হুমায়ুন বাকি সবার সাথে শবাধার বয়ে নিয়ে নদীর তীরে পৌঁছাবার পরে, সে মুখ তুলে আকাশের কালো মেঘের দিকে তাকায়। কোনো আগাম সতর্কতা না জানিয়েই হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়, প্রথমে বড়, ভারী ফোঁটা শীঘ্রই সেটা মুষলধারে নামতে শুরু করে হুমায়ুনের পরণের শোকের কালো আলখাল্লাটা ভিজিয়ে চুপচুপে করে তুলে। বৃষ্টিটা সম্ভবত একটা ইঙ্গিত, তাঁর মনে জমে উঠা সন্দেহ দূর করতে পাঠান হয়েছে, তাঁকে বলার জন্য যে যদিও কিছু বিষয়ের অবশ্যই সমাপ্তি ঘটবে, একজন নেতার জন্য সবসময়ে নতুন সূচনা অপেক্ষা করছে যে কখনও শোক কিংবা বিরুদ্ধতার মুখোমুখি হয়ে মুষড়ে পড়বে না বরং নিজের ক্ষমতা আর তার চূড়ান্ত বিজয়ের উপরে সে বিশ্বাস রাখবে।
*
হুমায়ুন তার চারপাশে উপস্থিত উপদেষ্টাদের দিকে তাকায়, সবার পরণে তার মতোই শোকের পোষাক, রীতি অনুযায়ী যা তাঁদের চল্লিশ দিন পরিধান করতে হবে। মাহামের মৃত্যুর পরে মাত্র চৌদ্দ দিন অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু ভয়ঙ্কর বিপদাশঙ্কাপূর্ণ যে খবর সে পেয়েছে সেটা যদি সত্যি হয় তাহলে মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের জন্য তাঁদের হাতে খুব অল্প সময়ই রয়েছে।
আহমেদ খান, আপনি নিশ্চিত…?
জ্বী, সুলতান, সারা দেহে সদ্য ভ্রমণ থেকে আসবার লক্ষণ স্পষ্ট ফুটে থাকা তার গুপ্তদূতদের প্রধান উত্তর দেয়। শেরশাহ প্রায় তিন লক্ষাধিক সৈন্যের একটা শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে। আমি নিজের চোখে এখান থেকে ঘোড়ায় মাত্র পাঁচ দিনের দূরত্বে তাদের অগ্রগামী বাহিনীকে দেখে আসছে।
সুলতান, তাঁর কথার সাথে আমরা যেসব খবর শুনেছি তার যথেষ্ট মিল আছে, কাশিম মন্তব্য করে। বৃষ্টি আরম্ভ হওয়া সত্ত্বেও শেরশাহ যথেষ্ট দ্রুতই এগিয়ে আসছে।
হুমায়ুন মনে মনে ভাবে, শেরশাহ অন্তত তাঁর পশ্চাদপসারনকারী বাহিনীর নাগাল পায়নি। এক সপ্তাহ আগে মূল বাহিনীটা নিরাপদে আগ্রা এসেছে যদিও আসবার পথে অনেকেই দলত্যাগ করেছে। তার মানে সে আগ্রা এসে আমাদের এখানেই আক্রমণ করতে চায়…আমাদের এই মুহূর্তে কত সৈন্য অবশিষ্ট রয়েছে? বাবা ইয়াসভালের স্থানে অশ্বারোহী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক যাকে মনোনীত করেছে সেই হাল্কা পাতলা আর লম্বা আধিকারিক জাহিদ বেগের দিকে হুমায়ুন তাকায়।
সুলতান, কনৌজ থেকে যারা ফিরে এসেছে তাদের নিয়ে প্রায় আশি হাজার হবে, কিন্তু এই সংখ্যাটা প্রতিদিনই আশঙ্কাজনক হারে কমছে…
মাথা উঁচু করে হুমায়ুন তাঁর দরবার হলের অন্যপ্রান্তে অবস্থিত দূর্গচত্বরের দিকে তাকায়। বৃষ্টিপাত আপাতত বন্ধ রয়েছে এবং মেঘের ফাঁক দিয়ে নেমে আসা সূর্যরশ্মিতে লাল বেলেপাথর থেকে এক ধরনের আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তারা ঝড়ের বেগে হিন্দুস্তান অধিকার করার পরে এই দূর্গটা এখন পর্যন্ত মোগলদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। গতরাতে হারেমের বিলাসিতা ঘুমাতে যাবার আগে প্রাকারবেষ্টিত দূর্গের ছাদে সে তাঁর ব্যক্তিগত জ্যোতিষী শারাফের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল, অনেকদিন পরে তাঁরা দুজনে একসাথে রাতের আকাশ দেখেছে। কিন্তু শারাফ সেখানে কিংবা রাশিচক্রে বা গণনায়- নিয়তির কোনো বাণী খুঁজে পায়নি। নক্ষত্ররাজির এই মৌনতার মাধ্যমে কি আল্লাহতালা তাঁকে বলতে চায় যে তাঁকে নিজে এবং একাকী তাকেই নিজের রাজত্ব রক্ষার পথ খুঁজে বের করতে হবে…?
আমি যে ভয়টা করছিলাম আহমেদ খানের সংবাদ সেটাই কেবল নিশ্চিত করেছে। আমাদের সামনে আগ্রা পরিত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই, হুমায়ুন অবশেষে বাক্যটা উচ্চারণ করে। সবাই চমকে গিয়ে সশব্দে শ্বাস টানে।
সুলতান, আগ্রা পরিত্যাগ করবো? কাশিমকে স্পষ্টতই বিহ্বল দেখায়।
হ্যাঁ। সেটাই একমাত্র পথ।
কিন্তু আমরা কোথায় যাব?
উত্তরপশ্চিম দিকে, লাহোরে। আমরা এরফলে কিছুটা সময় পাব আর আমি কাবুল থেকে আরো সৈন্য নিয়ে আসতে পারবো- সেখানের গোত্রগুলো লুটপাটের সুযোগকে খুশী মনে স্বাগত জানাবে…
অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে না অবশেষে বাইসানগার কথা শুরু করেন। বহু বছর আগের কথা আমি তখনও একজন যুবক আর সম্রাট বাবরের সাথে সমরকন্দে অবস্থান করার সময়, আমরা এক শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিলাম- সাইবানি খান আর তার অগণিত উজবেক সাথী, আমরা খুব ভালো করেই জানতাম যাদের পরাস্ত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আমাদের হাজার হাজার সহযোদ্ধাদের মৃত্যুই ছিল পশ্চাদপসারণের একমাত্র বিকল্প। বাবর, তাঁর সাহস আর দূরদৃষ্টি দিয়ে, যা তাকে একজন মহান শাসকে পরিণত করেছিল, বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলেন। বর্বর উজবেকদের হাতে তৈমূরের শহর তুলে দিতে যদিও তার ভেতরের যোদ্ধার সত্ত্বা বিষাদ ভারাক্রান্ত হয়েছিল, তিনি জানতেন তাঁকে এটা করতেই হবে…ঠিক যেমন আমাদের আগা ছেড়ে যেতে হবে…
হুমায়ুন দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। বাইসানগার ঠিকই বলেছেন। কিন্তু তিনি যেটা উহ্য রেখেছেন সেটা হল এই যে সমঝোতার শর্ত হিসাবে সাইবানি খান নিজের স্ত্রী হিসাবে খানজাদাকে দাবী করেছিল আর বাবর বাধ্য হয়েছিলেন নিজের বোনকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে। দশ বছর তৈমূরের বংশধরদের রক্তপিপাসু এক লোকের হারেমে খানজাদা জীবনযাপন করেছিলেন, যে খানজাদার মনোবল ভাঙতে খুশীমনে চেষ্টা করতো। তাঁর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। সে, হুমায়ুন, যাই ঘটুক না কেন, খানজাদাকে এমন নির্মম নিয়তি আর বরণ করতে দেবে না।
