আমি তাঁর সাথে দেখা করবো। বর্গাকার প্রস্তরফলকের মেঝের উপর দিয়ে দ্রুত পায়ে মায়ের আবাসন কক্ষের দিকে হেঁটে যাবার সময়, হুমায়ুনের চারপাশের লাল বেলেপাথরের দূর্গটা যেন শূন্যে মিলিয়ে যায়। সে আবারও কাবুলের একটা বালকে পরিণত হয়- তৃণভূমির উপর দিয়ে তাঁর টাটু ঘোড়াটা দুলকি চালে ছুটিয়ে, বাইসানগারের স্থাপিত খড়ের লক্ষ্যবস্তুর দিকে পর্যানে উপবিষ্ট অবস্থায় ক্রমাগত তীর নিক্ষেপ করছে এবং মাহামকে মুগ্ধ করার জন্য নিজের দক্ষতা আর সাহসিকতার অতিরঞ্জিত গল্পগুলো ইতিমধ্যে মনে মনে আউড়াতে শুরু করেছে।
সে যখন তার আম্মিজানের অসুস্থতার জন্য সংরক্ষিত কক্ষে প্রবেশ করতে, তাঁর নাসারন্ধ্র প্রশান্তিদায়ক সুগন্ধিতে ভরে যায়। গন্ধটা তাঁর আম্মিজানের খাটের চারপাশে স্থাপিত চারটা লম্বা ধূপাধার থেকে আসছে যেখানে রেজিনের সোনালী রঙের স্ফটিক ধিকিধিকি জ্বলছে। সবুজ শুজনির নীচে মাহামকে খুবই ছোট দেখায়, তাঁর মুখের ত্বক কাগজের মতো পাতলা কিন্তু তাঁর বিশাল কালো চোখ আজও তাদের সৌন্দর্য ধরে রেখেছে এবং চোখের তারায় নিজের ছেলেকে দেখতে পেয়ে সেখানে আন্তরিকতা, আবেগ এসে ভীড় করে। হুমায়ুন ঝুঁকে মায়ের কপালে চুমু খায়। আমাকে মার্জনা করবেন- আমি যাত্রাপথের ঘাম আর ধূলো নিয়েই আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি।
আমার সুদর্শন যোদ্ধা…তোমার আব্বাজান ভীষণ গর্ব করতেন তোমাকে নিয়ে…তিনি সবসময়েই বলতেন তার সব সন্তানের ভিতরে তুমিই সবচেয়ে যোগ্য, শাসক হবার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত…আমাকে তিনি শেষ যে কথাগুলো বলেছিলেন, মাহাম, আমার যদিও আরও সন্তান আছে, আমি তাদের কাউকে হুমায়ুনের মতো ভালোবাসি না। সে তার হৃদয়ের অভিলাস হাসিল করবে। তাঁর সমকক্ষ কেউ হবে না। তিনি তাঁর শুষ্ক হাত দিয়ে হুমায়ুনের গাল স্পর্শ করেন। আমার সম্রাট, আমার বাছা, তুমি কেমন আছো? আমাদের শত্রুকে তুমি কি পরাস্ত করেছে?
হুমায়ুন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবে, যাক তাঁর দুর্ভাগ্যের খবর তাহলে আম্মিজানকে কেউ জানায়নি। জ্বী আম্মিজান, সবকিছু ঠিক আছে। এখন আপনি ঘুমান। সকালে আমি আবার আসবো এবং তখন আমরা প্রাণ খুলে কথা বলবো। কিন্তু মাহাম ইতিমধ্যে চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন এবং হুমায়ুন সন্দিহান যে তিনি তার কথা শুনতে পেয়েছেন।
খানজাদা পাশের উপকক্ষে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাঁকে বিধ্বস্ত দেখায়- হুমায়ুন ধারণা করে মাহামের শয্যাপার্শ্বে অসংখ্য প্রহর তিনি নিন্দ্রাবিহীন কাটিয়েছেন কিন্তু হুমায়ুনকে দেখতে পেয়ে তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। আগ্রায় নিরাপদে তোমার পৌঁছাবার সংবাদ জানতে পেরে আমি আল্লাহতালার কাছে শুকরিয়া প্রকাশ করেছি, তিনি তাঁর গালে চুমু দিতে দিতে কথাগুলো বলেন।
আমাকে হেকিমদের সাথে কথা বলতে হবে…
তাদের সাধ্যমতো তারা করেছে। আমরা এমনকি আব্দুল-মালিকের সাথে আলোচনা করার জন্যও তোক পাঠিয়েছিলাম, তোমার আব্বাজানকে যখন বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল তখন কিভাবে তার হাতযশ তাকে সুস্থ করে তুলেছিল সেটা সম্বন্ধে অবগত থাকায়। যদিও এখন তাঁর বয়স হয়েছে এবং চোখে ভালোমতো দেখতে পান না, কিন্তু তার মস্তিষ্ক এখনও পরিষ্কার কাজ করে। কিন্তু তাকে যখন রোগের উপসর্গগুলো বলা হয় তিনি সাফ জানিয়ে দেন মাহামের যন্ত্রণা উপশম করা ব্যাতীত আমাদের আর কিছুই করার নেই। খানজাদা চুপ করে থেকে কিছু একটা ভাবেন। মাহাম কেবল একটা বিষয়ের জন্য প্রতীক্ষা করেছিল- হুমায়ুন, তোমাকে আরেকবার চোখে দেখবে। এখন সে শান্তিতে মরতে পারবে…
হুমায়ুন চোখ নামিয়ে যুদ্ধের ক্ষতযুক্ত হাতে তৈমূরের অঙ্গুরীয়ের দিকে তাকায়। আমি এইমাত্র তাকে মিথ্যা কথা বলেছি…আমি তাকে বলে এসেছি আমাদের শত্রুদের আমি পরাস্ত করেছি। কিন্তু তিনি যখন বেহেশত থেকে আমাকে দেখবেন আমার জন্য তখন তিনি গর্ববোধ করবেন- আমি দিব্য করে বলছি… কিছু বুঝে উঠবার আগেই সে টের পায় তার গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছে।
দুইদিন পরে, আরও তিনজন লোকের সাথে হুমায়ুনকে তাঁর মায়ের চন্দনকাঠের শবাধারে, কর্পূর পানিতে গোসল করিয়ে সাদা কাফনে জড়ান অবস্থায়, বহন করতে দেখা যায়, যমুনাতে অপেক্ষমান একটা নৌকা তাদের গন্তব্য। একটা দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান- নদীর অপর পাড় থেকে বেশ খানিকটা ভেতরে তাঁর মরহুম আব্বাজান বাবরের তৈরী অনেকগুলো বাগানের একটা, যেখানে মাত্র ফুল ফুটতে আরম্ভ করেছে তার সমাধির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। হুমায়ুন আড়চোখে একবার তার পাশে পাশে হাঁটতে থাকা বাইসানগারের দিকে তাকায়। তাঁর নিজেরই অনেক বয়স হওয়া সত্ত্বেও তিনি খানিকটা পীড়াপীড়ি করেই নিজের মেয়ের অন্তিমযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া লোকটাকে এখন কি ভীষণ রোগা লাগছে- বাবরকে সমরকন্দ দখলে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তোলা সেই যোদ্ধার ছায়া মাত্র এখন তাঁকে দেখে মনে হয়।
হুমায়ুনকে আরও গভীর এক বিষণ্ণতা আচ্ছন্ন করে তোলে- মাহামের মৃত্যুই কেবল না বরং যৌবনের অনেক নিশ্চয়তার নিরাপত্তা শেষ হয়ে আসছে এই বোধটা তাকে আরও বেশী ব্যাকুল করে। সারা জীবন সে ছিল অত্যধিক প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠা এক যুবরাজ, পৃথিবীর বুকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত, জীবনে যা কিছু পরম কাম্য সবকিছুতেই তার ন্যায্য অধিকার এমন একটা ধারণা নিয়ে সে বড় হয়েছে। অন্যদের কাজের কারণে বিড়ম্বনার শিকার হয়ে নিজেকে তার কখনও এতো নগন্য আর অরক্ষিত মনে হয়নি। তার আগে কখনও মনে হয়নি নিজের নিয়তি নিয়ন্ত্রণ করা এতো কঠিন।
