শেষে থাকবে অশ্বারোহী আর পদাতিক সৈন্যদের আরো কয়েকটা দল, যাদের ভিতরে তাঁর শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজেরাও রয়েছে, তাঁরা মিনিটে চল্লিশটা তীর নিক্ষেপের মতো দক্ষ। আর পুরো সেনাসারির ভিতরে ছড়িয়ে থেকে এবং বেশীরভাগ সময় দৃশ্যপটের আড়ালে আহমেদ খানের গুপ্তদূতেরা অবস্থান করবে, যেকোনো ঝামেলার জন্য তারা সর্তক দৃষ্টি রাখবে।
